সিপিএম পুজো থেকে দূরে থাকবে, আপনিও দয়া করে বইমেলা থেকে দূরে থাকুন

স্বরূপ গোস্বামী

তিনি একেবারে খাঁটি কথা বলেছেন। সিপিএমের লোকেরা তাবিজ পরে না। মাদুলি পরে না। হাতে সুতো বাঁধে না। একেবারে যাচ্ছেতাই।

শুধু তাই নয়। পুজোর সময় গেরুয়া ধুতি পরে না। খোল বাজায় না। সনাতনী সনাতনী বলে চিৎকার করে না। একেবারে ম্লেচ্ছ বলতে যা বোঝায়, তাই।

তিনি কিন্তু আদর্শ সনাতনী। কী সুন্দর খোল কত্তাল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। কী সুন্দর গেরুয়া পাঞ্জাবি পরেন। কী সুন্দর গেরুয়া কার্পেটে জুতো পরে হেঁটে যান। কী সুন্দর নাঙ্গা সাধুদের নিয়ে মিছিল করে ইউনিভার্সিটি ঘেরাও করেন। তাঁর মতো ধর্মপ্রাণ মানুষ কটা আছে!‌

পুজোর বহু আগেই তিনি হুঙ্কার দিয়ে বসেছিলেন, পুজো মণ্ডপে এবার বামপন্থীদের বইয়ের স্টল হবে না। ওই বইয়ের স্টলে দেশদ্রোহী বই থাকে। জিহাদি বই থাকে। ওইসব বই পড়তে দেওয়া যাবে না।

কর্তা ধরে আনতে বললে পারিষদরা বেঁধে আনে, এটাই আবহমান কালের রেওয়াজ। তিনি হুঙ্কার দিলেন। বাকিরাও প্রবল উৎসাহে নেমে পড়লেন স্টল ভেঙে ফেলতে। তিনি তো শুধু তৎকাল বিজেপি নন। প্রশাসনিক প্রধান বলে কথা। তিনি খোদ বিধানসভায় দাঁড়িয়ে হুঙ্কার দিয়েছেন। অতএব, তাঁর কথাই আইন। সুতরাং, আইনের রক্ষকরাও নেমে পড়লেন। স্টলে স্টলে এসে ‘‌ভদ্রভাবে’‌ স্টল সরিয়ে নিতে বললেন। আন্য কারও অনুমতি থাকুক আর নাই থাকুক, বইয়ের স্টলের অনুমতি থাকতেই হবে। যদি অনুমতি থাকে!‌ তাহলে বলা হবে, এই অনুমতি প্রত্যাহার করে নেওয়া হল। বলা হবে, এই কাগজটা আছে, কিন্তু ওই কাগজটা নেই। পুজো মণ্ডপের ফায়ার লাইসেন্স থাকুক আর না থাকুক, বলা হবে বইয়ের স্টলের ফায়ার লাইসেন্স কই?‌ মহান আত্মার মহানুভবতার অভাব হয় না।

সত্যিই তো, পুজোয় শুধু সনাতনীরা থাকবে। এখানে বইয়ের স্টল কেন থাকবে?‌ কে এত পড়তে বলেছে? তাগা, তাবিজ পরো, কীর্তন করো, কথায় কথায় জয় শ্রী রাম বলো। তবেই তো তুমি সনাতনী। সনাতনী না হলে ঠাঁই নেই। হোয়াটসঅ্যাপে বিষ উগরে দেব, অন্য পাড়ায় যেতে হলে হেলিকপ্টার চড়ব, কিন্তু খোল কত্তাল বাজাব। এটাই তো আদর্শ সনাতনী।

না মশাই, বইয়ের স্টল ভেঙে ভালই করেছেন। ওসব না বসতে দেওয়াই ভাল। ওটা সিপিএমের জায়গা নয়।

বিনীতভাবে এবার একটা কথা না বললেই নয়। যদি অভয় দেন তো বলতে পারি। ধর্মের সঙ্গে সিপিএমের সম্পর্ক নেই। মণ্ডপে ওদের স্টল না থাকাই ভাল।

সিপিএমের ধর্মে মতি না থাকলেও তারা অন্তত মন্দির বা মূর্তি ভাঙতে যাননি। কিন্তু আপনারা তো আরেক ধাপ উপরে। স্টলে ভাঙচুর চালালেন। বই পা দিয়ে মাড়ালেন। এই কদিনে আপনি এবং আপনার বীরপুঙ্গবরা বুঝিয়ে দিলেন, বইযের সঙ্গে আপনাদেরও তেমন সম্পর্ক নেই। বইয়ের সম্পর্কে কোনও শ্রদ্ধাও নেই।

দোহাই, বইমেলার আঙিনা থেকে আপনারাও দূরে থাকুন। সুন্দর বইমেলার অঙ্গন যেন আপনার উপস্থিতিতে কলুষিত না হয়। আপনি যত খুশি খোল বাজান, কীত্তন করুন। ওটাই আপনাকে মানায়। যে প্রশাসক বইয়ের স্টল ভাঙায় ইন্ধন দেন, বইমেলায় তিনি সত্যিই অবাঞ্ছিত।

Previous post ভূত বাংলো যেমন গা ছমছমে, তেমনই রোমাঞ্চকর
Next post ভাবনাও অন্য কেউ ভেবে দিচ্ছে, আপনার মগজে সত্যিই কারফিউ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *