ভাই–‌বোনের গল্পেই বাংলার ক্রিকেটের চালচিত্র

এ যেন অন্য মাঠ। অন্য পিচ। অন্য ইনিংস। সাড়ে চার দশকের সাংবাদিকতার জীবন। বইয়ের সংখ্যায় হাফ সেঞ্চুরি পেরিয়ে গেছেন অনেক আগেই। কিন্তু এর আগে কখনই উপন্যাস লেখার চেষ্টা করেননি। বলা যায়, একটু দেরিতেই যাত্রা শুরু। কিন্তু নতুন ভূমিকাতেও তিনি বেমানান নন, প্রথম উপন্যাসেই বেশ বুঝিয়ে দিলেন দেবাশিস দত্ত।


ক্রিকেট বিশ্বের দিকপালদের ইন্টারভিউ করেছেন। বাদ যাননি পেলে, মারাদোনার মতো কিংবদন্তিও। অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার পরিপূর্ণ। কিন্তু প্রথম উপন্যাস লিখলেন কিশোরদের জন্য। নাম:‌ টুপুর টাপুরের ক্রিকেট। বেছে নিলেন অনূর্ধ্ব ১৫ স্তরের ক্রিকেটকে। চ্যালেঞ্জটা মোটেই সহজ ছিল না। কথায় আছে, একটা উপন্যাস নিছক কাহিনির বিস্তার নয়। সেই উপন্যাসে মিশে থাকে লেখকের সারা জীবনের অভিজ্ঞতা ও ঘাত–‌প্রতিঘাতের কাহিনি। ক্রিকেট বিশ্ব চষে বেড়িয়েছেন। কিন্তু উপন্যাসের শিকড় কখনও বারাসত, কখনও হুগলির প্রত্যন্ত জনপদ গুপ্তিপাড়া।


একইসঙ্গে বেড়ে ওঠা দুই ভাই–‌বোন টুপুর ও টাপুর। দু’‌জনেই পড়াশোনায় ভাল। দু’‌জনেরই স্বপ্ন ভাল ক্রিকেটার হওয়ার। কিন্তু শুধু স্বপ্ন দেখলেই তো হয় না, চাই সঠিক তালিম, চাই শৃঙ্খলা, চাই পরিশ্রম, চাই নিষ্ঠা, চাই খেলাটাকে প্রবলভাবে ভালবাসা। এ আসলে শুধু মফস্বলের দুই কিশোর–‌কিশোরীর বেড়ে ওঠার গল্প নয়, একইসঙ্গে পারিবারিক শিক্ষা ও মূল্যবোধেরও কাহিনি। বাবা, মা থেকে দুই বাড়ির দুই ঠাকুমা কীভাবে শামিল হয়ে গেলেন দুই খুদে ক্রিকেটারের স্বপ্নপূরণের লড়াইয়ে। কখন লাটাই ধরতে হয়, কখন সুতো ছাড়তে হয়, এ যেন নিখুঁত এক ভারসাম্যের কাহিনি। বাবার গল্পে উঠে এসেছে দিকপাল সব ক্রিকেটারের নানা অজানা কাহিনি। অথচ, সেই গল্পগুলো আরোপিত মনে হয় না, বরং কাহিনির সঙ্গে সংলাপগুলো দিব্যি মানিয়ে যায়। সেই গুপ্তিপাড়া, যেখানে ক্লাইভ লয়েড থেকে গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ, দিকপাল সব মানুষের আনাগোনা, তারাই বা কীভাবে এগিয়ে এল সিএবি–‌র শিবির পরিচালনায়!‌ সাগরময় সেনশর্মা, গার্গী ব্যানার্জি থেকে শুরু করে বাংলা ক্রিকেটের একের পর এক চেনা চরিত্রও ধরা দিয়েছেন উপন্যাসের পাতায় পাতায়।


উপন্যাসের অচেনা পিচ। স্বভাবতই, শুরুর দিকে একটু ধরে খেলা। তারপর উইকেটে সেট হয়ে যাওয়ার পর হাত খোলা। এই ছকেই এগিয়েছেন। ফলে, ব্যাটে–‌বলে টাইমিংটা ঠিকঠাক ছন্দ মেনেই এগিয়েছে। বাংলার ক্রিকেট কীভাবে এগোচ্ছে, কোথায় খামতি, সেগুলোও সুন্দরভাবে উঠে এসেছে। অন্ধকার সরণিতে তিনি যে বেরিয়েছেন মশাল হাতে। ফলে, ভাই–‌বোনের গল্প হয়ে উঠেছে বাংলার ক্রিকেটের চালচিত্র। ক্যানভাসটা নিজের পরিসর ছাড়িয়ে গেছে নিজের অজান্তেই।

টুপুর টাপুরের ক্রিকেট
দেবাশিস দত্ত
আজকাল
২৫০ টাকা

Previous post তাঁর ‘‌বর্ণময়’‌ হয়ে ওঠার দরকার নেই
Next post গণতন্ত্রই পারে অরাজকতার মেঘ সরিয়ে সম্প্রীতি ফেরাতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *