​তৃতীয় সুর ষষ্ঠ সুর, নিশিকুটুম ডাকে বহুদূর

মধুজা মুখোপাধ্যায়

বেশ কিছু বছর আগের কথা। তা প্রায় তিন বছর তো বটেই ! তখন আমরা Indiana State এর Columbus শহরের বাসিন্দা। আমাদের বাড়ির পেছন  দিকে একটা ​ছোট্ট পুকুর ছিল। আমার বাবা নাম দিয়েছিলেন Lily Pool. শীতে Lily Pool এ বরফ জমে ধবধবে সাদা হয়ে থাকত আর গরম কালে তার মধ্যে টল টল করত জল। যেহেতু শীত কালে সব সময় দরজা জানলা বন্ধ রাখতাম তাই গরম কাল আর বেশি করে বসন্তের সময় ঠান্ডা হাওয়া খাবার লোভে জানলা সব সময়্ খোলাই থাকত।

 লিলিপুলের ধারে হঠাৎ আবিষ্কার হল নিশিকুটুমের আস্তানা  ছবিঃ শুভজিৎ সেন

লিলিপুলের ধারে হঠাৎ আবিষ্কার হল নিশিকুটুমের আস্তানা
ছবিঃ শুভজিৎ সেন

নিঝুম রাতে জানলা দিয়ে ঠান্ডা  হওয়া আর  সাথে Ipod এ রোমান্টিক গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তাম। ঘটনাটা ঘটল Ipod এর চার্জ শেষ হয়ে যাবার পর। আলসেমি করে আর চার্জ দেওয়া হচ্ছিলনা বেশ কিছুদিন। ফলে তখন রাতে ঘুম পাড়ানোর ভরসা হলো Lily pool ছুঁয়ে আসা ঠান্ডা মনোরম বাতাস আর তাকে কেন্দ্র করে নানান ভাবনা চিন্তা । এরকম একরাতে হঠাৎ  একটা বিকট শব্দে উঠে বসলাম বিছানায়। শব্দটা ঠিক পুলের দিক  আসছে। জানলার আরও  কাছে যেতেই ব্যাপারটা বেশ জোরে হয়ে গেল।  কান করে শুনলাম – ওমা ! এতো গাধার ডাক ! অবাক কান্ড ! নিজের কানকে বিশ্বাস করতে না পেরে কর্তা মশাইকে ঠেলে তুললাম। তারও এক মত – এ তো গাধা না হয়ে যায় না।  প্রতিবেশীদের কেউ গাধা পুষেছে আর সে নাকি রাতে গলা সাধে।  গুপি গায়েন বাঘা বায়েন এর রাজার দুঃখটা হাড়ে  হাড়ে টের পেলাম। এ তো বেশ জব্বর বুদ্ধিমান গাধা ! নিজেও ঘুমায় না, আর পাড়াপড়শীদেরও  ঘুমোতে না দেবার সব ব্যবস্থা করে রেখেছে।

এরপর বেশ কিছুদিন নিদ্রা বিহীন রজনী আর পাহারাদারি চালিয়ে গেলাম। এত নিষ্ঠার সাথে গলা সাধা কল্পনাতীত ! লক্ষ করলাম,  পুলের ধারের নিশিকুটুমের গান  না শুনলে আর ঘুম আসেনা। আশ্চর্য্য Ipod  এর রোমান্টিক গানের জায়গা নিল শেষে গাধার গলা সাধা !

ঋতুচক্রে এবার বর্ষার পালা। নিশিকুটুমের  ডাক জোরদার হতে লাগলো রোজ রাতে।  মনে মনে খুব রাগ হত কার এরকম বুদ্ধি হতে পারে যে বর্ষার রাতেও বেচারা গৃহপালিতকে পুলের ধারে গান গাইতে পাঠিয়েছে!

নিশিকুটুমের রহস্য সমাধান করলো আমাদের এক বন্ধু দম্পতি।  তারা জানালো গাধা তো নই , বা তার ধারে কাছেও নয় এই প্রাণী যে রোজ রাতে দায়িত্ব নিয়ে ঘুম পাড়ানি গান শোনায়।  তবে এ কে ? এও  চার পেয়ে প্রাণী তবে শুধু ডাঙায়  না, সে মাঝে মাঝে জলেও থাকে।  একে বলে Bull Frog. এদের ডাক অবিকল গাধার ডাকের মত। মনে পড়ল ছোটবেলায় Biology  তে পড়েছিলাম বটে। বর্ষাকালে গান টান গেয়ে বন্ধুদের ডাকা ডাকি করে। প্রানীজগতে কত আজব ঘটনা ঘটে, তাই না?

কলকাতায় দীর্ঘ দাবদাহর পর এই কদিন নাকি বৃষ্টি নেমেছে। এদিকে গত এক সপ্তাহ ধরে NewYork এ খুব বৃষ্টি পড়ছে – কল্পনায় Columbus এর নিশিকুটুমের ডাক ঘন ঘন কাল থেকে কানে বাজছে । “তৃতীয় সুর ষষ্ঠ সুর নিশিকুটুম ডাকে বহুদূর” ! চোখ কান খোলা রাখি, আবার যদি এরকম বিচিত্র কিছু অভিজ্ঞতা হয়ে যায় !

 

Previous post গাঁয়ে মানে আপনি মোড়ল
Next post একসঙ্গে লড়াই ছাড়া উপায় নেই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *