Sonata ….সাহসী হলেন না অপর্ণা

চন্দন রায়

Sonata প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ২১শে এপ্রিল, ২০১৭। কিন্ত বিপুল সম্ভাবনাময় হওয়া সত্তেও কলকাতার সমস্ত মাল্টিপ্লেক্স থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে এই সিনেমা অন্তর্হিত হয়। শোনা যায়, বাহুবলী-২ এর দাপটেই নাকি এই পরিণতি। যদিও দিল্লি, ব্যাঙ্গালোর, মুম্বই, পুনেতে আরও টেনেটুনে এক বা দু সপ্তাহ চলেছিল এই ছবি। তারপর অবশ্য বিদেশে পাড়ি দেয় এই ছবি এবং তুলননামূলকভাবে অনেক বেশি সমাদৃত হয়। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন states -এ এই ছবি house full show হয়, এবং সম্ভবত সেই কারণে you tube-এ মার্চ, ২০১৮ হয়ে যায় ছবিটি মুক্তি পেতে পেতে। ক্যালেন্ডারের মাসে ততদিনে ১১পাতা উল্টে গেছে। দীর্ঘ শবরীর প্রতিক্ষা !! ভালোলাগাটাও তাতে কিছুটা আলাদা মাত্রা পায়, আর সেই তাগিদেই এই চিত্রসমালোচনা।

আলোচনাটা শুরু করতে চাই Emily Dickinson-র কবিতাটা দিয়েই,

” Because I could not stop for Death

He kindly stopped for me-

The Carriage held but just Ourselves

And Immortality ..”

যে পরিনতিবোধ আর চিন্তার সংমিশ্রণে এই ভাবনার উন্মেষ……তার সঙ্গে আসন্ন মৃত্যুর এক গভীর সংযোগ আছে। মৃত্যু অনিবার্য বলেই তো মানুষ অমরত্বের বাসনা করে….পৃথিবীর বুকে রেখে দিয়ে যেতে চায় তার শ্রেষ্ঠ সৃজনটুকু। Emily Dickinson-র এই কাব্য ভাবনার এক গভীর পরশ পরে অধ্যাপিকা অরুণা চতুর্বেদী ও বান্ধবী দোলনের ওপর। আর তারই অদৃশ্য এক ব্যঞ্জনা Sonata -কে আবৃত করে রাখে শেষ সময় পর্যন্ত।

sonata4

অরুণা সংযত, আত্মনিমগ্ন, কোমলমনা । সংস্কৃতের অধ্যাপক হিসেবে খেয়াল আর ঠুংড়ী শুনেই হয়তো জীবন চলে যেত, যদি না জীবনে দোলন সেনের মতো বন্ধু না আসত। দোলন বহুজাতিক ব্যাঙ্কের উচ্চপদে কর্মরত। অরুণার অবসর সময়ে বীঠোভেনের বাখ, মোৎজার্ট থেকে মুনলাইট Sonata শোনবার আগ্রহ জন্মায় দোলনের জন্যই। দোলন প্রাণ-চঞ্চল, মুক্তমনা, আবেগপ্রবণ। যথেষ্ট আয় ও যথেচ্ছ ব্যয় করেই সে জীবনের আনন্দ খঁজে পায়। অপরিমিত খাদ্য, পোষাক, সুগন্ধী, সিগারেট এবং ওয়াইন – এই দিয়ে মোড়া জীবন এই বঙ্গতনয়ার। অরুণার প্রতি তার ভালোবাসা আর আকর্ষণ দুটোই বেশ চোখে পড়ার মতো, যদিও রাশভারী এবং সংযমী অরুণার কারণে সেই আবেগ স্তিমিত হয়ে যায়।

