রক্তিম মিত্র
একটি লোকের সুগার। সঙ্গে মুখে আঁচিল। সুগারটা বাইরে থেকে বোঝা যায় না, আঁচিলটা বোঝা যায়। তাই তিনি সুগারের চিকিৎসা না করিয়ে আঁচিলের শৌখিন চিকিৎসা করিয়ে চলেছেন। মাস ছয়েক পর আঁচিল হয়ত কমল, কিন্তু সুগার বাড়তেই থাকল। যা আরও কয়েকটা রোগকে ডেকে আনল।
সুগার একটা উদাহরণমাত্র। আরও বড়সড় কোনও রোগও হতে পারত। আসল রোগটা না জানলে, নকল রোগ নিয়েই হইচই করতে হয়। নিঃশব্দে আসল রোগটা বেড়ে যায়। রাজ্য সরকারের কর্মকাণ্ড যত দেখি, ততই অবাক হই। এরা রোগগুলোই জানে না। জানার সময়ও নেই, ইচ্ছে ও নেই। এত ধৈর্য্যও বোধ হয় নেই। তাই চমক দেখানো হয়, ওপর থেকে পটি মারা হয়। সেগুলো নিয়েই আমরা মেতে উঠি। আসল সমস্যা আড়ালেই থেকে যায়।
একেবারে সাম্প্রতিক মন্ত্রীসভা দরবদলের কথাতেই আসা যাক। এই সরকারে যোগ্য মন্ত্রী নেই, এমন নয়। অনেকেই আছেন, কাজটা বোঝেন। কিন্তু কার হাতে কোন দপ্তর থাকা উচিত, সেটাই বোধ হয় প্রশাসনিক প্রধান ঠিকঠাক বোঝেন না। বুঝলে, দপ্তরগুলো নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলতে পারতেন না। সম্প্রতি কৃষিমন্ত্রী করা হল আশিস ব্যানার্জিকে। আশিসবাবু কলেজে পড়াতেন, ডক্টরেট মানুষ (মন্ত্রী হওয়ার পর তাঁকে ডক্টরেট করতে হয়নি)। যে কয়েকজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী আছেন, তাঁদের অন্যতম। কখনও আবোল তাবোল কথা বলতে শুনিনি। শিক্ষার মর্যাদা রাখেন। এই মন্ত্রীসভায় যাঁরা আছেন, আশিসবাবু হতে পারতেন আদর্শ শিক্ষামন্ত্রী। অন্তত বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর থেকে তিনি এ ব্যাপারে অনেক এগিয়ে থাকেন। দীর্ঘদিন শিক্ষা জগতের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন। সমস্যাগুলো বোঝেন, সমাধানের উপায়টাও অন্যদের থেকে ভাল জানেন। দীর্ঘমেয়াদি একটা চিন্তাভাবনা আছে। গত টার্মে একবার তাঁকে এমওএস করাও হয়েছিল। কিন্তু কী আর করবেন? মাথার ওপর যদি পার্থবাবু থাকেন, তাঁর কিছুই করার নেই। কোনও সন্দেহ নেই, আশিস ব্যানার্জি অনেক বেশি যোগ্য শিক্ষামন্ত্রী হতে পারতেন। কিন্তু পাঠিয়ে দেওয়া হল কৃষি দপ্তরে। যিনি আদর্শ কৃষিমন্ত্রী হতে পারতেন, তাঁকে মন্ত্রী করাই হল না। অসীমা পাত্রকে দেওয়া হল পরিকল্পনা ও পরিসংখ্যান দপ্তর। দপ্তরটার গুরুত্ব বুঝলে যিনি গ্র্যাজুয়েটও নন, এমন একজনকে এই দপ্তর দেওয়া যেত না। মমতা সরকারের প্রথম দফায় গ্রন্থাগার দপ্তরের দায়িত্বে কে ছিলেন? আব্দুল করিম চৌধুরি। যিনি বাংলা পড়তেই পারেন না। দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলোর নামই বলতে পারবেন না। বীরসিংহগ্রাম, চুরুলিয়া বা খানাকুল কোন জেলায়, বলতে পারবেন না। পরে গ্রন্থাগার মন্ত্রী কে হলেন? সিদ্দিকুল্লা চৌধুরি। যিনি সুপ্রিম কোর্ট খারিজ করে দেওয়ার পরেও তালাকের পক্ষে কথা বলে লোক ক্ষেপাচ্ছেন। এমন চিন্তার মানুষ গ্রন্থাগার দপ্তরে? গ্রন্থাগার দপ্তরের প্রতি সামান্য শ্রদ্ধা থাকলে এমন লোকদের বসানো যায়?
