সজল মুখার্জি
কোনও সিনেমার সৌজন্যে নয়, রাজা সেনকে প্রথম চেনা মূলত দূরদর্শনের সৌজন্যে। এই কথার মাঝেও হয়তো কোথাও ফাঁক থেকে গেল। কারণ, তখন এমনই এক বয়স, যখন পর্দার পিছনের মানুষদের কথা সেভাবে মাথায় আসত না।
উত্তম কুমার বা অমিতাভ বচ্চন কোনও একটা সংলাপ বলছেন মানে, সেটা তাঁরাই বলছেন। চিত্রনাট্য কার লেখা, তা নিয়ে মাথা ঘামাতে বয়েই গেছে। আবার কিশোক কুমার বা হেমন্ত মুখার্জি কোনও একটা গান গাইছেন মানে, তাঁরাই গাইছেন। কে লিখেছেন, সে সুর দিয়েছেন, এসব কিছুই জানতাম না।
ঠিক তেমনই, তখন বিনোদন বলতে ছিল দূরদর্শন। শনি আর রবিবারে সিনেমা। আর হাতে গোনা কয়েকটা সিরিয়াল। তাও রোজ নয়, একেকটি সিরিয়াল সপ্তাহে একদিনই হত। তখন যেগুলিই দেখেছি, মনে গেঁথে আছে। যেমন, আদর্শ হিন্দু হোটেল। হাজারি ঠাকুরের ভূমিকায় ছিলেন মনোজ মিত্র, আর পদ্মরানীর ভূমিকায় সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। বড়দের মুখে শুনেছিলাম, এটা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা। কিন্তু কে পরিচালক? সেই নামটা সত্যিই শুনিনি। অনেক পরে জেনেছিলাম, এর পরিচালক ছিলেন রাজা সেন।
সিরিয়াল দেখার অনেক পরে ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’ বই আকারে পড়ি। মুগ্ধ হই। মনে আছে, বেশ কয়েকজনকে এই বই নানা সময়ে উপহারও দিয়েছি। এখন বলতে দ্বিধা নেই, এই বই পড়ার আগ্রহই হয়তো তৈরি হত না, যদি রাজা সেন নির্মিত এই সিরিয়াল না দেখতাম।
পরিচালক রাজা সেন বলতেই আলোচনায় আসছে ‘দামু’, ‘আত্মীয় স্বজন’, ‘দেশ’, ‘দেবীপক্ষ’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ‘ল্যাবরেটরি’র মতো ছবি। আসছে তাঁর জাতীয় পুরস্কারের প্রসঙ্গ। কিন্তু রাজা সেনকে মনে করতে গেলে শুধু সিনেমার পর্দায় আটকে থাকলে বোধ হয় তাঁকে সম্পূর্ণ পাওয়া যায় না। আরও বেশি করে তিনি বোধ হয় ছড়িয়ে আছেন টেলিভিশনের পর্দায়—বিশেষ করে দূরদর্শনের সেই দিনগুলিতে, যখন সাহিত্য আর টেলিভিশন একে অপরের হাত ধরেছিল।
এই সময়ের জলহাওয়ায় বেড়ে ওঠা প্রজন্ম হয়তো বুঝতেও পারবে না, কীভাবে সন্ধেবেলায় টিভির হাত ধরে জীবন্ত হয়ে উঠত বাংলা সাহিত্য। সবেধন নীলমণি দূরদর্শন। সেই দূরদর্শনের সামনে বসে গোটা পরিবার একসঙ্গে দেখত বাংলা সাহিত্যের গল্প। আর সেই পর্দায় রাজা সেন ছিলেন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারিগর। ‘কলকাতা কলকাতা’, ‘দেশ আমার দেশ’, ‘ব্যাঙ্কিম সাহিত্যে নারী’, ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’, ‘তারাশঙ্করের ছোট গল্প’, ‘আরোগ্য নিকেতন’—একটির পর একটি সাহিত্যনির্ভর কাজ। তাঁর নিজের কাজের তালিকাতেই রয়েছে রবীন্দ্রনাথ, আশাপূর্ণা দেবী, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, নারায়ণ মিত্র, মহাশ্বেতা দেবী, বাণী বসুর মতো লেখকদের গল্প-উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত একাধিক টেলিফিল্ম ও ধারাবাহিক।
এখানেই রাজা সেনের বিশেষত্ব। তিনি সাহিত্যকে টেলিভিশনে নিয়ে গিয়ে তাকে ভারী করে তুলতেন না। বরং সাহিত্যের ভিতরের মানুষটাকে খুঁজে বের করতেন। সম্পর্ক, অভিমান, নিঃসঙ্গতা, সামাজিক টানাপড়েন, মধ্যবিত্তের ছোট ছোট স্বপ্ন—সব কিছু খুব আপন করে পর্দায় তুলে আনতেন। তাঁর ক্যামেরা যেন কখনও গল্পের ওপর চড়াও হত না; পাশে বসে গল্প শুনত।
সেই আটের দশক। তখনও সেভাবে সিরিয়াল শুরুই হয়নি। সবে হয়েছে তেরো পার্বণ। তারপরই আশাপূর্ণা দেবীর কাহিনি নিয়ে এল ‘সুবর্ণলতা’। নাম ভূমিকায় সুমিত্রা মুখার্জি। বাংলা ছবিতে তখন ভিলেন বলতেই ভেসে উঠত বিপ্লব চ্যাটার্জির নাম। রাজা সেন বিপ্লবকে নিয়ে এলেন একেবারে অন্য ভূমিকায়। যতদূর মনে পড়ে, সেটি ছিল তের পর্বের সিরিয়াল। সপ্তাহে একদিন। কিন্তু গল্পের রেশ হারিয়ে যেত না। বরং সারা সপ্তাহ জুড়ে চলত অপেক্ষা। আসালে, সারা সপ্তাহ জুড়েই চলত অদ্ভুত এক অনুরণন। একটি ছবি মানুষ আড়াই ঘণ্টা ধরে টানা দেখলেন। কিন্তু সিরিয়ালের একটি পর্বের জন্য এক সপ্তাহ অপেক্ষা। এই আগ্রহ ধরে রাখা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর চলচ্চিত্র নিয়ে যত আলোচনা হবে, হওয়াই উচিত। কিন্তু তাঁর টেলিভিশন–পর্বকে ভুলে গেলে বাংলা বিনোদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসও যেন ভুলে যাওয়া হবে। কারণ রাজা সেন শুধু ছবি বানাননি, এক প্রজন্মের দর্শককে বাংলা সাহিত্য দেখতেও শিখিয়েছিলেন।
সেই সময়ও নেই। পুরনো দূরদর্শনের সেই পর্দাও আর নেই। সন্ধ্যার নির্দিষ্ট সময়ে টিভির সামনে পরিবারের সবাইকে নিয়ে বসার সেই অভ্যাসও আজ নিছকই অতীত। কিন্তু কোনও কোনও দৃশ্যের মতো কিছু স্মৃতি থেকে যায়। পুরনো কোনও গল্পের চরিত্র হঠাৎ মনে পড়ে যায়। মনে হয়, কোথাও যেন রাজা সেনের ক্যামেরা এখনও চলছে।
