পানশালা থেকে শ্যামাসঙ্গীত

কালীপুজো এলেই একজনের কথা খুব মনে পড়ে। অমৃক সিং অরোরা। খুব ছোটবেলায় বাড়িতে তাঁর একটা ক্যাসেট দেখেছিলাম। কে এনেছিলেন, মনে নেই। একজন পাগড়ি পরা পাঞ্জাবি গায়ক। তিনি যে শ্যামা সঙ্গীত গাইছেন, সেটা বিশ্বাসই হত না। মনে হত, ক্যাসেটে হয়তো অন্য লোকের ছবি ছাপা আছে। যিনি গাইছেন, তিনি আসলে অন্য লোক। পরে একটি অনুষ্ঠানে তাঁর গান শুনি। নানা রকম অনুরোধ আসছে। আর তিনি হাসতে হাসতে সেই অনুরোধ রেখে চলেছেন।

ভারী আজব শহর এই কলকাতা। পরকে সে দিব্যি আপন করে নেয়। অবশ্য অমৃককে সেভাবে ‘‌পর’‌ বলা যায় না। তিনি অনেক বাঙালির থেকেও বেশি মাত্রায় বাঙালি। তাঁর জন্মের অনেক আগেই তাঁর পূর্বপুরুষেরা কলকাতায় চলে আসেন। বাবা চেয়েছিলেন, ছেলে ব্যবসায়ী হোক। কিন্তু ছেলে ছোটবেলা থেকেই মেতে উঠেছিল গান নিয়ে। মায়ের সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গাইতে লাগল।

একটা সময় একটি পানশালায় গান গাওয়ার ডাক এল। সেখানে মূলত কিশোর কুমার, মহম্মদ রফির গান গাইতে লাগলেন। কিন্তু মনের মধ্যে বহুদিনের সুপ্ত ইচ্ছে, তিনি বাংলা গান গাইবেন। চলে গেলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি। আর্জি রাখলেন, হেমন্তর সুরে গান গাইতে চান। হেমন্ত তাঁর গান শুনলেন। কিন্তু মনে হল, এই ছেলের গলায় বাংলা গান ঠিক মানাবে না। কিছুটা দুঃখই পেলেন অমৃক সিং। পরে অবশ্য বাংলা গান গাওয়ার সুযোগ এল। সাতের দশকের শেষদিকে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুর করা গানকে কণ্ঠে তুলে নিলেন। গানটি ছিল — রূপসী দোহাই তোমার। যাঁরা একটু হলেও গানবাজনার খোঁজ রাখেন, এই গানটির কথা তাঁদের অজানা নয়।

আটের দশকে তাঁর সঙ্গীত জীবন যেন অন্যদিকে বাঁক নিল। যে মানুষটা পানশালায় গিয়ে কিশোর–‌রফির গান গাইতেন, সেই মানুষটাই নিজেকে সমর্পণ করলেন ভক্তিগীতিতে। একের পর এক শ্যামাসঙ্গীত যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল তাঁর কণ্ঠে। প্রচলিত রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত, নজরুলের গান তো ছিলই, তার পাশাপাশি তিনি তৈরি করলেন নতুন এক ঘরানা। ‘‌আমার সর্ব অঙ্গে লিখে দিও কালী কালী নাম’‌, ‘‌কালী কালী বল রসনা’‌, ‘‌জয় মা তারা বলে ডুব’‌ — গানগুলো মুখে মুখে ফিরতে লাগল। পাগড়ি পরা এই মানুষটাকে আপন করে নিল বাঙালি। তিনিও আপন করে নিলেন বাংলার লোকগীতি, কীর্তন, শ্যামাসঙ্গীতকে।

তাঁর অনুষ্ঠান মানেই বিরাট একটা অংশজুড়ে থাকত ভক্তিসঙ্গীত। প্রকাশভঙ্গিও ছিল বেশ মন কাড়ার মতো। একজন পাঞ্জাবি মানুষ এইভাবে একের পর এক শ্যামাসঙ্গীত, ভক্তিগীতি গেয়ে যাচ্ছেন, সত্যিই মুগ্ধ হওয়ার মতোই দৃশ্য। শোনা যায়, তিনি দু’‌হাজারের ওপর বাংলা গান গেয়েছেন। বড় তাড়াতাড়িই চলে গেলেন। এই প্রজন্ম হয়তো অমৃক সিংকে সেভাবে চিনল না। পুজো প্যান্ডেলেও তাঁর গান ইদানীং সেভাবে শোনা যায় না। যিনি বাংলাকে ভালবেসে এভাবে আপন করে নিলেন, আমরাও কি তাঁকে আরও একটু আপন করে নিতে পারি না!‌

Previous post ধনতেরাস নিয়ে এত আদিখ্যেতা কেন?‌

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *