রক্তিম মিত্র
তিনি সবাইকে ক্ষমা করে দিলেন। ঘটা করে সেই ক্ষমা করার কথা প্রচারও করেছেন। সত্যিই তিনি মহৎ। ছাত্রদের কটূক্তিকে তিনি ক্ষমা করে দিলেন।
কিন্তু তিনি মহৎ হলে হবে কী! তাঁর ভক্তের দল থানায় থানায় এফআইআর করে চলেছে। আর পুলিশও সেইসব এফআইআর নিয়ে চলেছে। চ্যানেলে, কাগজে সেইসব খবর ফলাও করে প্রচারও হচ্ছে।
মোদ্দা কথা, প্রধানমন্ত্রীর কোনও সমালোচনা করা যাবে না। তাঁর সমালোচনা করলেই, তাঁকে নিয়ে নিরীহ কার্টুন আঁকলেই তা দেশদ্রোহিতার সামিল।
যাঁরা এফআইআর করছেন, তাঁরা কারা? একটু খোঁজ নিলে দেখা যাবে, তাঁরা নিজেরাই কয়েকমাস আগে তৃণমূল ছিলেন। তখন একদিকে নেত্রীর গুণকীর্তন করতেন, অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর নামে গাল পাড়তেন। তাঁরাই ভোল বদল করে রাতারাতি দেশভক্ত। তাঁদের দেশভক্তির চোটে জনতার প্রাণ ওষ্ঠাগত।
প্রধানমন্ত্রীও কম যান না। তিনি আন্দোলনকারী ছাত্রসমাজকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। আহা! কী উদারতা! এমনিতেই প্রধানমন্ত্রী একজন ব্যস্ত মানুষ। তবু মাঝে মাঝে যদি অবসর মেলে, তাহলে নিজের কিছু পুরনো ভাষণ শুনুন। জনসভা হলে তো কথাই নেই। এমনকী বিদেশের মাটিতে দেওয়া ভাষণ বা পার্লামেন্টে দেওয়া ভাষণেও ছত্রে ছত্রে মহানুভবতা ছড়িয়ে।
বিদেশে তাঁর দেওয়া ভাষণের নির্যাস কী? মোদ্দা কথা, আমার দেশে আগে যাঁরা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তাঁদের সবাই অযোগ্য। একমাত্র আমি দায়িত্ব নেওয়ার পরই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। পার্লামেটে দেওয়া ভাষণের নির্যাস কী? সব প্রধানমন্ত্রীরা অপদার্থ। বিরোধীরা সবাই দুর্নীতি পরায়ণ, একমাত্র আমিই ঈশ্বরপ্রেরিত দূত। একদিকে, নিজেই নিজের ঢাক পিটিয়ে যাওয়া। অন্যদিকে, বিরোধীদের চূড়ান্ত নোঙরা ভাষায় কটূক্তি করা। রাহুল গান্ধীকে ‘পাপ্পু’ বলে কে প্রথম সম্বোধন করেছিলেন। সোনিয়া গান্ধীকে ‘পাপ্পু কি মা’ কে বলেছিলেন? এই আক্রমণ এসেছিল একেবারে সর্বোচ্চ জায়গা থেকে। আর কোনও প্রধানমন্ত্রীকে এমন নিকৃষ্ট আচরণ করতে দেখা যায়নি।
সম্মান পেতে গেলে তার যোগ্য হয়ে উঠতে হয়। প্রধানমন্ত্রীর পদটা অবশ্যই সম্মানের। এই চেয়ারে আসীন ব্যক্তিকে নোঙরা আক্রমণ কখনই কাম্য নয়। কিন্তু যিনি চেয়ারে বসছেন, তিনি নিজেই যদি চেয়ারের সম্মান না বোঝেন, অন্যরা বুঝবে, এতখানি আশা করাটা একটু বাড়াবাড়ি। তাঁর চেয়ারের সম্মান নষ্ট করার জন্য তিনি নিজেই যথেষ্ট। কোনও বিরোধীর দরকার নেই, কোনও ছাত্রসমাজেরও দরকার নেই।
কেউ তো আপনার কাছে ক্ষমা চায়নি। তাই অযাচিত ‘ক্ষমা করে’ মহান হওয়ার দরকার নেই। বরং, নিজের ভাষণ মন দিয়ে শুনুন। কথায় কথায় পণ্ডিত হেররু ও অন্যান্য প্রধানমন্ত্রীদের কী ভাষায় আক্রমণ করেছেন, নিজেই শুনুন। তারপর মনে মনে ক্ষমা চেয়ে নিন।
