সেই রহস্যময় বাঁশি আর হকিং হিলের বিচিত্র সন্ধ্যে

সেই রহস্যময় বাঁশি আর হকিং হিলের বিচিত্র সন্ধ্যে

মধুজা মুখোপাধ্যায়

আচ্ছা পড়ন্ত সূর্যের আলো প্রকৃতির ক্যানভাসে নানা অবাক করা ছবি আঁকে, তাই না? কম বেশি সবাই তা অনুভব করেছি কখনও- সখনও। আবার অনেকে বলেন,  দিনের এই সময়টা খুব বিষন্নতা বহন করে নিয়ে আসে।  অনেকে বলেন এ হলো “কনে দেখা আলো  ” যখন  সব কিছু খুব সুন্দর এবং মায়াময় দেখায় । এতটাই সুন্দর যে সারাদিনের ক্লান্তি দূর হয়ে যায় আকাশে রঙের খেলার দিকে তাকিয়ে থাকলে। কিন্তু এই সোনার রঙের আলোতে কখনও গা ছমছমে  অনুভূতি হলে কেমন হয়? এমনটাই হযেছিল আমার এরকম এক মায়াময় ডুবন্ত সূর্যের আলোয় ! সেই অপূর্ব অনুভূতির কথা মাঝে মাঝে মনের মণিকোঠা থেকে উঁকি মারে, আজও।

বছর দুএক  আগে আমেরিকার Ohio রাজ্যের Hocking Hill বেড়াতে গিয়েছিলাম কর্তা মশাই আর কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে।  সেই সময় আমরা দিন দুয়েক এর জন্য Ravenwood  Castle (গেস্ট হাউসে উঠেছিলাম।  Ravenwood  Castle হল Hocking Hill এর এমন একটা অঞ্চলে যেটা বলা যায় তথাকথিত মানব সভ্যতার থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন।  এক, সেখানে মোবাইলের টাওয়ার ধরে না। দুই, সেখানে বাজার হাট কিছুই নেই। আর তিন, সন্ধ্যে হলেই ঘন জঙ্গলে ঘেরা কটেজে আপনি বন্দী। Castle এ অনেক গুলি কটেজ। সবই রূপকথার রাজকন্যেদের বাড়ির নামে অথবা শেক্সপীয়ার মহাশয়ের বাড়ির নামে। কটেজের  ভেতরেও সেই রূপকথার ছোঁয়া। ভেতরে গেলে মনে হবে ছোটবেলায় পড়া ইংল্যান্ড এর কোনও স্বপ্নের রাজ্য। স্নানঘর গুলির দেওয়ালে অদ্ভূত সব অয়েল পেন্টিংয়ের মাধ্যমে নানান বিদেশিনীদের জীবন্ত করে তোলা হযেছে। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলে মনে হয় সেও আমার দিকে তাকিয়ে কিছু  বলার চেষ্টা করছে।  স্নান ঘরের আলোর  জোর খুব বেশি নয়। ফলে তার আমার দিকে তাকিয়ে থাকাটা যেন মেঘে ঢাকা ঘোলাটে চাহনির মাধ্যমে ।

madhuja3

পুরো castle ঘন সবুজ জঙ্গলে ঘেরা যা আগেও বলেছি আর অবাক কান্ড castle যেখানে শেষ হেছে সেখানে কোনও প্রাচীর নেই। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমেছে গাছের সারি।  মাঝে মাঝেই সেই ঢাল বেয়ে রাতে শেয়ালের ওঠা নামা আর দিনে হরিন দম্পতির ছুটোছুটি বেশ উপভোগ করলাম। তবে নাইবা হল প্রাচীর কিন্তু নিরাপত্তা বা সুরক্ষার কোনও অভাব নেই সেখানে। গা ছমছমে ব্যাপার আছে ঠিকই, কিন্তু একটু ধাতস্থ হয়ে গেলে আর ভয় কবে না।

 

আমরা যেদিন পৌঁছলাম, সেদিন পুরো castle টা  ঘুরে দেখতে পারিনি। রাত হয়ে গেছিল আর বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছিল। পরদিনের বিচিত্র অনুভূতির কথা  লেখার শুরুতে বলেছি। এবার আরেকটু ভেঙ্গে বলি। Ravenwood এর পেছন দিকে বিকেলের দিকে হাঁটতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, সেখানে সৌন্দর্য্য বর্ধনের জন্য কচি সবুজ ঘাস দিয়ে একটা বাগান তৈরি করা। তার মাঝে Renaissance ইউরোপ ধাঁচে  ঘাসের প্রাচীর দিয়ে একটা Hedge Maze। তার ঠিক মাঝখানে একজন শিশু  গ্রিক দেবতা বসে বাঁশি বাজাচ্ছেন।  না, সত্যি কোনও দেবতা সেখানে ছিল কিনা জানি না। তবে ছিল এক দেবতার মূর্তি। তাঁর নাম হল প্যান। ইনি গ্রিকদের মেষপালকদের পূজ্য। হাতের বাঁশিটির নাম প্যান পাইপ। এমনিতেই ইতিহাস বলে, মিশরের মতো গ্রিসও ঘোরতর রহস্যময়, তার মধ্যে প্যান ও  একজন রহস্যময় দেবতা বলে পরিচিত। শুধু তাঁর পা দুটো ঘোড়ার খুঁরের মত বলে নয় , ইনি কখনও কারও সামনে আসতেন না বলেও।  Arcadia র পাহাড়ে বসে বাঁশি  বাজিয়ে তার অস্তিত্বের জানান দিতেন। যখন প্যান কে প্রথম দেখলাম, তখন সূর্য দেবের ছুটি নেবার পালা। মূর্তির পেছন দিয়ে তিনি দ্রুত নীচে নামছেন । ফলে আলো কমে আসছে খুব তাড়াতাড়ি।  দেবতাকে ক্যামেরা বন্দীও করতেই হয়। আমরা তার কাছে যেতেই ডুবন্ত সূর্যের আলোর রশ্মি এমন ভাবে ওই বাঁশিত়ে গিয়ে পড়ল মনে হল বাঁশিটা বেজে উঠলো না কি দেবতার আঙ্গুল সামান্য নড়ে উঠলো । একবার দুবার নয়, বারবার। তার পর ঝুপ করে অন্ধকার। ঝিঝির ডাক আর দূর থেকে হালকা রহস্যময় বাঁশির শব্দ কানে ঘুরপাক খাচ্ছে। সারারাত মাথার মধ্যে চলল নানান চিন্তা ভাবনা।  যা দেখলাম তা কি সত্যি ?

 

পরদিন দুপুরে রওনা দেওয়ার পালা। কৌতূহল নিবারণের  জন্য আবার গেলাম সেই বাগানে । তাকিয়ে রইলাম প্যান এর দিকে। নাহ আঙ্গুল বা বাঁশি কোনটাই নড়ছে না। তাহলে ইনি নিছক এক  মূর্তি।  নিশ্চিন্তে ফেরা যেতে পারে তবে।

 

ফেরার পথে উপলদ্ধি হল সন্ধ্যের আলো  সত্যি বড় রহস্যময়। কী অপূর্ব ছবিটাই না আঁকলো সে। এরকম গা ছমছমে পরিবেশে কল্পনা করতে দোষ  কোথায় যে গ্রিক দেবতা আমাদের বাঁশি বাজিয়ে শুনিয়েছিলেন সেই সন্ধ্যায় !?

​(ছবি  সৌজন্য :শুভজিৎ সেন​)

 

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.