অপর একটি চরিত্র হচ্ছে সুভদ্রা পারেখ। দুর্দম বন্য যৌনতার আসঙ্গ তার প্রিয়। ‘সংগ্রাম’ বলে এক গ্যারেজ মালিকের সঙ্গেই রোলারকোস্টার জীবনযাত্রা এই দৃঢ়চেতা সাংবাদিকের। অরুণা-দোলনের দীর্ঘদিনের বন্ধু এই সুভদ্রা। আর এক কলেজের বন্ধু হলেন সমীর। যিনি সেক্স রি-অ্যাসাইনমেন্ট সার্জারি করে এখন মীরা। এই চারটি নারীর চরিত্র চার রকম। কেউই বিবাহিতা নন। অথচ প্রত্যেকের জীবনেই কোনও না কোনও পুরুষ আছেন বা এসেছেন। আর সেইরকম একজন পুরুষই হলেন অবিনাশ (কল্যাণ রায়), একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী । অরুণা এবং দোলনের জীবনের দুটি বড় গোপন সত্য উদ্ঘাটিত হয় ২৬ নভেম্বর, ২০০৮-র রাত্রেই।
প্রথমটি হল অরুণার পুরস্কার পাওয়া গল্পের প্রধান চরিত্রে দোলনের নিজের ছায়া দেখতে পাওয়া নিয়ে। এক অবদমিত যৌন কাতরতার ইঙ্গিত থাকে সেই চরিত্রে, যখন তখন যাকে খুশি ছোঁয়, চুমু খায়। দোলনের আত্মসম্মানে গভীর আঘাত লাগে সেই বই পড়ে। সে ভেবে পায় না তার হার্দিক সরল ব্যবহারকে কীভাবে বইয়ের চরিত্রে বিকৃতভাবে জীবন্ত করে তুলতে পারে অরুণা! দুটি মধ্যবয়সী নারীর মান-অভিমানের সেই মর্মস্পর্শী অংশ নিঃসন্দেহে প্রশংসা পাবার যোগ্য।

পরের সত্যটি দোলন নিজে উন্মোচিত করে…. অরুণা যেদিন দোলনের মারফত অবিনাশের সঙ্গে সম্পর্কের প্রস্তাব নাকচ করে পাঠায়, সেইদিন-ই এক অদ্ভুত দুর্বলতার মধ্যে অবিনাশের সঙ্গে শারীরিকভাবে জড়িয়ে পড়েছিল দোলন। কতদিন আগের কথা ! অথচ এতদিন পরেও সেকথা উঠতে, এক বিচিত্র অাবহ রচনা হয়….। .অরুণার জিজ্ঞাস্য, এতদিন পরে দোলনের এই কথা বলার কারণ কি নিজের অপরাধবোধকে হাল্কা করবার জন্যই ?

সবশেষে ছবির শেষ ধাক্কা আতঙ্কবাদী আক্রমন এবং …..না এটুকু তোলা থাক, আপনার নিজের চোখের উপভোগের জন্য।

অনেকেরই প্রশ্ন যে অপর্ণা নারী জীবন, নারী মুক্তি , সর্বোপরি নারী তথা মানবিক উন্নয়নের দিকে নতুন আলোর পথ দেখান। সে পথ বিতর্কিত, সাহসী কিন্তু অবশ্যই অপটিমিস্টিক। এখানে একটা হতাশাবোধ গ্রাস করেছে চিত্রনাট্যের বুনোট-কে। ঋতুপর্ণ ঘোষের ছায়া অবশ্যই পড়েছে চিত্রপরিচালিকা মীরার চরিত্রে। তাঁর অসময়ে চলে যাওয়া কি এই ছবিতে কোনও ছায়া ফেলেছে ?

