স্বরূপ গোস্বামী
একটা করে মেট্রো এসে থামছে। সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছেন কাতারে কাতারে মানুষ। বেরোনোর রাস্তা কোনদিকে, কাউকে জিজ্ঞেস করার দরকার নেই। চাইলেও ভুল করার সুযোগ নেই। কারণ, পিছনের উত্তাল জনস্রোত সেই আগন্তুককে ঠেলতে ঠেলতে হাজির করবে এক মহাসমুদ্রে। একটা ট্রেনের ঢেউ থামতে না থামতেই এসে যাচ্ছে আরও বড় ঢেউ। মেট্রো আগের বছরেও ছিল। কিন্তু হাওড়া জুড়ে যাওয়ায় এবার পেয়েছে অন্য মাত্রা। বইমেলার সৌজন্যে মেট্রোও নিশ্চিতভাবে অতীতের সব রেকর্ডকে ছাপিয়ে গেল। বইমেলা না মেট্রো, কে কার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে? এমন মহোৎসবের আবহে সেই তর্ক বরং তোলাই থাক।
আগের রবি, সোম— টানা দুই ছুটির সন্ধেয় ভরে উঠেছিল করুণাময়ী চত্বর। কিন্তু তখন মেলা সবে আড়মোড়া ভাঙছে। অনেক বই তখনও স্টলে আসেনি। কিন্তু শেষ রবিবার সব পথ যেন এসে মিশে যাচ্ছিল একই ঠিকানায়। এত দিকে এত গেট। সব গেটের ছবি মোটামুটি একই। স্টলের বাইরে এঁকেবেঁকে চলে গিয়েছে দীর্ঘ লাইন। কে বলে এই প্রজন্মের ধৈর্য নেই! প্রায় এক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ালে স্টলে ঢোকা যাবে, এই নির্মম সত্যিটা বুঝেও তো লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। কীসের আকর্ষণে! ধর্ম, ভাষা, রাজনীতির সব বিভাজন ভুলে বইয়ের সমুদ্রে এমন অবগাহন! দেশের আর কোন শহরে এমন ছবি দেখা যাবে! হে বইপ্রেমী জনতা, তোমাকে লাখো কুর্নিশ।
টুকরো–টুকরো কত ছবি। গিল্ড অফিসের সামনে একাকী দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ। দূর থেকে একঝলক দেখলে হকচকিয়ে যাওয়ারই কথা। মুখের আদল, দাড়ি, পোশাক— যেন অবিকল রবীন্দ্রনাথ। হেদুয়ার সোমনাথ ভদ্র নিজের অজান্তেই হয়ে উঠেছেন ‘রবিদা’, ‘রবিকাকু’। পাশে দাঁড়িয়ে সারাদিন কত মানুষ সেলফি তুলে যাচ্ছেন, তার কোনও হিসেব নেই। বেশ কয়েক বছর ধরেই সোমনাথবাবু বইমেলার এক চেনা চরিত্র। আরও এক চেনা চরিত্র অলোককুমার দত্ত। নিজেকে বলেন ‘বইয়ের ফেরিওলা’। তাঁর কোনও স্টল নেই, তিনি নিজেই এক ভ্রাম্যমাণ বইমেলা। নিজের লেখা ছোট ছোট বই, নানা বিচিত্র প্ল্যাকার্ড নিয়ে তিনি চষে বেড়ান পুরো বইমেলা। ৪৯ বছর ধরে এই রুটিন চলছে। এমন কত বিস্ময়, কত চরিত্রের মিছিল ছড়িয়ে আছে সারা বইমেলা জুড়ে।
