এখন ট্যুর অপারেটরদের পাল্লায় পড়ে বাঙালি অনেক দূরে দূরে যেতে শিখেছে। কথায় কথায় কাশ্মীর, রাজস্থান, আন্দামান ছুটছে। কেউ কেউ তো ইউরোপ, আমেরিকা ট্যুর করে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু ঘরের কাছে এই প্রিয় জায়গাগুলো যেন মানচিত্রের বাইরেই থেকে যাচ্ছে।
অথচ, কয়েক দশক আগেও ছবিটা এমন ছিল না। বাঙালি একটু অবসর পেলেই ছুটত শিমুলতলা, মধুপুর, গিরিডি, তোপচাঁচি, হাজারিবাগ। হাওয়া বদল বা পশ্চিমে যাওয়া বলতে এগুলোকেই বুঝত।
মংপুতে তিনবার গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। থাকতেন মৈত্রেয়ী দেবীর বাড়িতে। বাড়িতে না বলে কোয়ার্টারে বলাই ভাল। মৈত্রেয়ী দেবীর স্বামী চাকরি করতেন কুইনাইন ফ্যাক্টরিতে। তাঁর বাংলোতেই অতিথি হয়ে উঠতেন বিশ্বকবি। তখন জীবনের প্রান্তবেলা। ঘুরে বেড়ানোর তেমন সামর্থ্য নেই। পাহাড়ি সেই জনপদে বাঙালি প্রায় ছিল না বললেই চলে। অধিকাংশই নেপালি। ফলে, রবীন্দ্রনাথ কী লেখেন, সেসব বোঝা তাঁদের কম্ম নয়। তবু সকাল থেকেই বাড়িতে ভিড় লেগে যেত। আসলে, কবির কাছে নয়, তাঁরা আসতেন ডাক্তারের কাছে। এখানে রবি ঠাকুরের পরিচিতি ছিল হোমিওপ্যাথি ডাক্তার হিসেবে। তিনি এই পাহাড়ি মানুষদের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করতেন, ওষুধ দিতেন।
কখনও চিঠি লিখে, কখনও পায়ে হেঁটে গ্রাম ঘুরে, কখনও অলস রোদ গায়ে মেখে তিস্তার দিকে চেয়ে থেকে। এভাবেই দ্বিতীয় দিনটাও সুন্দর কেটে গেল। পরেরদিন ফেরার পালা। ফেরার দিন মানেই মন কেমন। তবে সরাসরি সমতল নয়, আরও একটা দিন, পাহাড়েরই অন্য কোনও ঠিকানায়। মন ফিরে যাচ্ছে সেই শান্ত পাহাড়ে। যেখানে টিভি চ্যানেলের ব্রেকিং নিউজ নেই। আতঙ্কের সংক্রমণ নেই। যেখানে আপন মনে ময়ূর ডেকে চলেছে। যেখানে পায়ে পায়ে জঙ্গল পেরিয়ে অনেকটা পথ হেঁটে যাওয়া যায়। যেখানে পায়ের তলা দিয়ে বয়ে চলেছে তিস্তা।
ঘন শাল জঙ্গলের মাঝে পাথুরে লালমাটির পথ। সেই পথ ধরে প্রিয়জনের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে গহীন অরণ্যে। এত কাছ থেকে, এত নিজের করে প্রকৃতিকে বোধহয় ডুয়ার্সেও পাওয়া যায় না। কয়েক বছর আগেও এই জায়গাটি মাওবাদীদের ডেরা হিসেবে চিহ্নিত ছিল। একটা চাপা আতঙ্কের চোরাস্রোত ছিল। সেই কারণেই মাঝে দীর্ঘিদিন পর্যটকদের আনাগোনাও প্রায় বন্ধই ছিল। কিন্তু এখন আর সেই আতঙ্ক নেই।
একদিকে বয়ে চলেছে সুবর্ণরেখা। অন্যদিকে সারি সারি পাহাড়ের মিছিল। তারই মাঝে পেয়ে গেলাম আরণ্যকের সেই দোবরু পান্নাকে।
খোলা ছাদ, একেবারেই সাদামাটা একটা রেস্তোরাঁ। বলে না দিলে আলাদা করে বোঝার উপায়ও নেই। ম্যাল থেকে একটু নেমে গেলেই চোখে পড়বে রেস্তোরাঁটা। সেখানকার প্রিয় খাদ্য নাকি চিকেন সসেজ। যারা আসে, এটাই আগে খায়।
স্বরূপ গোস্বামী কমলালেবুর গ্রাম বলতেই সবার আগে ভেসে ওঠে সিটংয়ের নাম। ঘরে ঘরে থরে থরে কমলালেবুর গাছ। ইচ্ছেমতো পেড়ে নিলেই হল। কমলালেবুর খোঁজে সিটং গিয়ে হতাশও হতে হয়েছে। কমলার সিজন...
বাড়ির সামনেই একটা বেঞ্চ পাতা। ঘরে ঢোকার আগেই সেদিকে চোখ চলে গেল। সামনে একেবারে খোলা জায়গা। সামনে কোনও বাড়ি নেই। কোনও জনপদ নেই। একেবারে খোলা পাহাড়। দূরে নাম না জানা সব পাহাড়ের সারি। আহা, এই বেঞ্চে বসেই তো অনন্ত সময় কেটে যায়। গেয়ে উঠলাম, ‘আমার আর কোথাও যাওয়ার নেই। কিচ্ছু করার নেই।’
এই দীর্ঘ যাত্রার অনেকটা সময় ধরেই আমাদের সঙ্গিনী ছিলেন তিস্তা নদী। যাত্রাপথে তার সান্নিধ্যও কম উপভোগ্য নয়। পাহাড় ঘেরা একটি অজানা গ্রামের মাঝে এত সুন্দর একটি হোমস্টে দেখে আমরা তো আনন্দে আত্মহারা।
তার আগে বার তিনেক দার্জিলিংয়ে গিয়েছি। কিন্তু সত্যি বলছি, ক্যাভেন্টার্সের কথা তার আগে কেউ বলেনি। তাই যাওয়াও হয়নি। সেখানে কার পা পড়েনি? সত্যজিৎ রায় থেকে ঋত্বিক ঘটক। অমিতাভ বচ্চন থেকে রাজেশ খান্না। এডমন্ড হিলারি থেকে তেনজিং নোরগে। এতলোক যখন গিয়েছেন, তখন নিশ্চয় দামও আকাশছোঁয়া হবে। সে এক পাঁচতারা এলাহি ব্যবস্থা হবে। ভয়মিশ্রিত একটা রোমাঞ্চ নিয়েই গিয়েছিলাম।