মধ্যবয়সে নানা উচাটান আর বিলাসবহুল একাকীত্বের মধ্যে একটু আলোর ছটা নিয়ে হল থেকে বেরোতে হয়তো অনেক দর্শকই চেয়েছিলেন। কিন্তু একই দৃশ্যপটে এই তিন বিগতযৌবনার নানা হতাশার দীর্ঘ আলাপচারিতা অনেক দর্শককেই হয়তো অধৈর্য করে তুলবে।।

যদিও মধ্যবয়স্ক পুরুষ বন্ধুদের নানা শালীন-অশালীন গল্প নিয়ে এযাবৎ মেনস্ট্রিম সিনেমার সংখ্যা কিছু কম নেই। কিন্তু কেবলমাত্র মধ্য বয়স্ক মহিলাদের নিয়ে এমন ছবি সত্যিই বিরল। তবে, অনেকেরই ক্ষোভ মধ্যবয়সের অবিবাহিত নারীদের সংকট নিয়েই যখন কথা বললেন অপর্ণা, নারী-সমকামের মতো স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ সযত্নে এড়িয়ে গেলেন কেন ? মহেশ এলকুঞ্চাওরের মারাঠি নাটক-কে চিত্ররূপ দিতে গিয়ে বেশকিছু পরিমার্জন হয়তো এনেছেন। কিন্তু সুযোগ থাকা সত্তেও অতিরিক্ত সাহসিকতা দেখিয়ে বিতর্কের ঝড় তুলতে চাননি, অপর্ণা সেন। বরঞ্চ অরুণার গভীর প্রজ্ঞা আর দর্শনবোধ দেখিয়ে….গা বাঁচিয়ে গেছেন। এটা হয়তো ‘পরমা’-র নির্মাণকারীর কাছে অনেকেই আশা করেননি।

sonata2

প্রশংসা করতেই হবে দোলন এবং সুভদ্রার চরিত্রে শাবনা ও লিলেটের অভিনয়। শাবনার অভিনয় দু একটা জায়গায় চড়া লাগলেও লিলেট নিখুঁত। অনবদ্য অনুসূয়া মজুমদারও। অপর্ণা সেন দুই পাওয়ার হাউস অভিনেত্রীর পাশে কিছুটা ম্লান। তবে তার গ্ল্যামার ও উপস্থিতিই এই ছবিকে আলাদা মাধুর্য দিয়েছে, তিনিই আদতে এই ছবির fulcrum. অসাধারণ লেগেছে এই ছবিতে গানের মূর্ছনা (রবীন্দ্রসঙ্গীত) আর সুরের ব্যবহার। শাবনা আজমীর কন্ঠে যে এত সুর….তার প্রশংসা করতেই হবে।

আর সবশেষে বলব অন্দরসজ্জা। অপর্ণাকে যারা ঘনিষ্ঠভাবে চেনেন, তারা বলেন এই বিষয়ে তাঁর পারদর্শিতার কথা। অপর্ণা হোটেলে বেড়াতে গেলেও ঘরের আসবাব রিডাজাইন করে নেন । তাই Sonata-র সেট দেখে দর্শকদের অপার মুগ্ধ হতেই হবে।

তবে দুর্ঘটনা, মৃত্যু আর আতঙ্কের খবর যা এখন টিভি খুললেই জলভাতের মতো মনে হয়। আলাদা করে বেদনায় দীর্ণ করেনা….তেমনই এক দুর্ঘটনার সংবাদ প্রদর্শনের মধ্যে দিয়ে শেষ হয় এই ছবি। মৃত্যু-ও যেন এক অনির্বচনীয় বোধে উত্তীর্ণ করে অরুণা-দোলনকে……দিনটা যে মীরার জন্মদিনও।

“আজি ঝড়েররাতে তোমার অভিসার / পরান-সখা বন্ধু হে আমার …..।।”

সুস্থ থাকুন অপর্ণা সেন….আমরা অপেক্ষা করে থাকব পরের ছবি ‘ঘরে বাইরের’ জন্য।

Previous post সামনের মরশুমেও দায়িত্বে সুভাষ?‌
Next post নৃসিংহপ্রসাদকে রাজ্যসভায় পাঠানো গেল না!‌

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *