স্বরূপ গোস্বামী
কে জিতলেন আর কে হারলেন, গুলিয়ে যাওয়ারই কথা। সাদা চোখে দেখা যাচ্ছে, তৃণমূল হারল আর বিজেপি জিতল। ভোটের ফল বলে দিচ্ছে, মমতা হারলেন আর শুভেন্দু জিতলেন।
এ তো সবাই বোঝে। এর মধ্যে আবার কী জটিলতা? আসলে, কিছু ফল থাকে, যা অদৃশ্যই থেকে যায়। তাই এই হার যতটা মমতার, ততটাই মোদির। শুধু কি মোদির! অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে যেন আয়না দেখিয়ে দিল এই ফলাফল। জনতা কি শুধু মমতা ব্যানার্জি বা অভিষেক ব্যানার্জিকে শিক্ষা দিল? সে আসলে অনেকের গালেই অদৃশ্য থাপ্পড় কষিয়ে দিল।
সিবিআই এবং ইডি। এই দুই প্রতিষ্ঠান গত এক দশকের বেশি সময় ধরে কী সার্কাসটাই না দেখাচ্ছে! অন্তত বাংলার ক্ষেত্রে এই দুই প্রতিষ্ঠানকে ‘ব্যর্থ’ বললে নেহাতই কম বলা হয়। আদালত একের পর এক তদন্ত সিবিআই–এর হাতে তুলে দিচ্ছে। আর তাঁরা তদন্তের নামে কাঁচকলা দেখিয়ে চলেছেন। সারদা, কয়লা, বালি, গরু, চাকরি, আরজি কর— এমন কত মামলা কার্যত কবরে চলে গেছে। দু একটা চুনোপুঁটিকে ধরা। মিডিয়ায় হইচই। ব্যস, এখানেই যাবতীয় জারিজুরি খতম। মাথা তো দূরের কথা, হাঁটু পর্যন্ত পৌঁছনোর ক্ষমতাও নেই। অন্তত এই সিবিআই বা ইডির কাছ থেকে যে কোনও সুবিচার পাওয়া যাবে না, এটা এতদিনে জনতা দিব্যি বুঝে গেছে। এই রায় বুঝিয়ে দিল, তোমাদের মুরোদ বোঝা হয়ে গেছে। যা করার, আমাদেরই করতে হবে। তাই জনতা যা করার করেই দিল। এই রায় কি সিবিআই–ইডির গালে জোরালো থাপ্পড় নয়!
থানার ওসি থেকে এসপি। বিডিও থেকে ডিএম। ব্লক প্রশাসন থেকে রাজ্য প্রশাসন। একেবারেই তল্পিবাহকের ভূমিকায়। আমলাতন্ত্রকে সরকারের নির্দেশ মেনে চলতে হয়, এটা ঘটনা। কোথাও তো একটা সীমারেখা থাকবে। কিন্তু আমলাতন্ত্রের চাটুকারিতা সব সীমাকেই লঙ্ঘন করেছিল। কোনও এক দুর্বৃত্ত ভাইপো জেলায় গেলে সেই এসপি, ডিএম–দের কীভাবে নতজানু হতে হয়, দেখা গেছে! কীভাবে কয়লা পাচার থেকে গরুপাচারে একের পর এক জেলার ডিএম, এসপিরাও জড়িয়ে পড়েছেন। কীভাবে একের পর এক প্রমাণ লোপাট করেছেন। এই রায় কি তাঁদের বিরুদ্ধে নয়! এই রায় কি তাঁদের গালেও সপাটে থাপ্পড় নয়?
মূলস্রোত মিডিয়া। কী কেন্দ্র, কী রাজ্য। চতুর্থ স্তম্ভ কবেই ভেঙে পড়েছে। শাসকের গুণকীর্তন করতে করতে সব সীমারেখাই পেরিয়ে গেছে। সেই গুণকীর্তন কখন যে চাটুকারিতায় বদলে গেছে, দিকপাল মিডিয়া ব্যারনরা বুঝতেই পারেননি। জনতা বুঝে গেছে, এরা আসল ঘটনা দেখাবে না। আলতু ফালতু বিষয় নিয়েই হইচই করে যাবে। যা করার আমাদেরই করতে হবে। একের পর এক দুর্নীতি মিডিয়া যতই আড়াল করুন, মানুষ ঠিক বিচার করেছে, মিডিয়া কী বলল বা লিখল, তার তোয়াক্কা করেনি।
ইদানীং একটা কথা প্রায়ই শোনা যেত, দুর্নীতি ভোটে কোনও ইস্যু নয়। দুর্নীতি করলেও মানুষ তাদের ঠিক ভোটে জিতিয়ে দেয়। অতএব, হিন্দু মুসলিম তাস খেলো। একে অন্যের সঙ্গে লড়িয়ে দাও। মুসলিম, হিন্দু সবাই নাকি ভোট ব্যাঙ্ক। তাই ক্রমাগত সাম্প্রদায়িক উস্কানি চলল। ভোটের ইস্যু হয়ে দাঁড়াল হিন্দু আর মুসলিম। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা এসে এই হিন্দু–মুসলিম বিভাজনে প্রকাশ্যে উস্কানি দিয়ে গেলেন। কিন্তু ভোটের ফলাফলের পর ফুঁসে ওঠা জনতার মুখে কিন্তু হিন্দু–মুসলিম সেভাবে শোনা গেল না। তাঁরা সেই দম্ভ, সন্ত্রাস আর দুর্নীতির কথাই বললেন। নেতারা যতই উস্কানি দিন, জনতা জানে আসল ইস্যু কোনটা। সে দুর্নীতি, সন্ত্রাস আর দম্ভকেই ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলেন। বুঝিয়ে দিলেন হিন্দু–মুসলিম নিয়ে নেতারা যতই লোক খ্যাপান, জনতার কাছে সেটা তেমন ইস্যু নয়। তাহলে, যাঁরা দিল্লি থেকে এসে হিন্দু হিন্দু করে হাওয়া গরম করছিলেন! কোনও সন্দেহ নেই, এই ফল তাঁদের গালেও আস্ত এক থাপ্পড়।
মহামান্য আদালত। বিচারপতিদের কেউ কেউ অনেক ক্ষেত্রেই সরকার বিরোধী ও সাহসী রায় দিয়েছেন। সীমিত ক্ষমতার মধ্যে সুবিচার দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু অনেকে বছরের পর বছর সেইসব মামলা ঝুলিয়েও রেখেছেন। বিশেষ করে সর্বোচ্চ আদালতের ভূমিকা বেশ উদ্বেগের। যে রায় তাঁরা দিয়েছেন, সরকার তাকে মান্যতাই দেয়নি। ডিএ মামলার রায় দেওয়ার পরেও নানা টালবাহানা অব্যাহত। চাকরি বাতিলের রায় দিলেও সরকার নানা অছিলায় ঝুলিয়েই গেছে। আসল অপরাধীদের কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারেনি আদালত। আরজি করের মতো মামলাতেও সুবিচার পাওয়া তো দূরের কথা, আদালত চূড়ান্ত হতাশই করেছে। তদন্তকারী সংস্থা যেমন তদন্ত ঝুলিয়ে রেখেছে, আদালতও তেমনই ‘তারিখ পে তারিখ’ দিয়ে গেছে। শাসক দল ভাল করেই জানত, এই আদালত তাদের কিছুই করতে পারবে না। একের পর এক মামলায় দেখা গেছে, তাদের এই আত্মবিশ্বাস নেহাত অমূলক নয়। খোদ ইডির কাছ থেকে মুখ্যমন্ত্রী ফাইল ছিনতাই করে নিয়ে চলে এলেন। তারপরেও ইডি আর আদালত মাসের পর মাস ঝুলিয়ে রাখল। তারিখের পর তারিখ নিয়ে লুকোচুরি চলল। জনতা হয়তো ভেবেছিল, এই আদালতেও তেমন আস্থা রাখা যায় না। শাসক দল চাইলেই সর্বোচ্চ আদালতকেও প্রভাবিত করতে পারে। অন্তত বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখতে পারে। অতএব, এই রায় সেই আদালতের প্রতিও তীব্র এক অনাস্থা। আদালতের সম্মানের কথা মাথায় রেখে না হয় ‘থাপ্পড়’ শদটা ব্যবহার করলাম না। কিন্তু অনাস্থা তো বটেই। আদালতও এই রায়ের আয়নায় নিজেদের মুখ দেখুক। বিচারপতিরাও একটু আত্মসমীক্ষা করুন।
