কাকাবাবুকে অহেতুক অমিতাভ বচ্চন বানানোর চেষ্টা। কোনও দরকার ছিল না। তিনি যেমন, তেমনটাই থাকুন। ইয়েতি অভিযান দেখে নিজের অনুভূতি মেলে ধরলেন গোপাল রায়।।
পুজোর আগে কাকাবাবু! দেখতে কার না ইচ্ছে করে? আমাদের ছোটবেলাটা কেটেছে ফেলুদা–কাকাবাবু পড়ে। পুজো আসা মানেই ফেলুদা, কাকাবাবু, পাণ্ডব গোয়েন্দা। সত্যজিৎবাবু চলে গেলেন। ফেলুদা হারিয়ে গেল। কমিক্সে আছে, কিন্তু তাতে সেই তৃপ্তি নেই। সুনীল গাঙ্গুলি চলে গেলেন। পুজো সংখ্যা থেকে কাকাবাবুও হারিয়ে গেলেন। ষষ্ঠীপদবাবু এখনও লিখে চলেছেন। তাই পাণ্ডব গোয়েন্দাকে পাচ্ছি। মাঝ বয়সে এসে গেলেও এখনও পাণ্ডব গোয়েন্দা পড়ার জন্য অপেক্ষায় থাকি।
অনেক আশা নিয়ে সৃজিত মুখার্জির ইয়েতি অভিযান দেখতে গেলাম। বইয়ে না পাই, অন্তত পর্দায় কাকাবাবুকে পাওয়া যাবে। ‘পাহাড়চূড়ায় আতঙ্ক’ উপন্যাসটা অনেক আগে পড়া। অনেকদিন ধরেই শুনছি সুইটজারল্যান্ডে শুটিং হবে। এতে বিশেষ রোমাঞ্চিত হইনি। ইদানীং পরিচালকরা কথায় কথায় অহেতুক বিদেশ ছুটছেন। ভাবছেন, একবার আল্পস, সুমেরু, অ্যামাজন এসব জায়গায় পৌঁছে গেলেই বুঝি বিরাট কিছু চমক দেখানো হয়ে গেল। প্রোডিউসারের টাকা আছে, অকারণে বিদেশ যেতেই পারেন। কিন্তু দর্শকদের এত বোকা ভাবার কি সত্যিই কারণ আছে? যাঁরা কাকাবাবু পড়ে বড় হয়েছে, এই সস্তা চমক দিয়ে তাঁদের ভোলানো সত্যিই একটু কঠিন।

কাকাবাবু মানে কী? ছোট থেকেই কতগুলো ছবি মনের মধ্যে গেঁথে গেছে। একজন লেখাপড়া জানা, বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ, সাহসী মানুষ। যাঁর রসবোধ আছে। যিনি ইতিহাস জানেন। আবার ভবিষ্যতের ছবিটাও যেন বুঝতে পারেন। ছোট ছোট সংলাপের মধ্যে কত অজানা কথা লুকিয়ে থাকে। অথত, একবারও মনে হয় না, অকারণে জ্ঞান দিচ্ছেন। এভাবে নিজেদের অজান্তেই কতকিছু জানা হয়ে যেত। কত কৌতূহলকে উস্কে দিতেন।
না, সেই কাকাবাবুকে খুঁজে পেলাম না। মিশর রহস্যে তবু কিছুটা খুঁজে পেয়েছিলাম। এমন একজন মানুষ যাকে ভালবাসা যায়, শ্রদ্ধা করা যায়, শিক্ষক ভাবা যায়। কিন্তু ইয়েতি অভিযানের কাকাবাবুকে অহেতুক ‘ফিল্মের হিরো’ বানাতে গেছেন। বরফের তলায় গুহার সন্ধান। সেখানে চল্লিশ পঞ্চাশজন দস্যুকে একাই নাকানি চোবানি খাওয়াচ্ছেন। বিস্ফোরণের পরেও দিব্যি বেঁচে থাকছেন। অতি মানব দেখাতে গিয়ে আজগুবি সব দৃশ্য হাজির করেছেন। এতকিছু না করলেও চলত।

কাকাবাবু ক্রাচ নিয়ে হাঁটেন। তাঁকে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে কাজ করতে হয়। ভাইপো সন্তুর সাহায্য নিতে হয়। কিন্তু বুদ্ধির জোরে তিনি বাজিমাত করেন। এই কাকাবাবুকেই তো আমরা চিনি। এই কাকাবাবুকেই তো আমরা ভালবাসি। সেখানে কাকাবাবুকে যদি আচমকা এমন অমিতাভ বচ্চন মার্কা ইমেজ তৈরি করা হয়, যদি দেখায় তিনি চল্লিশজন গুন্ডা পেটাচ্ছেন, তাহলে সেটা কিছুটা অবিশ্বাস্যই লাগে।
পরের পুজোয় আবার কাকাবাবু আসবেন। হ্যাঁ, আবার দেখতে যাব। কিন্তু সৃজিতের কাছে অনুরোধ, সেই আসল কাকাবাবুকে ফিরিয়ে দিন। যে কাকাবাবুকে মিশর রহস্যে পেয়েছিলাম, সেই কাকাবাবুকে ফিরিয়ে দিন।
