চারিদিকে লোকজন নেই বললেই চলে। শান্ত, স্নিগ্ধ নির্জন এক বৌদ্ধ মন্দির। চারপাশটা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। ফুলে ফলে সৌন্দর্যে ভরে আছে জায়গাটা। মন্দির তখনও খোলেনি। এদিক ওদিক ঘুরছিলাম। হঠাৎ চোখে পড়ল নানান বয়সী একদল লামা। কী প্রাণবন্ত! কাজ করছে, খেলছে, দুষ্টুমি করছে। একসঙ্গে সবাই বড় হচ্ছে। এখনকার বাচ্চাদের মত হাতে স্মার্ট ফোন নিয়ে জ্যাঠাগিরি করেনি।
এবার আমাদের ঠিকানা ওকেটি। জায়গাটার নাম কয়েকদিনা আগেও জানতাম না। নেটে সার্চ করলে হয়ত পাওয়া যাবে। কিন্তু নামটা জানলে তবে তো সার্চ করবেন। নামটাই যদি না শোনা থেকে যায়, তবে কীভাবে সার্চ করবেন? জায়গাটার সন্ধান দিয়েছিলেন তাবাকোশির বিজয় সুব্বা। প্রথমে তাঁর কাছেই উঠেছিলাম। এরপর কোথায় যাব, তাঁর ওপরই ছেড়ে দিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, আরও একটু উপরের দিকে, নেপাল বর্ডারের কাছে দারুণ একটা গ্রাম আছে। ওকেটি। ওখানে চলে যান। চারপাশে চা–বাগান আছে। ওয়েদার খুব ভাল। আর যে ছেলেটির কাছে পাঠাচ্ছি, সেই ছেলেটি আরও ভাল।
চা-বাগানের জন্য বিখ্যাত ‘পেশক’ থেকে কিছুটা উপরে উঠলেই মেঘের হাতছানি। সবুজ মখমলের মতো বনানী যেন আহ্বান জানাচ্ছে। যেতে যেতে প্রথমে সুন্দরী গোরীগাঁও। গোটা গ্রামে কুড়ি, পঁচিশটি ঘর। এখান থেকে দেখা যায় কালিংপং অার সিকিমের বিস্তৃত অঞ্চল। পরিষ্কার অাকাশ থাকলে কাঞ্চনজঙ্ঘাও দিব্যি দৃশ্যপটে এসে যায়।
সিকিম আবার তার দরজা খুলে দিয়েছে। আবার প্রাণের ডাক দিয়েছে। হ্যাঁ, আবার আমরা যাব। এনজেপি–র সেই গাড়িওলা যতই গ্যাংটক–গ্যাংটক করে চিৎকার করুক, আমরা ছুটে যাবে সেই শান্ত, স্নিগ্ধ পাহাড়ি গ্রামে। আমার কাছে ওটাই আসল সিকিম।
সোনাদা থেকে চটকপুরের রাস্তাটা খুব খারাপ। কিন্তু আমাদের বেশ অ্যাডভেঞ্চারাস লাগছিল। একটা ঝকঝকে দিনে আমরা চটকপুর এসে পৌছলাম। আমাদের ড্রাইভার দাদাও বলছিলেন ‘আপলোগ ধূপ লে করকে আয়ে হো’৷ মাত্র আগের দিনই মেঘলা আকাশ ছিল। যেমনটা ভেবেছিলাম চটকপুর থেকে যে রূপে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে দেখলাম সেটা ভাষায় প্রকাশ করার সাধ্যি নেই। এমনকী কোনও ছবিতেও বোঝানো যাবে না। ক্যামেরার লেন্সেরও সেই সাধ্য নেই। চোখের সামনে প্রত্যক্ষ করলাম বিশাল শায়িত বুদ্ধ৷
অন্তরা চৌধুরি সত্যি কথাটা প্রথমেই স্বীকার করে নেওয়া ভাল। গিয়েছিলাম বাগোড়া। যদিও আগে সেখানে গেছি। অসাধারণ মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। যে কোনও প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের কাছে এই জায়গা বেশ উপভোগ্য। বিশেষত যাঁরা একটু...
ভ্রমণ মানেই কীভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন মার্কা রুটিনমাফিক লেখা নয়। উঠে আসুক আপনার একান্ত নিজস্ব অনুভূতির কথা। জঙ্গলে ভোরের স্নিগ্ধতা বা পাহাড়ের বুকে মেঘ ভেসে বেড়ানো। সবই থাকুক। শুধু জঙ্গলে পায়ে পায়ে হাঁটার কথাও থাকতে পারে। বা পাহাড়ি অচেনা গ্রামে কোনও এক সন্ধের গল্পও থাকতে পারে। কোনও ছোট্ট মোমোর দোকান বা কোনও দাগ কেটে যাওয়া মানুষের কথাও থাকতে পারে।
এই যে হাতি, চিতাবাঘের মাঝে শুয়ে থাকেন, ভয় লাগে না? সাধুবাবা বলতেন, ওদের ভয় পেতে যাব কেন? ওরাও তো আমাকে ভয় পায় না। ওরাও দেখে আমি একা একা এখানে পড়ে থাকি। আমাক মেরে ওদের লাভ কী? ওরাও জানে, কারা ওদের ভালবাসে।
সব মিলিয়ে ২২/২৩ ঘণ্টা অসাধারণ কেটেছিল। হয়তো গরম বলে একটু কষ্ট হয়েছে, বর্ষা বা শীত কালে এই জায়গাটার রূপ অসাধারণ হওয়া উচিত, ইচ্ছে আছে শীতকালে আরেক বার ঢু মারার। শহরের কোলাহল, ব্যস্ততা আর ইট কাঠ পাথরের আবর্জনা থেকে বেরিয়ে খোলা হাওয়ায় সবুজের মাঝে হারিয়ে যেতে হলে একবার ঘুরে আসবেন ‘ভালো ভূতের দেশ’ থেকে। মিশকালো অন্ধকারে ইছামতির ওপর শয়ে শয়ে জোনাকির মিটমিটে আলো আর সঙ্গে পূর্ণিমার ঝকঝকে চাঁদ পেলে তো কথাই নেই।
বিশ্বজিৎ ঘোষ সদ্য একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে, ঝুড়ো লালমাটি বৃষ্টির জল পেয়ে জমাট বেঁধে গেছে। চারপাশের গাছপালা, ঝোপঝাড়গুলি যেন কালচে সবুজ হয়ে গেছে। শুধু কালচে বললে ভুল বলা হবে, সবুজের...