অনেকেই ভাবছিলেন, বিরাট কোনও চমক থাকবে। অনেক হেভিওয়েট হয়তো বাদ পড়বেন। বিনোদন জগতের অনেক তারকা হয়তো প্রার্থী হয়ে যাবেন। বাস্তবে তেমন কিছুই দেখা গেল না। চমক নেই, এটাই বড় চমক।
আসলে, যাঁকে তাঁকে, যেখান থেকে হোক দাঁড় করিয়ে দাও। গত দেড় দশক ধরে এটাই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তিনি রাজনীতির কিছু বুঝুন বা না বুঝুন, একটাই বুলি শোনা যেত, মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। এমন লোকেরা অনেক সময় জিতেও যেতেন। পাঁচ বছর ধরে এলাকার মানুষকে এই অর্বাচীনদের হজম করতে হত।
বলতে দ্বিধা নেই, এবারের প্রার্থী তালিকায় সেই অর্বাচীনদের ভিড় অনেকটাই কম। এটা অবশ্যই ভাল দিক। তাৎক্ষণিক দলবদলুদের ভিড় কম। এটাও একটা ভাল দিক। সত্যি কথা বলতে গেলে, তৃণমূলের পক্ষে এর থেকে ভাল প্রার্থী তালিকা আর কীই বা হতে পারত!
অনেকে ভেবে নিয়েছিলেন, পুরনোদের অনেকেই বাদ পড়বেন। এসব জল্পনা তুলে হাওয়া গরম করা যায়। কিছু ইউটিউব চ্যানেলের ভিউয়ার বাড়ানো যায়। কিন্তু বাস্তবে এমনটা হওয়ার ছিল না। পুরনোদের মমতা ব্যানার্জি এক কথায় ছেঁটে ফেলবেন, এমনটা যাঁরা মনে করেন, তাঁদের সঙ্গে বাস্তবের যোগসূত্র বড়ই কম। আবার নতুন মুখেদের জায়গা হবে, এটাও মোটামুটি জানাই ছিল। সবমিলিয়ে পুরনো আর নতুনের মোটামুটি একটা ভারসাম্য আছে।
একেবারে দাগিদের কেউ কেউ বাদ পড়েছেন। যথা, পার্থ চ্যাটার্জি, মানিক ভট্টাচার্য, জীবনকৃষ্ণ সাহা ইত্যাদি ইত্যাদি। শুধু টাকার জোরে প্রার্থী হয়েছেন, এমন নাম যেমন আছে, পাশাপাশি কোনও আনুগত্যকে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, এমন উদাহরণও অজস্র।
কোনও সন্দেহ নেই, এবার তৃণমূলের তালিকা অনেক বেশি দায়িত্ববোধেরই পরিচয় দিয়েছে। কোনও দল দীর্ঘদিন শাসনক্ষমতায় থাকলে তার সামনে নানা চ্যালেঞ্জ এসে হাজির হয়। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার হাওয়া তো থাকেই। কোথাও দুর্নীতি, কোথাও ঔদ্ধত্যও লাগামছাড়া যায়। তালিকায় চোখ বোলালেই বলা যায়, দীর্ঘদিন ধরে নানা সমীক্ষা চালিয়ে, নানা স্তরের মানুষের মতামত নিয়ে এই তালিকা তৈরি হয়েছে। কাউকে প্রার্থী করার ক্ষেত্রে বা কাউকে বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রেও দীর্ঘ প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার ছাপ রয়েছে।
প্রথমত, যাঁদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ দুর্নীতির অভিযোগ আছে, এমন অধিকাংশ বিধায়ককেই আর টিকিট দেওয়া হয়নি। এটাও একটা ইতিবাচক বার্তা। কাউকে কাউকে প্রার্থী করা হলেও কেন্দ্র বদল করা হয়েছে। অর্থাৎ, স্থানীয় মানুষের অভিযোগকে মান্যতা দেওয়া হয়েছে। বিনোদন জগতের লোকেদের উপস্থিতি এবার তুলনামূলক কম। যাঁরা ছিলেন, অথচ ঠিকঠাক দায়িত্ব পালন করছিলেন না, তাঁদের অনেককেই অব্যহতি দেওয়া হয়েছে। নতুন করে কাউকে টিকিট দেওয়া হয়নি। এটাও একটা ইতিবাচক বার্তা।
অনেকে ক্ষুব্ধ হবেন, অনেকে দল ছাড়ার হুমকিও দেবেন। কিন্তু এইসব ফাঁপা হুমকির মেয়াদ একদিন বা দুদিন। দ্রুত তাঁরা বুঝে যাবেন, যাঁদের অনুগামী মনে করেছিলেন, তাঁদের কেউই পাশে নেই। অনেকে বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। এবার বিশেষ হালে পানি পাবেন না। কারণ, এবার বিজেপিও দলবদলুদের ঢালাও টিকিট দেবে না। ফলে, বিদ্রোহ অচিরেই ফিকে হয়ে যাবে। তাঁরা যে সাবোতাজ করবেন, সেই ক্ষমতাটুকুও নেই। বেসুরো গাইলে কী হতে পারে, তাঁরা ভালই বোঝেন। আইপ্যাকও ড্যামেজ কট্রোলে নেমে পড়বে। এখন দলের মূলস্রোতে থাকলে পরে কী কী সুবিধা পাওয়া যাবে, সেই অঙ্ক বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
ফলে, বাদ যাওয়া বিধায়কদের এই ক্ষোভ বিক্ষোভ দু–তিনদিন টিভি আর সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘোরাফেরা করবে। তারপর অচিরেই মিলিয়ে যাবে। কোনও সন্দেহ নেই, প্রার্থী নির্বাচনের সাংগঠনিক প্রস্তুতিতে এবার তৃণমূল অনেক এগিয়ে। সঙ্গে আইপ্যাক, পুলিশ, মিডিয়া তো আছেই। অর্থবল, বাহুবলেরও অভাব নেই।
নির্বাচন কমিশন! যতই গর্জন করুক, তারা আসলে সিবিআই আর ইডির মতোই অশ্বডিম্ব প্রসব করবে। তাঁরা কতখানি অপদার্থ হতে পারেন, এসআইআর কাণ্ডে তা বেশ ভালমতোই বোঝা গেছে। আপাতত নানা অফিসারকে বদলি করে কিছুটা হাওয়া গরম করার চেষ্টা হবে। নির্বাচন এগিয়ে আসুক, তখন বুঝতে পারবেন কেন্দ্রীয় বাহিনী আর নির্বাচন কমিশন সেই আগের ধারাবাহিকতাই বজায় রেখেছে।