আজকাল প্রকাশন মানেই ব্যতিক্রমী বইয়ের সম্ভার। নতুন বইয়ের পাশাপাশি পুরনো বইয়ের চাহিদাও তুঙ্গে। গত পাঁচ বছরের ‘নেপথ্য ভাষণ’ ও ‘হিং টিং ছট’–এর বাছাই লেখা নিয়ে অশোক দাশগুপ্তর ‘নির্বাচিত সাম্প্রতিক’ যেন চলমান সময়ের এক দলিল। ক্রীড়া সাংবাদিক দেবাশিস দত্ত এবার অন্য ভূমিকায়। ছোটদের জন্য লিখেছেন উপন্যাস ‘টাপুর টুপুরের ক্রিকেট’। প্রচেত গুপ্তর গোয়েন্দা উপন্যাস ‘পাটিগণিতের কলম’ বা ছোটদের জন্য লেখা শ্যামলী আচার্যর ‘নিকোলে সাহেবের কবর’ নিয়েও পাঠকমহলে বেশ সাড়া পড়েছে। ভূপেন হাজারিকাকে নিয়ে লেখা তরুণ চক্রবর্তীর ‘বিস্তীর্ণ দু’পারে’, ‘বিস্মৃত জাদুকর দেবকুমার’কে নিয়ে লিখেছেন সমীরকুমার ঘোষ, খেলার বই চাইলে সুতপা ভৌমিকের অনুলিখনে সুধীর কর্মকারের আত্মজীবনী ‘রক্ষণরেখা’। এমনই নানা উপহারের ডালি সাজানো আজকালের স্টলে।
সিমিকা থেকে প্রকাশিত দুই প্রজন্মের দুই নায়িকাকে নিয়ে লেখা অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘নক্ষত্রের আলো ও আত্মগোপন’ নিয়ে আগ্রহ তুঙ্গে। সিমিকা থেকেই বেরিয়েছে অলি সেনের বই ‘বাসুদেব কৃষ্ণ’। পঙ্কজ সাহা লিখলেন ‘আমার স্মৃতিতে কলকাতা দূরদর্শন’। টিভির পর্দার আড়ালে থাকা নানা অজানা গল্পের সম্ভার। সুকান্ত ভট্টাচার্যের শতবর্ষে ‘বাংলার আভাস’ নিয়ে এল সংগ্রহে রাখার মতো সংখ্যা।
কলকাতার রাস্তায় হেঁটে হেঁটে তিনি এই শহরকে দেখেছেন। দেখেছেন স্বদেশি আন্দোলন, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং নানা ঐতিহাসিক ঘটনা। উনিশ শতকের কলকাতাকে দেখেছেন ধীরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। ডায়েরিতে লিখে রেখেছিলেন সেইসব কাহিনি। এতকাল আড়ালেই পড়েছিল সেই ডায়েরি। এবার বইমেলায় প্রতিভাস থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘ধীরেন্দ্রনাথের ডায়েরি, পটলডাঙা থেকে জীবনদীপ’। সম্পাদনায় শ্যামশ্রী বিশ্বাস সেনগুপ্ত। ভূমিকা লিখেছেন বিশিষ্ট নাট্যসমালোচক শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়।
এদিকে, ৩ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার বইমেলায় উদার আকাশ প্রকাশনার ইংরেজি নভেল ‘শঙ্কর দ্য লস্ট হিরো’ প্রকাশিত হবে। বইটির লেখক হরশঙ্কর মিত্র। প্রেস কর্নারে ওইদিন আরও কয়েকটি বই এবং ফারুক আহমেদ সম্পাদিত ‘উদার আকাশ’ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যার উদ্বোধন হবে। এ ছাড়াও প্রকাশিত হয়েছে ড. হাবিবা রহমানের ‘জঙ্গিপুর মহকুমা: এক ঝলকে লোকসংস্কৃতির প্রেক্ষিতে’, সাবিনা সৈয়দের কবিতার বই ‘রোদাশা’। শেখ আনিসুর রহমানের কবিতার বই ‘রক্তে ভেজা আগুন’।
বইমেলার মেয়াদ আর মাত্র দু’দিন। তবু নতুন বই প্রকাশের বিরাম নেই। শেষদিনেও থাকছে নতুন বই প্রকাশের আয়োজন। এসব বই মানুষের কাছে পৌঁছোবে কীভাবে? এতদিন কাতারে কাতারে মানুষ এসেছেন বইয়ের কাছে। হৃদয়ের টান থাকলে বইও ঠিক পৌঁছে যাবে মানুষের কাছে।
