স্নেহা সেন
একেনবাবু যাচ্ছেন কেরলে। বেনারস, শান্তিনিকেতন, দার্জিলিং, পুরী, রাজস্থান ঘুরে এবার দক্ষিণ ভারতের এই সবুজ, সুন্দর রাজ্য। সঙ্গে সেই চেনা দুই সঙ্গী বাপি আর প্রমথ। কিন্তু এবারের অভিযান আর পাঁচটা রহস্য সমাধানের গল্প নয়। এখানে রহস্যের সঙ্গে মিশেছে সন্ত্রাসবাদ, বিজ্ঞান, বিপজ্জনক ষড়যন্ত্র আর টানটান অ্যাকশন।
কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। একেনবাবুর মতো নরম-সরম, নিরীহ, খানিকটা হাবাগোবা গোছের মানুষটিকে দিয়ে এত মারকাটারি থ্রিলার করানোর দরকার ছিল কি? যিনি ভুলভাল প্রবাদ বলেন, কথায় কথায় খাবারের খোঁজ করেন, আর তাঁর আপাত বোকামির আড়ালেই লুকিয়ে থাকে তুখোড় গোয়েন্দার মস্তিষ্ক, তাঁকে যখন প্রায় অ্যাকশন হিরোর মেজাজে হাজির করা হয়, তখন একটু ধাক্কা লাগে বইকি!
একেনবাবুর জনপ্রিয়তার শুরু ওটিটিতে। সুজন দাশগুপ্তের সৃষ্ট এই গোয়েন্দা চরিত্রকে নিজের মতো করে গড়ে তুলেছেন অনির্বাণ চক্রবর্তী। তাঁর কথা বলার ধরন, মুখের অভিব্যক্তি, অদ্ভুত যুক্তি আর ভুলভাল প্রবাদ—সব মিলিয়ে একেনবাবু যেন বাঙালির ঘরের লোক। সেই চরিত্রকে বড় পর্দায় নিয়ে আসার মধ্যে ঝুঁকি ছিল। কারণ, ওটিটিতে যে মাপের গল্প ও অভিনয় দর্শককে আনন্দ দেয়, সিনেমার পর্দায় তার সঙ্গে যোগ হয় আরও বড় প্রত্যাশা।
জয়দীপ মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ‘কেরালায় কুরুক্ষেত্র’ সেই প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা করেছে। পুরুলিয়ার অভিযান শেষ হওয়ার পর অপহৃত একেনবাবুকে দেখা যায় কেরলে। সেখানে নিখোঁজ বিজ্ঞানী মিহির সেন, এক বিপজ্জনক সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী এবং এক গোপন অভিযানের সূত্র ধরে জটিল হয়ে ওঠে রহস্য। একেনকে সাহায্য করতে গিয়ে বাপি আর প্রমথও জড়িয়ে পড়ে সেই বিপদের মধ্যে।
গল্পের শুরু থেকেই গতি আছে। একের পর এক প্রশ্ন তৈরি হয়। কেন এই অপহরণ? বিজ্ঞানীর কাছে কী এমন তথ্য রয়েছে? আর গোটা ঘটনার সঙ্গে একেনবাবুরই বা সম্পর্ক কী? রহস্যের জট খুলতে গিয়ে দর্শককে মন দিয়ে ছবি দেখতে হয়। তবে কিছু জায়গায় কাহিনির জটিলতা একটু বেশি মনে হতে পারে। সব প্রশ্নের উত্তরও সমান জোরালো নয়।
এই ছবির সবচেয়ে বড় সম্পদ অনির্বাণ চক্রবর্তী। একেনবাবু আর অনির্বাণকে আলাদা করে ভাবা এখন প্রায় অসম্ভব। দু’জন যেন একে অন্যের পরিপূরক। অনির্বাণ চরিত্রটিকে এমনভাবে আত্মস্থ করেছেন যে তাঁর সামান্য চোখের চাহনি কিংবা কথার ফাঁকে ফাঁকে তৈরি হওয়া হাসিটুকুও দর্শককে আনন্দ দেয়।
এবার অবশ্য তাঁকে নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। শুধু বুদ্ধির জোরে রহস্যের সমাধান নয়, বিপদের সামনে দাঁড়িয়ে সক্রিয় ভূমিকাও নিতে হচ্ছে। এই পরিবর্তন তাঁর অভিনয়ের নতুন দিক দেখায়। তবে এখানেই নির্মাতাদের একটু সাবধান হওয়া দরকার। একেনবাবুর শক্তি তাঁর সাধারণত্বের মধ্যে। তাঁকে পুরোপুরি অ্যাকশন হিরো বানিয়ে ফেললে চরিত্রটির নিজস্ব আকর্ষণটাই হারিয়ে যেতে পারে।
বাপি ও প্রমথের ভূমিকায় সুহোত্র মুখোপাধ্যায় এবং সোমক ঘোষ যথাযথ সঙ্গত দিয়েছেন। তিনজনের পারস্পরিক রসায়ন ছবির হাস্যরসের বড় উৎস। অন্যদিকে, ইরফান ফাজিলের চরিত্রে ঋত্বিক চক্রবর্তী ছবিতে বিপদের আবহ তৈরি করেছেন। তাঁর অভিনয়ে সংযম আছে, যদিও কিছু জায়গায় চরিত্রটির আরও গভীরতা প্রত্যাশিত ছিল। রাইমা সেনের চরিত্রটিও আরও বিস্তৃত হলে ভালো লাগত।
কেরলের প্রকৃতি এই ছবির অন্যতম আকর্ষণ। কোচি, আলেপ্পির জলপথ, পেরিয়ার নদীর তীর কিংবা মুন্নারের জলপ্রপাত—বিভিন্ন জায়গার দৃশ্য ছবিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। টুবানের ক্যামেরায় প্রকৃতির সৌন্দর্য ধরা পড়েছে। তবে এই সৌন্দর্য কেবল চোখের আরাম জোগায় না, অভিযানের পরিসরকেও বড় করে তোলে। অ্যাকশন, রহস্য আর হাস্যরসের মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টাও প্রশংসনীয়।
তা হলে সব মিলিয়ে ছবিটি কেমন? নিখুঁত নয়, কিন্তু উপভোগ্য। গল্পের কিছু দুর্বলতা আছে, কিছু চরিত্র আরও যত্ন দাবি করে। অ্যাকশনের বাড়াবাড়ি নিয়েও প্রশ্ন তোলা যায়। তবু একেনবাবুর চেনা মেজাজ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। তাঁর বুদ্ধি, বোকামির অভিনয় আর বাপি-প্রমথের সঙ্গে খুনসুটি ছবিটিকে ধরে রেখেছে।
তবে শেষ প্রশ্নটা থেকেই যায়—পথিক, তুমি কি পথ হারায়েছো? একেনবাবু কি তাঁর চেনা পথ ছেড়ে অন্য পথে হাঁটছেন? উত্তরটা পুরোপুরি নেতিবাচক নয়। নতুন কিছু করার চেষ্টা জরুরি। কিন্তু নতুনত্বের নামে চরিত্রের স্বাভাবিকত্ব বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়। একেনবাবুকে বড় পর্দায় আরও বড় করে তোলা যেতেই পারে, তবে তাঁর সরলতা আর অদ্ভুত যুক্তিবোধকে সঙ্গে নিয়েই।
কারণ, একেনবাবু শুধু রহস্য সমাধান করেন না, রহস্যের মধ্যে হাসতে শেখান। সেই হাসিটুকুই যেন অ্যাকশনের শব্দে চাপা না পড়ে।
