সত্রাজিৎ চ্যাটার্জি
ধর্ষণে অভিযুক্ত একজন বিকৃত রুচির মানুষ দোষী সাব্যস্ত হওয়াতে সেই রায়ের বিরুদ্ধে এক শ্রেণীর মানুষের বিক্ষোভ প্রদর্শন থেকে শুরু করে রাস্তা অবরোধ, যানবাহন তথা সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা, গোলাগুলি চালানো—ফলস্বরূপ প্রায় ৪০ জন মানুষের মৃত্যু। হরিয়ানা, পাঞ্জাব, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ এই চারটে রাজ্য আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে এক কামুক, দুরাচারী, ভণ্ড মানুষের সমর্থনে তাঁর সমরুচির হাজার হাজার তাঁবেদারের এই তাণ্ডব প্রত্যক্ষ করল। ভারতবর্ষের সমাজ, সভ্যতাটা আজ এই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে!!
তবে এই দৃশ্য একেবারেই নতুন নয়। দেশের অন্যান্য রাজ্যেও অতীতে আদালতের রায়ে নানা অপরাধে অভিযুক্ত মানুষের সমর্থনে তার কিছু পেটোয়া ভক্ত বা চাটুকার বা তাঁবেদারদের এই বিক্ষোভ বা শক্তি প্রদর্শন দেখা গেছে।
আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গেও এই ঘটনা নতুন নয়। সারদা মামলায় বাংলার সরকারের তাবড় তাবড় নেতা-মন্ত্রীরা সিবিআই এর হাতে বন্দী হওয়ার পরে “চক্রান্তের” অভিযোগ তুলে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী রাস্তায় মিছিল করেছিলেন “আমরা সবাই চোর” লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে। এবং সেই মিছিলে তার কিছু পদলেহনকারী বা তাঁবেদাররাও তাঁর আদেশেই হোক, বা নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব জানান দিতে হোক, বা সরকারি সুবিধা ভোগ করার অভিপ্রায়েই হোক, এক শ্রেনীর “চাটুকার” রুপী সমাজের “বিশিষ্ট” মানুষেরা রাস্তায় নেমেছিলেন।
সেখানেও দেশের সর্বোচ্চ আদালত বা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশেই সিবিআই এই তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করেছিল আর বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ও তার দলের নেতা-কর্মীদের অভিযোগ প্রত্যক্ষভাবে কেন্দ্র সরকারের অধীনস্থ গোয়েন্দা সংস্থার প্রতি থাকলেও প্রকারান্তরে সেই মহামান্য আদালতের দিকেই ছিল।
বস্তুতঃ সমাজ, সভ্যতাটা আজ এই একশ্রেণীর ক্ষমতালোভী,স্বার্থান্বেষীদের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি আর মানুষের আস্থা নেই। আদালতও পেশ করা প্রমাণের ওপরেই বিচার-বিবেচনা করে তবেই কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারে এবং কোনও অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত বা নির্দোষ ঘোষণা করতে পারে। কিন্তু সেই সাক্ষ্যপ্রমাণ পেশ করার পদ্ধতিটিও যদি অস্বচ্ছ হয় বা রাজনৈতিক কারণে তাতে ইচ্ছাকৃত বিলম্ব করা হয় বা উপযুক্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ পেশ না করা হয়, তাহলে আদালতেরও বিশেষ কিছু করার থাকে না। সেইরকম অভিসন্ধির কারণেই সারদা কাণ্ডে জড়িত সব অভিযুক্ত কোনও এক অজ্ঞাত “মন্ত্রবলে” জামিন পেয়ে যায়।
এই ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা অনেকটা তাই। তবু Better Late Than Never.সুদীর্ঘ ১৫ বছর হলেও আদালত তার রায় ঘোষণা করেছে । কিন্তু সেই রায়ের বিরুদ্ধে যে অরাজকতা ও বর্বরতার সাক্ষী থাকল উত্তর ভারতের কয়েকটি রাজ্য, তা দেশের সভ্যতার পক্ষে এক ভয়ঙ্কর। একমাসও হয়নি উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুরেই হাসপাতালে অক্সিজেনের অপ্রতুলতার কারণে শতাধিক শিশুমৃত্যু ঘটেছে। অথচ তার বিরুদ্ধে তো এরকম “দাবানল” ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়নি। এ বছর বাংলায় বিশেষতঃ উত্তরবঙ্গে ভয়াবহ বন্যায় কয়েক হাজার মানুষ গৃহহারা, নিরন্ন, অভুক্ত,অসহায়। জনজ়ীবন বিপর্যস্ত সম্পূর্ণভাবে। আর রাজ্যের প্রশাসন ততটাই উদাসীন সেই বন্যার্ত মানুষদের প্রতি। আজ ইলিশ উৎসব, কাল তারকার সমাবেশ, টানা চারদিন গণেশ পুজোর ধুমধাম—মুখ্যমন্ত্রী তথা বাংলার প্রশাসনের এটাই কর্মসূচী। কিন্তু তার বিরুদ্ধে তো জনগণের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ এমন ভয়ঙ্কর আকারে দেখা যায়নি। অথচ সেই রাজ্যেই “চোরেদের” সমর্থনে মানুষ মিছিলে হাঁটছে। সেই দেশেই ধর্ষকের মতো বিকৃতরুচির এক “নরপশুর” সমর্থনে মানুষ দাঙ্গা-হাঙ্গামা করছে।
স্বাধীনতার ৭০তম বর্ষে এসেও কি আদৌ ভারতবর্ষ সভ্য হয়েছে ?

