সুগত রায়মজুমদার
আসন্ন লোকসভা নির্বাচন। সেই উপলক্ষে ১৯ জানুয়ারি ব্রিগেডে হয়ে গেল মোদি–বিরোধী জোটের মহাসভা। এই সভায় দেশের ২২–২৪টি দলের নেতারা জোটবদ্ধ হয়েছিলেন। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারীগামী সমস্ত রাজ্যের বিরোধী নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বিজেপি–বিক্ষুব্ধ কিছু নেতারাও উপস্থিত ছিলেন এই সভায়। প্রত্যেকের গলায় একই সুর— বিজেপি হটাও, দেশ বাঁচাও।
এই সভার মূল উদ্দেশ্য ছিল সারা দেশে একটা ফেডারেল ফ্রন্ট গড়ার। এই ফ্রন্টের আহ্বায়ক ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। এই সভার শেষে মমতা একটাই কথা বললেন, আঞ্চলিক দলগুলির নেতাদের তাঁদের নিজের নিজের জায়গায় একটা করে সভা করতে। সারা ভারতে এই ফেডারেল ফ্রন্টকে ছড়িয়ে দিতে। তিনি দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল, দক্ষিণের চন্দ্রবাবু নাইডুকে, কাশ্মীরের ফারুক আবদুল্লাকে এই জোটের খবর ছড়িয়ে দেও্য়ার দায়িত্ব দিলেন। তিনি কিন্তু সর্বভারতীয় দল কংগ্রেসের নেতাদের বললেন না, আপনারা আপনাদের জায়গাতেও সভা করুন। ডাকলে অবশ্যই যাব। এই কথাটাও এই সভায় উল্লেখিত হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ঠিক হবে নির্বাচনের পর। আগে থেকে প্রধানমন্ত্রীর দাবিদার ঠিক করা হবে না। কেন কংগ্রেসকে সঙ্গে রাখতে চাইছেন না, সেটা কিন্তু জানালেন না। যদিও কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এই জোটকে স্বাগত জানিয়েছেন। সোনিয়া গান্ধীও শুভেচ্ছা জানিয়ে মল্লিকার্জুনের হাতে চিঠি পাঠিয়েছেন। মমতা এটাও চাইলেন, বিজেপি দলের বিরুদ্ধে ভাঙন ধরাতে, রাজনাথ সিং, সুষমা স্বরাজ, নীতিন গাডকরিদের নাম উল্লেখ করেন। সকলেই জানেন, এঁরা কেউই নরেন্দ্র মোদির কাছের লোক নন। এতে বোঝা যাচ্ছে, মমতা ফেডারেল ফ্রন্টকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
প্রশ্ন উঠছে, কেন মমতা ব্যানার্জি কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীকে মেনে নিতে চাইছেন না? আজ রাহুলের দক্ষ নেতৃত্বেই সম্প্রতি কংগ্রেস বিজেপি–কে ৫ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে প্রবল ধাক্কা দিয়েছে। তা সত্ত্বেও তিনি রাহুলের নেতৃত্ব মেনে নিতে চাইছেন না। তা হলে কি বলতে হবে, তাঁরও একটা সুপ্ত বাসনা আছে প্রধানমন্ত্রীর দাবিদার হওয়ার ইদুরদৌড়ে!

সমগ্র দেশের সকলেই জানেন, কংগ্রেস বা বিজেপি ছাড়া কোনও দল বা গোষ্ঠীর পক্ষেই সম্ভব নয় দেশের শাসনক্ষমতায় আসার। হয়তো বড় দলগুলির আঞ্চলিক দলগুলির সমর্থন লাগতেও পারে। তা বলে কোনও দল ফেডারেল ফ্রন্ট গড়ে দেশের শাসনক্ষমতায় আসবে, এটা কাল্পনিক ব্যাপার। এটা জোট না হয়ে ঘোঁট হয়ে দাঁড়াতে পারে। হয়তো সাধারণ মানুষের চিন্তাধারাকে বিভ্রান্তিতে ফেলা হচ্ছে। তাঁদের ভুল বোঝানোহচ্ছে।
কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে যে সব দলের প্রতিনিধিরা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই প্রায় অবসরের পথে। যাঁদের আর কিছুই দেওয়ার নেই। দেবগৌড়া, শারদ পাওয়ার, শারদ যাদব, অজিত সিংদের কাছ থেকে আর কিছুই পাওয়ার আশা করা অলীক ভাবনা। এই সমস্ত নেতাদের হাত ধরে যে কিছুই পাওয়া সম্ভব নয়, সেটা এই জোটের নেতারাও জানেন।
তা হলে এই নেতাদের উদ্দেশ্য, আসন্ন নির্বাচনে কি বিজেপি–র পথ সুগম করা? জনগণ পরিষ্কার বুঝতে পারবেন, এই জোটের উদ্দেশ্য বিজেপি–কে হটানো নয়, বিজেপি–র বাধা সরিয়ে দেওয়া। কেন এই প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেল না, একের বিরুদ্ধে এক জোট। সর্বসম্মতিক্রমে কেন একের বিরুদ্ধে এক এই জোট হল না? উত্তরপ্রদেশে অখিলেশ–মায়াবতী জোট হলে কংগ্রেসের ক্ষতি হবে, বিজেপি–র লাভ হবে। তদরূপ বাংলায় মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে যদি কংগ্রেসের সমঝোতা না হয়, তা হলে বিজেপি–বিরোধী ভোটটা তো শুধু তৃণমূলেই যাবে। এতে তো মমতাই লাভবান হবেন। এটাই কি ছিল মমতার উদ্দেশ্য? এটা জোট না ঘোঁট, সময়ই বলবে।