সর্বশক্তিমান প্রধানমন্ত্রী। গত এক দশক ধরে বাংলায় এসে একই ভাঙা রেকর্ড বাজিয়ে যান। ‘সব দুর্নীতির তদন্ত হবে। অপরাধীরা জেলে যাবে।’ দশ বছর ধরে এমন আস্ফালন করেও তিনি ক্লান্ত হন না। অথচ, কাজের বেলায় অষ্টরম্ভা। সব তদন্তই সিবিআই, ইডির আওতায়। নিট ফল শূন্য। দু একজন চুনোপুঁটি ধরা পড়লেও একে একে দিব্যি জামিন পেয়ে গেলেন। তদন্তের দায়িত্ব তো তাঁর হাতেই ছিল। তিনি চূড়ান্ত ব্যর্থ। আর তিনিই কিনা এসে লম্বা চওড়া ভাষণ দিয়ে গেছেন। এই রায় কি তাঁকেও শিক্ষা দেওয়া নয়! জনতা হয়তো তাঁকেও বুঝিয়ে দিল, আপনার মুরোদ আমাদের জানা হয়ে গেছে। এবার আমাদেরই দায়িত্ব নিতে হবে। যাঁদের আপনি বাঁচাতে চাইছেন, তাঁদের আমরাই এবার শাস্তি দেব। তাই যতই তাঁর দল জিতুক, যতই তিনি বিজয় উল্লাসে মেতে উঠুন, এই রায় আসলে তাঁর ফাঁপা ভাষণের বিরুদ্ধেও জনতার প্রতিবাদ। এক্ষেত্রেও ‘থাপ্পড়’ শব্দটা না হয় নাই বা ব্যবহার করলাম। অন্তত নরম করে ‘উচিত শিক্ষা’ তো বলাই যায়।
প্রধানমন্ত্রীর দলকে জিতিয়ে কিনা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনাস্থা জানানো! হ্যাঁ, গণতন্ত্র এমন আজব কাণ্ডও ঘটাতে পারে। সে সবাইকেই তার মতো করে আয়না দেখিয়ে দেয়।

বাঙালি আজ ডিগ্রিধারী অশিক্ষিত, অলস আর অহংকারী – এই তকমাগুলো এখন আর কেবল সমালোচনা নয়, বরং এটাই রূঢ় সত্য। “কুয়োর ব্যাঙ” হয়ে নিজেদের সীমাবদ্ধ গণ্ডিতে আটকে থাকা এই জাতি আজ আত্মতুষ্টিতে ভুগছে তা সংবাদমাধ্যমের এইধরনের লেখাগুলো পড়লেই বেশ বোঝা যায়।
হবে নাই বা কেন? সত্তর দশকের এই প্রজন্মটা জন্ম থেকেই দেখে আসছে একের পর এক কলকারখানার গেটে তালা ঝুলছে। যে বাংলায় একসময় শিল্পের জোয়ার ছিল আজ সেখানে শুধুই ধ্বংসস্তূপ। একদিকে বন্ধ শিল্প, অন্যদিকে সীমান্তের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদাসীনতা। বিএসএফ-কে যথাযথ কাজ করতে না দিয়ে ‘শরনার্থী’র মোড়কে অনুপ্রবেশকারীদের জায়গা করে দিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে কেবল দুর্বলই করেনি, বরং ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
গান্ধী পরিবারের পদ সেবা করা, নরেন্দ্র মোদীর ডিগ্রির সত্যতা যাচাই করা, জয় শাহ কেন এবং কীভাবে মহিলা ক্রিকেটের উন্নতি করলেন, সেই ঈর্ষায় দিন কাটিয়ে দেওয়া বাঙালি এবং বাংলা মিডিয়া। মূল সমস্যাগুলো এড়িয়ে গিয়ে এই ধরনের তাত্ত্বিক কচকচানি আসলে পলায়নবাদী মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ এটা “সো কল্ড” শিক্ষিত বাংলা মিডিয়া যত তাড়াতাড়ি বুঝবে ততই মঙ্গল?
বাংলার এই অকেজো, ঘুণধরা “কালচার” এবার বদলাতে বাধ্য। বাঙালির এই অহেতুক অহংকার এবার কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হবে। যারা কাজ না করে কেবল এইধরনের তত্ত্ব আওড়ায়, তাদের জন্য সময়ের পরিবর্তন হয়তো খুব একটা সুখকর হবে না।
এমনকি সংবাদমাধ্যমগুলোকেও বুঝতে হবে – শেষপর্যন্ত সেই ব্যবস্থার কাছেই মাথা নত করতে হবে, যারা প্রকৃত অর্থে ক্ষমতা এবং অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ হাতে রাখে।
তৈরি থাকুন, কারণ পরিবর্তনের এই ঢেউ আপনার দরজায় কড়া নাড়ছে।