স্বরূপ গোস্বামী
বিধানসভা ভেঙে দেওয়া এই রাজ্যে নতুন কিছু নয়। আগেও হয়েছে। এমনকী বাম জমানাতেও হয়েছে। অথচ কোনও টিভি চ্যানেল বা কোনও ইউটিউব চ্যানেলের আলোচনায় সেই প্রসঙ্গ উঠে আসতে দেখছি না। এখন যাঁরা সাংবাদিকতায় এসেছেন, তাঁদের পুরনো ঘটনা মনে থাকার কথা নয়। তাঁদের অনেকের হয়তো তখন জন্মও হয়নি। বা জন্ম হলেও রাজনৈতিক জ্ঞান হয়নি।
কিন্তু যাঁদের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি, তাঁদের স্মৃতিতে তো মরচে পড়ার কথা নয়। কী সাংবাদিক, কী বিশ্লেষক, কী রাজনৈতিক নেতা বা কর্মী, কারও কথাতেই ১৯৯১ এর বিধানসভা ভাঙার প্রসঙ্গ উঠে আসছে না। কারণ একটাই, এখন যতই বিশ্লেষক হয়ে উঠুন, ছোটবেলায় কাগজ পড়ার সেই রেওয়াজটাই ছিল না। তাই বিষয়টা তখন যেহেতু রেখাপাত করেনি, এখনও মনে পড়ার কথা নয়।
আচ্ছা বামফ্রন্টের ৩৪ বছর কেন বলা হয়? কেন ৩৫ নয়? এই উত্তরটাও অনেকের কাছে স্পষ্ট নয়। মনে প্রশ্নও আসে না। এবং অধিকাংশ লোকের সঙ্গে আলোচনা করে দেখেছি, তাঁরা বিষয়টা সম্পর্কে একেবারেই অবহিত নন। সেই কারণেই বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার বিষয়টির সঙ্গেও তাঁরা পরিচিত নন।
আসলে, ১৯৮৭–র পর বিধানসভা ভোট হওয়ার কথা ১৯৯২ সালে। কিন্তু ভোট হয়েছিল এক বছর আগে, অর্থাৎ ১৯৯২ সালে। হঠাৎ, এক বছর এগিয়ে এল কেন? মাজপথে কি সরকার পড়ে গিয়েছিল? তাও নয়। ১৯৮৯ এর লোকসভা ভোটে রাজীব গান্ধী সরকারের পতন ঘটেছিল। প্রথমে প্রধানমন্ত্রী হলেন ভিপি সিং। সেই সরকার থেকে বিজেপি সমর্থন তুলে নিল। জনতা দলের একটা অংশ ভেঙে আলাদা গোষ্ঠী তৈরি হল। চন্দ্রশেখরের নেতৃত্বে সেই গোষ্ঠীকে বাইরে থেকে সমর্থন করল কংগ্রেস। কিন্তু সেই সরকারও বেশিদিন টিকল না। চার মাসের মাথায় চন্দ্রশেকর আচমকাই পদত্যাগ করে বসলেন। সরকার পড়ে গেল। এমন এক জটিল পরিস্থিতি, কোনও দলই সরকার গড়ার জায়গায় নেই। ফলে, দু বছরের মাথায় আবার লোকসভা ভোট অনিবার্য হয়ে উঠল।
৯১ সালে যদি লোকসভা ভোট হয়, পরের বছর রাজ্যে বিধানসভা ভোট। তখন জ্যোতি বসু একবছর আগেই সরকার ভেঙে দিতে চাইলেন। তিনি রাজ্যপালের কাছে আবেদন জানালেন, বিধানসভা ভেঙে দিয়ে এক বছর আগে বিধানসভা ভোট হোক। অর্থাৎ, লোকসভা আর বিধানসভা ভোট একসঙ্গেই হোক। যেহেতু বামফ্রন্টের তখন নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা, দ্বিতীয় কোনও দল সরকার গড়ার জায়গাতেও নেই, তাছাড়া সরকার নিজেই একবছর আগে ভোট চাইছে। এমন ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে রাজ্যপাল বিধানসভা ভেঙে দিলেন। অর্থাৎ, মেয়াদ শেষ হওয়ার এক বছর আগেই সরকারের পতন হল। এবং তা স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর ইচ্ছায়।
অন্যান্য বছর কেয়ারটেকার সরকারের নেতৃত্বে ভোট হয়। কিন্তু যেহেতু সেবার বিধানসভা ভেঙে দেওয়া হয়, তাই টেকনিক্যালি জ্যোতি বসু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন না। এখনও মনে আছে, রেডিও বা টিভির খবরে জ্যোতি বসু নামটার আগে ‘মুখ্যমন্ত্রী’ বিশেষণটা ব্যবহার হত না। ওই দু–তিন মাস খবরে বলা হত সিপিআইএম পলিটব্যুরোর সদস্য জ্যোতি বসু বলেন ————। বা বলা হত, প্রবীণ সিপিআইএম নেতা জ্যোতি বসু বলেন ...।
এই যে রাজ্যপাল বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার নোটিশ দিলেন, সেটা এই প্রথম নয়। ১৯৯১ এও হয়েছিল। সেবার নির্বাচনের আগে, এবার নির্বাচনের পরে। সেবার স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী ভোটের আগেই পদত্যাগ করেছিলেন, এবার মুখ্যমন্ত্রী ভোটে হারার পরেও পদত্যাগ করেননি। সেবার সরকারের পরামর্শে রাজ্যপাল বিধানসভা ভেঙেছিলেন। এবার সরকার অসৌজন্য দেখানোয় রাজ্যপাল তাঁর সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে বিধানসভা ভাঙলেন।
দুঃখের কথা, বিধানসভা ভাঙা নিয়ে এত আলোচনা, অথচ একানব্বইয়ের বিষয়টি বেমালুম উহ্য থেকে গেল। রাজনৈতিক চর্চায় দৈনতা কতখানি, আরও একবার পরিষ্কার হয়ে গেল।
