অজন্তা, এবার বুঝলেন তো, শৃঙ্খলা কাকে বলে!‌

সরল বিশ্বাস

এতদিনে একটা স্বস্তি পাওয়া গেল। অজন্তা বিশ্বাসকে মোক্ষম একটা শাস্তি দেওয়া গেছে। একেবারে ছমাস সাসপেন্ড। যেমন তেমন কথা নাকি!‌ বুঝিয়ে দিলাম, শৃঙ্খলা কাকে বলে। বুঝিয়ে দিলাম, এমন শৃঙ্খলা পরায়ণ দল এই ভূভারতে আর দুটি নেই।

আপনি তো আচ্ছা অবাধ্য মেয়ে!‌ অনিল বিশ্বাসের মেয়ে বলে কী ভেবেছিলেন ?‌ আপনার শাস্তি হবে না?‌ এত সহজে পার পেয়ে যাবেন?‌ আমরা এত সহজে আপনাকে ছেড়ে দেব?‌ ভুলে যাবেন না, লোকসভায় আমাদের কেউ না থাকুক, বিধানসভায় কেউ না থাকুক, এখনও আমাদের এরিয়া কমিটি আছে, জেলা কমিটি আছে। সবার উপরে, গঠনতন্ত্রের নানাবিধ ধারা–‌উপধারা আছে। সুতরাং, এত সহজে আপনার নিস্তার নেই।

ajanta

আপনি ইতিহাসের অধ্যাপক তো কী হয়েছে?‌ লেখার আর বিষয় পেলেন না?‌ কতকিছু লেখার ছিল?‌ আর্য সভ্যতায় সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে লিখুন, মুঘল আমলের স্থাপত্য নিয়ে লিখুন। আপনি কিনা বাংলার রাজনীতিতে নারীশক্তি নিয়ে প্রবন্ধ লিখতে গেলেন?‌ জানেন না, এই লেখা লিখতে গেলে একজনের কথা লিখতেই হবে?‌ অন্যরা লিখছে লিখুক, আপনি কেন তাঁর কথা লিখবেন?‌ আরও অনেকের কথাই নাকি লিখেছেন। বেস করেছেন। তাই বলে, ওই মহিলার কথা কেন লিখতে গেলেন?‌ তাঁকে বাদ দিয়ে কি লেখা যেত না?‌

আমি অবশ্য চারটে কিস্তির একটা কিস্তিও পড়িনি। কেন পড়ব?‌ আমরা তো জাগো বাংলা পড়ি না (‌অবশ্য গণশক্তিটাও পড়ি, এমন অভিযোগ নেই)‌। আমরা ফেসবুকে মেতে থাকি। কে কী পোস্ট দিচ্ছে, খেয়াল রাখি। মাঝে মাঝেই কমেন্টে গিয়ে লাল সেলাম লিখি। কেউ এঁড়ে পোস্ট করলে লাইক মারি। ওটাই এখন আমাদের সংগ্রামের হাতিয়ার। ওখানেই বিপ্লব করি, ওখানেই প্রতিবাদ করি। ওখানেই ভাষণ দিই। ওখানেই হাততালি দিই। ওখানেই দাঁত কেলিয়ে নেতাদের পোস্টে লাইক মারি।

একজন মহিপণ্ডিত বলেছিল, লেখাটা পড়ে ফেললে আর কমেন্ট করতে পারবে না। তার থেকে আগে একটা কমেন্ট ছেড়ে যাও। বিষয়টা যদি ভাল না লাগে, আগেই একটা তিন অক্ষর বা চার অক্ষর ছেড়ে রাখো। পড়ে সময় নষ্ট করতে যাবে কেন?‌ একটা লেখা পড়তে যত সময় লাগে, সেই সময়ে অন্তত কুড়িটা পোস্টে লাইক বা কমেন্ট করা যায়। তাতে নোটিফিকেশনে নিজের নামটাও ভেসে রইল। আবার গালাগাল দেওয়ার পরম সুখটাও চটজলদি পাওয়া গেল।

আপনি ইতিহাসের ভারী ভারী বই পড়েছেন। কিন্তু এত ফেবু কমেন্ট পড়েছেন?‌ এবার নিশ্চয় পড়লেন?‌ মাত্র একটা লেখা লিখে কত পরিচিতি পেয়ে গেলেন। কেউ কেউ বলছে, কী সুন্দর লেখা। বলছে, বলুক। আপনি জাগো বাংলায় লিখেছেন, আর কিচ্ছু শুনতে চাই না। আপনাতে শুলে না চড়াতে পারলে আমাদের শান্তি নেই।

এরিয়া কমিটি দেখিয়ে দিল, এখনও তারা কতকিছু করতে পারে। জেলা কমিটি দেখিয়ে দিল, তারা শাস্তি ঘোষণা করে কেমন ফুটেজ খেতে পারে। রাজ্য কমিটিও দেখিয়ে দিল, কীভাবে এরিয়ে কমিটির নজরে আনতে হয়। এরা সবাই দেখিয়ে দিল, তাদের ক্ষমতা কতখানি। বুঝিয়ে দিল, যেটা সহজে মেটানো যেত, আমরা সেটা সহজে মেটাই না। সহজ ব্যাপারকে জটিল করার ব্যাপারে আমাদের দারুণ প্রতিভা। শূন্য পেলেও আমরা সেই প্রতিভা হারিয়ে ফেলিনি।

অজন্তা, আমরা আফগানিস্তানের দিকে চোখ রাখব। তালিবানদের নামে নিন্দা করব। বোরখা প্রথার নিন্দা করব। কিন্তু নিজের দলে একটু বেসুরো দেখলে সেই তালিবানি কায়দাতেই শৃঙ্খলা বজায় রাখব। আপনি নিশ্চয় হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন।

সুতরাং, অজন্তা, আপনি নিশ্চয় বুঝলেন, পার্টির ক্ষমতা কতটা!‌ এরপর আপনি কী করবেন?‌ যদি বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠেন, যদি নিতান্তই বাধ্য হয়ে অন্য শিবিরে চলে যান, আমরা বিজয়োল্লাস করব। আমরা বলব, দেখেছো, আমরা অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলাম। তাই অনেক আগেই শাস্তি দিয়েছিলাম।

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.