শান্তনু ব্যানার্জি
গত বছর পুজোর আগে। কোথায় যাই, কোথায় যাই। টুসকি, বচন, হরিদা কিছুতেই ঠিক করে উঠতে পারছে না। এমন সময় বাড়িতে এসে হাজির দীপু দা। কিরে কী হয়েছে তোদের! মুখগুলো কেমন শুকনো দেখাচ্ছে। কী হয়েছে রে…….ওমনি টুসকি শুরু করে দিল।
সামনে দুর্গোপুজো, কিন্তু কোথায় বেড়াতে যাব বুঝে উঠতে পারছি না। আর টুসকির মুখের কথা প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে দীপু দা বলে উঠলেন এক নিশবাসে, নারকান্ডা। টুসকি আর বচন নারকান্ডা নাম শুনে দীপু দাকে ঘিরে ধরলো। নারকান্ডা! সেটা আবার কোথায়! দীপু দা মুচকি হেঁসে হরি দার দিকে তাকিয়ে বলে ফেললেন মুশকিল আসান!
এবার ছুটিতে নারকান্ডা। নাছোড়বান্দা টুসকি আর বচন ঘ্যান ঘ্যান শুরু করে দিল এমনভাবে যেন এই মূহুর্তেই দুজনে ছুঁট্টে নারকান্ডা চলে যেতে চায়। দীপুদাও টুসকি আর বচনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হরিদার ওপরে মনসংযোগ নিক্ষেপ করে বসলো। কি হরি তুমি কম বলো? নারকান্ডা! কোথায় সেটা? অপার বিস্ময়ে হরিদা তাকিয়ে দীপুদার দিকে।
নারকান্ডা, সিমলা। দীপুদার মুখ থেকে সিমলা শুনে মনটা কেমন চিরাপ চিরাপ করে উঠলো হরিদার। শুরু হয়ে গেল নারকান্ডা যাওয়ার প্রস্তুতি। দীপুদার মুখ থেকে শৈল শহর নারকান্ডা শুনে টুসকি আর বচনের সে কি আহ্লাদ! এক্কেবারে হই হই। দুজনেই দীপুদার দুহাত ঝাঁকিয়ে আবদার শুরু করে দিল নারকান্ডার গল্প বলো। এরই মধ্যে চা চলে এল। নীতু পিসি যিনি এতক্ষণ ধরে রান্নাঘর থেকে সবকিছু শুনছিলেন, এবার তিনিও দীপুদাকে নিয়ে পড়লেন। কবে থেকে তোমার দাদাওকে বলে চলেছি পুজোর ছুটিতে বেড়ানো নিয়ে, তা ওনার যে কে সেই। ভাগ্যিস তুমি আজ চলে এসেছো। আমিও তো ভাবছি বৌদিদের কাছ থেকে পুজোয় বেড়ানো বিষয়ে কিছু জানতে পারছি না। তাই আর দেরি না করে চলেই এলাম। চা পানের সঙ্গে সুখটান দিয়ে দীপুদা এবার ঝেড়ে কাশলেন। টুসকি আর বচনকে পাশে বসিয়ে সিমলা থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরের শৈল শহর নারকান্ডার ছোট্ট বর্ণনা তুলে ধরলেন। ২৭০৮ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত শৈল শহর নারকান্ডা। কালকা অথবা চন্ডীগড়ে নেমে রামপুরের পথ ধরে এগিয়ে যেতে হয়। সিমলা থেকে কুফরি ফাগুর পথে ইন্দো-তিব্বত রোডে ধরে দুই ঘন্টার মধ্যে পৌঁছে যাওয়া যায় নারকান্ডায়।

ওক, পাইন, সিডার, ওয়ালনটে বৃক্ষের ছায়াপথে শৈল শহর পর্যটকদের আগমনে সকল ঋতুতেই অর্ভ্যথনা জানিয়ে থাকে। নারকান্ডার বাজার অঞ্চলেই অধিকাংশ হোটেল। হিমালয়ের ধাপে দূর থেকে নারকান্ডার স্বর্গীয় সৌন্দর্য অপার শান্তি এনে দেবেই। নারকান্ডার সবথেকে বড় আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘স্কি পয়েন্ট’। বাজার এলাকা থেকে দেড় কিলোমিটার হাটা পথেই স্কি পয়েন্ট । বছরের শেষ মাস ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত নারকান্ডার স্কি পয়েন্টে জমজমাট স্কি খেলার আসর বসে থাকে। নারকান্ডায় রয়েছে ‘হাটু পিক’। এটিও নারকান্ডার অন্যতম বড় আকর্ষণ কেন্দ্র। ৮ কিলোমিটার দূরত্ব-র হাটু পিকে গাড়িতে, এমনকি হেঁটেও ঘুরে আসা যায়। তবে হিমালয়ের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে মনশ্চখে আসবাদন করতে চাইলে হেটে বেড়ানোই শ্রেয়। হাটু পিকের আকর্ষণ পর্যটকদের কাছে বেশি এই কারণে যে এখান থেকে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখার মতো । এছাড়া ৩৩০০ মিটার উচ্চতার চূড়োয় রয়েছে “কালো হাটু” দূর্গা মাতার মন্দির। স্থানীয় অঞ্চলের লোকেদের জিঞ্জাসা করে গেলে হাঁটা পথ অনেকটাই সহজ হয়ে থাকে। এরই সঙ্গে ‘ভীমসেন লা চুলহা’ নামে একটি পাথর খন্ড আছে। আর রয়েছে ১৮৮৬ সালে নির্মিত একটি ডাক বাংলো।
মাথার উপরে দিগন্ত বিস্তৃত নীল আকাশ আর চারিদিকে শুধু শ্বেত শুভ্র বরফরাশি। হিমালয়ের কোলে ছোট্ট শৈল শহরের নাম নারকান্ডা। চলো এবার পুজোর ছুটিতে ঘুরে আসি।

