রক্তিম মিত্র
যখন যে দল ক্ষমতায় আসে, সিলেবাস বদল করতে উঠে পড়ে লাগে। আগের বই থেকে কিছু চ্যাপ্টার, কিছু নাম ছেঁটে ফেলে। নতুন কিছু নাম, নতুন কিছু চ্যাপ্টার ঢুকে পড়ে। তারপর এমন ভান করেন, যেন আর কোনও সমস্যাই রইল না। যেন, শিক্ষায় বিরাট এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেল। কী কেন্দ্র, কী রাজ্য, কেউই পিছিয়ে নেই। যেন সিলেবাসটা একটু বদলে দিতে পারলেই আর কোথাও কোনও সমস্যা থাকবে না।
আসলে, শিক্ষার আসল সমস্যাগুলো ঠিক কী কী, সেই সম্পর্কে হয় কোনও ধারণা নেই। নইলে, আসল সমস্যা থেকে নজর ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্যই এইসব আয়োজন। আচ্ছা, এই মুহূর্তে রাজ্যে কত হাজার স্কুল বন্ধ হয়ে পড়ে আছে? এই মুহূর্তে কতগুলি প্রাইমারি স্কুল একজন শিক্ষকের ওপর নির্ভর করে চলছে? কতগুলি স্কুল বাড়ির সংস্তার দরকার? মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে কী পরিমাণ শূন্যপদ আছে? যে ছেলেটি মাধ্যমিক পাস করছে, সে আদৌ মাধ্যমিক পাসের যোগ্য তো? এসব সমস্যা নিয়ে ভাবার সময় নেই। এইসব সমস্যা সমাধানের চেষ্টাও তেমন চোখে পড়ে না।
আগের সরকার কী কী অনিয়ম করে গেছে, তা নিয়ে হাওয়া গরম করো। আর সিলেবাস বদল করার কমিটি তৈরি করে দাও। নতুন সরকারও এই শর্টকার্ট নিয়মেই যেন হাঁটতে চাইছে। আগের সরকার যদি সিলেবাসে নিজেদের কিছু সাফল্যের ফিরিস্তি ঢুকিয়েও থাকে, শুরুতেই সেগুলো বাদ দিয়ে নতুন করে বই ছাপতে হবে? এক দু বছর যদি তেমন দু–এক পাতা থেকেও যায়, কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে? আসলে, শুধু বাদ দেওয়া নয়, এঁদের নতুন কিছু ঢোকাতেও হবে। এঁরা নিজেদের ঢাক পেটাবেন। নিজেরা যেগুলো প্রচার করেন, সেইসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করবেন। সেই ট্রাডিশনই সমানে চলেছে।
এইসব কাজে প্রচার পাওয়া যায়। আসল সমস্যাকে গুলিয়ে দেওয়া যায়। নিজেদের দায়িত্বকে এড়ানোও যায়। কিন্তু সমস্যা যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই থেকে যায়। তাই নতুন সরকারের কাছে অনুরোধ, শিক্ষায় যে মৌলিক সমস্যাগুলো রয়েছে, আগে সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করুন। প্রতিবছর স্বচ্ছতার সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগ করুন, ছাত্রদের ড্রপআউট কমান, স্কুলগুলোকে আগের মতো প্রাণবন্ত করে তুলুন। স্কুলে যেন পড়াশোনার পরিবেশ ফিরে আসে, স্কুলের কমিটিতে যেন যথার্থ শিক্ষামনষ্ক লোকেরাই থাকেন, তা সুনিশ্চিত করা অনেক বেশি জরুরি। আগে এই প্রাথমিক কাজগুলো করুন। সিলেবাস নিয়ে না হয় পরে ভাববেন।
