স্বরূপ গোস্বামী
কিছু কথা কাগজে লেখা থাকে। অনেকেই সেটা পড়তে পারেন। বুঝতেও পারেন।
অনেক কিছুই আছে, যা কাগজে লেখা থাকে না। অন্তর্দৃষ্টি না থাকলে সেটা পড়াও যায় না। বোঝাও যায় না।
অনেকটা ক্রিকেটের সেই স্কোরবোর্ডের মতো। মনে হয়, অনেক কিছুই লেখা থাকে। আসলে, অনেক কিছুই লেখা নেই।
তসলিমা নাসরিন ঠিক কী বলবেন, গত কয়েকদিন ধরে কৌতূহলের অন্ত ছিল না। যে যাঁর মতো করে ভেবে নিয়েছিলেন। দুদিন আগে দিল্লি থেকেই বিভিন্ন কাগজকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। কলকাতায় নেমেও অনেক চ্যানেলের বুমের সামনে টুকটাক দু’চার কথা বলেছেন। প্রশ্নের বাউন্সার ছিল। কোথাও এড়িয়ে গেছেন, কোথাও সটান হুক করেছেন। বক্তৃতার অভিমুখ কী হতে চলেছে, একটা আভাস ছিল।
তবু রবীন্দ্র সদনের সভায় কী বলেন, তা নিয়ে আগ্রহ তো ছিলই। মোটামুটি প্রত্যাশিতই ছিল, তিনি রাজ্যের নতুন সরকারের প্রশংসা করবেন। বাম সরকারের দিকে কিছু কটাক্ষ ছুড়ে দেবেন। লিখে আনা দীর্ঘ বক্তৃতায় আপাতভাবে মনে হবে, সেটাই হয়েছে।
কিন্তু একটু খুঁটিয়ে যদি তাঁর ভাষণ শোনা যায়, একবারের বদলে দু’বার বা তিনবার শোনা যায়, তাহলে পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর মতো কিছু কথার মানে পরিষ্কার হবে। বিটুইন দ্য লাইন্স–এ একটু ডুব দিতে পারলে বোঝা যাবে, বামেদের বিরুদ্ধে যা বলেছেন, তা নেহাতই সামান্য। বড়জোর দশ শতাংশ। কিন্তু আসলে যাঁদের বিরুদ্ধে বলে গেলেন, তাঁদের মাথায় হয়তো সেটা ঢুকলই না।
শুরুতেই মুখ্যমন্ত্রী বলে গেলেন, ‘আপনি যতবার খুশি আসুন, আপনাকে নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব মুখ্যমন্ত্রীর।’ বদলে যাওয়া বাংলার কথা শোনালেন। মুখ্যমন্ত্রী যদি কোনও সাহিত্যিককে এমন আশ্বাস দেন, সেটা অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য। একজন মুখ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে এটাই তো প্রত্যাশিত।
কিন্তু তাঁর কিছু ব্যস্ততা ছিল। ফলে, তসলিমার লিখে আনা ভাষণ না শুনেই চলে যেতে হয়। ভাগ্যিস শোনেননি। যদি শুনতেন, তাহলে এমন দরাজ গলায় হয়তো বলতে পারতেন না, ‘যতবার খুশি আসুন’। পুরো ভাষণ শুনলে হয়তো খোঁজ নিতেন, কারা এনেছেন। কেন এনেছেন।
আসলে, দুই পক্ষের একটা জায়গায় প্রচণ্ড মিল। যে মৌলবাদি শক্তি তসলিমাকে বাংলা ছাড়ার ফতোয়া দিযেছিল, তাঁরা প্রায় কেউই তসলিমার লেখা পড়েননি। আবার রবীন্দ্র সদন যে গেরুয়া বাহিনীর হাততালিতে উপচে পড়ল, তাঁদের অধিকাংশেরও একই দশা। তাঁদের কতজন ফেসবুকের বাইরে ছাপার অক্ষরে তসলিমার লেখা পড়েছেন, ঘোর সন্দেহ।
