সরল বিশ্বাস
ব্রেকিং নিউজের ঠেলায় আর পারা গেল না। কী চিৎকার, কী চিৎকার! যেন বিরাট কোনও গোপন কথা এই বুঝি আমজনতা জানতে পারল!
এইসব চ্যানেলের ছেলেমানুষি যত দেখি, হাসিও পায়, আবার রাগও হয়। কী জানি, কিছুটা হয়তো করুণাও হয়। বিকেল থেকে ব্রেকিং নিউজ, শুভেন্দু অধিকারীই হচ্ছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। এখানেই শেষ নয়, সেই সঞ্চালকদের কৃতিত্ব নিতেই হবে। অতএব, শুরু হয়ে গেল সেই দাবি, আমরাই বলেছিলাম, শুভেন্দুর পাল্লাই ভারী। দেখা গেল, সেটাই সত্যি হল।
আহা, কী চমৎকার ভবিষ্যৎবাণী! আমরাই প্রথম বলেছিলাম। পাড়ার পাঁচুদা থেকে ঝন্টুদা, সবাই জানত, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুই হচ্ছেন। এর জন্য বিরাট কোনও রাজনৈতিক গবেষক বা বিশ্লেষক হওয়ার দরকার পড়ে না। বরং এই গবেষকরাই মাঝে মাঝে উদ্ভট সব তত্ত্বকথা শুনিয়ে গুলিয়ে দিয়েছিলেন। কেউ কেউ খুব গম্ভীরভাবে বলতে শুরু করেছিলেন, বিজেপি কী করবে, কেউ বলতে পারে না, আর এস এস যেটা করবে, সেটাই চূড়ান্ত। তাই এমন কোনও নাম হয়তো বেছে নেওয়া হবে, যা কেউ ভাবতেই পারছে না।
আচ্ছা বলুন তো, এই সব বাতেলাবাজি শুনলে মানুষ বিভ্রান্ত হবে না! কেউ ভাসিয়ে দিলেন অগ্নিমিত্রা পালের নাম, কেউ ভাসিয়ে দিলেন দিলীপ ঘোষের নাম, কেউ আবার টেনে আনলেন কার্তিক মহারাজের নাম। যাঁরা এসব নাম হাওয়ায় ভাসালেন, তাঁরা কোনও চায়ের দোকানে গুলতানি করা লোক নন। একেবারে টিভির পর্দায় তাঁদের দেখা যায়। তাঁরা বিশেষজ্ঞ হয়ে চ্যানেলে ভাষণ দিতে আসেন। তাঁদের সঙ্গে লোকে সেলফি তোলে।
আচ্ছা, আসামে হিমন্ত বিশ্বশর্মাই যে আবার মুখ্যমন্ত্রী হবেন, কে জানত না! বিহারে নীতীশ কুমারের পর সম্রাট চৌধুরির মতো কীর্তিমান ওই চেয়ারে বসবেন, এটাও জানাই ছিল। এই ভাষ্যকারদের কাছে এটা নাকি বড় চমক। এই লোকটি ভোটের আগেও উপমুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। এবার এনডিএ জোট ফের ক্ষমতায় আসার পরেও উপ মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। তিনি মুখ্যমন্ত্রী হবেন, এতে আশ্চর্যের কী আছে!
ভারী আর এস এস দেখানো হচ্ছে! হিমন্ত কোন যুগে আর এস এস করতেন? চিরকাল কংগ্রেস করে এসেছেন। কংগ্রেস সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। আর শ্রীমান সম্রাট চৌধুরি! তিনি আবার আরও প্রতিভাবান। কংগ্রেস, আরজেডি, জেডিইউ — সব ঘাটের জল খেয়ে বিজেপিতে এসেছেন। আর এস এস যদি এঁদের নামে সম্মতি জানায়, তাহলে বুঝতে হবে তাদের সত্যিই বড় দুর্দিন।
তাই যতই মহারাজদের নাম ভাসানো হোক, বিজেপিতে আর এস এসের প্রভাব কতটা, তা একেবারে সাম্প্রতিককালের বিহার ও আসামের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনেই বোঝা গেছে। তাই এক্ষেত্রেও তৃণমূল ক্যাবিনেটের প্রাক্তন মন্ত্রীই যে মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন, তা নিয়ে কোনও সংশয় ছিল না। বরং, মোদি–অমিত শাহর দিক থেকে ভোটের আগেই পরিষ্কার ইঙ্গিত ছিল। একজন শুভেন্দুর সঙ্গে মনোনয়ন জমা দিতে গেছেন। একজন শুভেন্দুর দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, সিএম আর পিএম একসঙ্গে কাজ করলে তবেই রাজ্যের উন্নতি হয়। আর কীভাবে সংকেত দিতে হবে? সেই সংকেতটুকু যাঁরা বুঝতে পারেন না, তাঁরাই রাজনৈতিক ভাষ্যকার হয়ে চ্যানেলে চ্যানেলে চণ্ডীপুজো করে বেড়ান।
অতএব, শুভেন্দুর মুখ্যমন্ত্রী হওয়াটা তাঁদের কাছে ব্রেকিং নিউজ। গলা ফুলিয়ে বলতে হয়, আমাদের কথাই মিলে গেল। কোনদিন বলে বসবে, কাল সকালে পূ্র্বদিকে সূর্য উঠবে। তারপর সকাল হলেই তারস্বরে চিৎকার জুড়বে, আমরাই প্রথম বলেছিলাম, সূর্য পূর্বদিকে উঠবে। আমাদের ভবিষ্যদ্বাণী মিলে গেল। হে মোর দুর্ভাগা বাংলা, এই গণৎকারদের থেকে সাবধান।
বিস্তর গবেষণা করিয়া অবশেষে গবেষকরা এই সিদ্ধান্তে আসিলেন, গরু ঘাস খায়।