আবার শিক্ষাদপ্তরেই আসা যাক। শিক্ষাসংক্রান্ত বিভিন্ন দাবিদাওয়া ও প্রস্তাব নিয়ে মাঝে মাঝেই শিক্ষক সংগঠন, ছাত্র সংগঠন শিক্ষান্ত্রীদের দ্বারস্থ হয়েছেন। তাঁরা পার্থবাবু ও আশিসবাবু দুজনের সঙ্গেই নানা সময়ে দেখা করেছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতায়, আশিসবাবু সব ব্যাপারেই অনেক এগিয়ে। আশিসবাবুকে দেখে অনেক বেশি শিক্ষামনষ্ক মনে হয়েছে। তুলনায় পার্থবাবুর সঙ্গে দেখা করে তাঁদের অনেকের মনে হয়েছে, এই মানুষটা শিক্ষাসংক্রান্ত ব্যাপারগুলো সেভাবে বোঝেনই না।
পার্থবাবু শিক্ষাসংক্রান্ত বিষয়ের সঙ্গে সেভাবে যুক্ত ছিলেন না। শেখার ইচ্ছে থাকলে দায়িত্ব নেওয়ার পরেও কিছুটা অন্তত শিখতে পারতেন। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রীকে কী বলতে হয়, কী বলতে নেই, এই বোধটুকুও তাঁর থাকে না। অধিকাংশ সময় কথা শুনেই মনে হয়, শিক্ষা থেকে এই মানুষটা অনেক দূরে। কিছু কিছু মন্ত্রীকে দৈনন্দিন রাজনীতি থেকে দূরেই থাকতে হয়। শিক্ষামন্ত্রীর পদটাও অনেকটা সেরকম। তাঁকে যতটা সম্ভব নিরপেক্ষ থাকতে হয়।

কিন্তু পার্থবাবু আবার দলের মহাসচিব। দলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব থেকে শুরু করে ছাত্রদের নানা কোন্দল তাঁকে সামলাতে হয়। যে লোকটা ঠিক করছেন ছাত্র ইউনিট কে দেখবেন, সেই লোকটাকে শিক্ষামন্ত্রী মানা যায়? তাঁর শিক্ষাসংক্রান্ত বিষয়ে ভাবার সময় কোথায়? স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির গঠনতন্ত্র কী, ডি আই বা এস আইয়ের কাজটা কী, প্রিন্সিপালকে কী কী করতে হয়, ইউজিসি–র কী কী নির্দেশিকা আছে, সিলেবাস বা পরীক্ষার পদ্ধতি কী, পেনসনের জন্য কী কী কাগজ লাগে, এগুলো সম্পর্কে তাঁর পরিষ্কার ধারনা আছে? কথা শুনে তো মনে হয় না। তাই সব ব্যাপারেই আলটপকা মন্তব্য করেন। তাঁর আগে কারা এই রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন, তাঁদের কজনের নাম জানেন, সেটা নিয়েও সন্দেহ আছে।
যে মানুষটা শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার পর সেই ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে পিএইচডি করেন, এবং সেই গাইডকে উপাচার্য বানিয়ে দেন, তাঁকে আর যাই হোক, ‘শিক্ষিত মানুষ’ বলা যায় না। এমন নৈতিকতা নিয়ে একটা মানুষ শিক্ষামন্ত্রী থাকতে পারেন! সারা ভারতে এমন নজির নেই। বিহার বা উত্তরপ্রদেশেও এমন ন্যাক্কারজনক উদাহরণ নেই।
মুশকিল হল, সাধারণ মানুষ এসব নিয়ে ভাবেনও না। তাঁরা হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক এসব নিয়ে দিব্যি মেতে আছেন। গরু, হনুমান, এসব তো আছেই। শিক্ষকদের বড় একটা অংশ ডি এ নিয়ে যতটা চিন্তিত, তার সিকিভাগ চিন্তাও শিক্ষার পরিকাঠামো নিয়ে নেই। ডি এ বেড়ে গেল। আর চিন্তা নেই। আর কোনও সমস্যাও নেই। আঁচিলের চিকিৎসা চলুক, সুগার নিঃশব্দে বাড়তে থাকুক।