মূলস্রোত মিডিয়ার শিরোনাম কী হবে, জানা কথা। এক জায়গায় তসলিমা বলেছেন, ‘ইতিহাস মনে রাখে কারা দরজা বন্ধ করেছিল। ইতিহাস মনে রাখবে কারা দরজা খুলেছিল।’ বেশ জবরদস্ত একটা লাইন। অনেকক্ষণ ধরে হাততালি চলল। অনেকে তো এমন চোখা লোখা লাইনই চাইছিলেন। অনেকটা সময় ব্যয় করলেন নিজের দেশের মৌলবাদিদের কার্যকলাপ নিয়ে। এতেও হাততালি পড়ারই কথা। কারণ, বাংলাদেশ অত্যন্ত খারাপ একটা দেশ, বাংলাদেশ মানেই জঙ্গি— গত দু’তিন বছর ধরে এমন একটা প্রচার বাজারে দারুণ খেয়েছে।
কিন্তু বেশিরভাগ সময় এমন উদ্বেগ উঠে এল, যাতে বেলুন চুপসে যাওয়ারই কথা। রাষ্ট্র যখন নিজের কর্তব্য ভুলে ধর্মীয় উন্মাদনায় সামিল হয়ে যায়, তখন তা বড় এক সঙ্কট ডেকে আনে। এই কথাটাই বারবার উঠে এল। এটা শুনলে অনেকের ভাল লাগার কথা নয়। ‘সরকার যখন ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দেয়, তখন রাষ্ট্র আর রাষ্ট্র থাকে না। সে তার কর্তব্য ভুলে যায়।’ হাততালি দেওয়া হাতগুলো নিশ্চয় এমন সম্প্রীতির বাণী আশা করেননি।
অনেকেই অভিন্ন দেওয়ানি নিয়ে লাফালাফি করছেন। যেন সেটা হলেই সবকিছু সুজলাং সুফলাং হয়ে যাবে। তসলিমাও অভিন্ন দেওয়ানির পক্ষেই সওয়াল করেছেন। তবে একটু অন্যভাবে। ‘ভারত, বাংলাদেশ— দু’দেশেই ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি দরকার। তবে তা সংখ্যাগুরুর ধর্মের বিধান নয়। সংবিধান, মানবাধিকার এবং সমানাধিকার ভিত্তিতে তৈরি হওয়া নাগরিক আইন।’ কথাটার মানে বোঝা গেল?
বাংলাদেশে মুক্তকণ্ঠকে কীভাবে বারবার অবরুদ্ধ করা হয়েছে, সেই কথা তুলে আনলেন। বিরুদ্ধ মত বা পাল্টা যুক্তি মানেই শত্রুতা নয়। কেউই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়।— এমনটাও বারবার বলে গেলেন। আচ্ছা, আমাদের দেশের আঙ্গিকে যদি ভাবা যায়, এটা কার বিরুদ্ধে খাটে! একটু ভিন্নমত বা একটু সমালোচনা হলেই কারা যেন কথায় কথায় ‘দেশদ্রোহী’ তকমা এঁটে দেয়! তসলিমা যেন তাঁদেরই আয়না দেখিয়ে গেলেন।
উনিশ বছর পর তিনি বাংলায়। আবেগ ছিল। চাপা কান্না ছিল। নির্বাসিত থাকার যন্ত্রণা ছিল। উদ্বেগ ছিল। কলকাতা তাঁর সেই পবিত্র অনুভূতির শরিক হয়েছে। মুক্তচিন্তার মানুষেরা মুক্তকণ্ঠে তাঁকে স্বাগত জানিয়েছেন। কিন্তু যেটা বলে গেলেন, ঠিকঠাক মানে বুঝলে সরকারপক্ষের খুব একটা উল্লসিত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু তাঁরা যে মর্মার্থ বুঝবেন, তাঁদের চেতনার ওপর এতখানি আস্থা রাখা কঠিন।
বাম বন্ধুদের নিয়েও দুশ্চিন্তা কম নেই। তাঁরাও ভাল করে গোটাটা না শুনে দু–একটা ছোট ছোট রিলস দেখে হয়তো ফেসবুকে লিখে বসবেন, ‘তসলিমা বিজেপির দালাল।’ এটুকু লিখে নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলবেন, ‘কেমন দিলাম!’ গোটা ভাষণ মন দিয়ে শুনে, বিটুইন দ্য লাইন্স টুকু বোঝার মতো ধৈর্য বা সংযম এই শিবিরেও দিন দিন কমে আসছে।
দু’পক্ষই ভাবুন। ভাবুন। একটু ভাবা প্র্যাকটিস করুন।
