তসলিমাকে হজম করা এই অর্বাচীনদের কম্ম নয়

সৃজন শীল

কয়েকদিন ধরেই আবার বাংলার প্রচার মাধ্যমে শিরোনামে উঠে আসছেন তসলিমা নাসরিন। আবার তিনি কলকাতায় আসছেন। আর তাই নিয়ে শুরু হয়ে গেছে রাজনৈতিক চাপানোতর।

তসলিমার কলকাতা ছেড়ে চলে যাওয়া নিঃসন্দেহে দুঃখের। যেভাবে একশ্রেণির মৌলবাদি হামলা চালিয়েছিল, যেভাবে কলকাতাকে অশান্ত করে তুলেছিল, তা কলকাতার গৌরবে অনেকটাই কালি ছিটিয়েছিল।

কিন্তু সেই সময় এমনই একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তসলিমা কলকাতায় থাকলে তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে সমস্যা তৈরি হতে পারত। কোনও সরকারই চায় না আইন শৃঙ্খলা নিয়ে অরাজকতা তৈরি হোক। মোলবাদি শক্তি সেই সময় ছিল, এই সময় নেই, এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। তখন মৌলবাদের চেহারা ছিল অন্যরকম, এখন বড়জোর তার চেহারাটা পাল্টেছে।

কেন তসলিমার বই নিষিদ্ধ হয়েছিল?‌ না, সরকার বিরোধী কোনও লেখার জন্য নয়। বাম সরকারের বিরুদ্ধে তিনি নানা সময়েই সোচ্চার হয়েছেন। তার জন্য তাঁর লেখা নিষিদ্ধ হওয়া তো দূরের কথা, তাঁর বই বিক্রি বা বিভিন্ন কাগজে কলাম লেখাও আটকায়নি। কিন্তু তাঁর একটি বইয়ে বাংলার সাহিত্যিকদের সম্পর্কে নানা আপত্তিকর মন্তব্য ছিল। সেইসঙ্গে ধর্মীয় উস্কানি তো ছিলই। সরকার স্বতপ্রণোদিত হয়ে সেই বই নিষিদ্ধ করেছিল, এমন নয়। শঙ্খ ঘোষ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার–‌সহ বিভিন্ন দিকপাল মানুষদের মতামত চাওয়া হয়েছিল। তাঁরাও মনে করেছিলেন, এইজাতীয় মন্তব্য রাজ্যের ও শহরের সম্প্রীতির পরিবেশকে নষ্ট করতে পারে।

কোনও বই নিষিদ্ধ হলে তার জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়। এটা যে সরকার জানত না, এমন নয়। তবু এমন স্পর্শকাতর বিষয় আরও বড় অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াক, তা কেউই চাইবে না। এমনিতেই রিজওয়ানুরের ঘটনা নিয়ে তখন মহানগর উত্তাল। নানা জায়গায় আন্দোলনের নামে চলছে ভাঙচুর। কাজে লাগানো হচ্ছে মৌলবাদি শক্তিকে। সেই সময় যে কোনও কারণেই হোক, প্রশাসনের সেই দৃঢ়তা ছিল না যে এই শক্তির মোকাবিলা করবে। একটা ছোট্ট অশান্তি থেকে আবার স্ফূলিঙ্গ তৈরি হতে পারত।

যে কারণে, গত পনেরো বছরেও তাঁকে বাংলায় আসতে দেওয়া হয়নি। গত পনেরো বছর তো বাম সরকার নেই। তাহলে সমস্যা কোথায় ছিল?‌ তসলিমা আসছেন, ভাল কথা। কিন্তু এটা নিয়ে বিজেপির খুব একটা উল্লসিত হওয়ার জায়গা নেই। যেহেতু তসলিমা বাংলাদেশের প্রশাসনের বিরুদ্ধে বলেন, তাই বিজেপির কারও কারও মধ্যে খুব উৎসাহ। আসলে, তাঁরা তসলিমার লেখা পড়েননি। নইলে জানতেন, হিন্দু মৌলবাদ নিয়েও তিনি একইরকম সোচ্চার। তাঁর লজ্জা উপন্যাসে যেমন হিন্দু পরিবারের কোণঠাসা হওয়ার কাহিনি আছে, তেমনই ভারতের কোন ঘটনা থেকে বাংলাদেশে আগুন জ্বলে উঠল, সেই কথাও আছে। দুই উস্কানির বিরুদ্ধেই সমান ঘৃণা বর্ষিত হয়েছে তাঁর লেখায়।

তাই যাঁরা উল্লসিত হচ্ছেন, যাঁরা এই সুযোগে আরও একবার বামেদের গাল পেড়ে নিচ্ছেন, তাঁরা বোধ হয় তসলিমার একটি বইও পড়েননি। ধর্মীয় হিংসা ছড়ানোই যাঁদের হাতিয়ার, তসলিমাকে হজম করা তাঁদের কম্ম নয়।

Previous post বাতিল লেখা থেকেই ছবি বানালেন তরুণ মজুমদার
Next post মেঘ, পাহাড়, নদী, অরণ্য–‌কী নেই উত্তরবঙ্গে?‌

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *