স্বরূপ গোস্বামী
রাতে বিশ্বকাপ ফাইনাল। আর সকালে চমকে দেওয়ার মতো একটা ছবি। দিয়েগো মারাদোনার গায়ে নামাবলি! তাতে লেখা ‘হরে রাম, হরে কৃষ্ণ!’ এখনকার দিনে হলে নির্ঘাত বলা হত, এ আই দিয়ে বানানো ছবি। গুগল নামক সিধু জ্যাঠার যুগ পেরিয়ে এখন এসেছেন আরেক মাতব্বর এ আই। ওই কৃত্রিম বুদ্ধি দিয়ে তিনি যে কোনও লোকের যে কোনও ছবি বানিয়ে দিতে পারেন।
কিন্তু সময়টা ১৯৮৬। তখন এ আই নামক বস্তুটির আবির্ভাব হয়নি। তখন একটা ছবিই অনেক কথা বলে যেত। এখন ছবি দিয়ে হাজার মিথ্যে নির্মাণ করা যায়। তখন ছবি মানে ধরা হত সত্যের প্রতীক। হ্যাঁ, মারাদোনা সত্যিই বাংলা অক্ষর লেখা নামাবলী পরেছিলেন। সেই ছবি বিশ্বকাপ ফাইনালের সকালে ‘আজকাল’ এ ছাপাও হয়েছিল। এই দুটি তথ্যে কোনও ভেজাল নেই।
এই অসম্ভবকে যিনি সম্ভব করেছিলেন, তিনি অমিয় তরফদার। একসময়ের দিকপাল আলোকচিত্রী। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যেমন জীবন্ত হয়ে আছে তাঁর ক্যামেরায়, ঠিক তেমনই বিশ্বকাপ, অলিম্পিকের মতো মহাযজ্ঞের নানা মুহূর্তও ধরা পড়েছে তাঁর ক্যামেরার লেন্সে। ছিয়াশিতে তিনিই ছিলেন আজকালের প্রতিনিধি। একের পর এক দুষ্প্রাপ্য ছবি যেমন পাঠিয়েছেন, তেমনই তাঁর নামে ছাপা হয়েছে দারুণ কিছু প্রতিবেদন।
২০২৬ এ বসে চল্লিশ বছর আগের ছবিটা কল্পনা করাও কঠিন। এখন খেলার মাঝপথেই পিটিআই, এএফপি, রয়টার্সের–র মতো সংবাদসংস্থা হাজার হাজার ছবি পাঠিয়ে যাচ্ছে। আর ফেসবুক, এক্স, ইনস্টাগ্রাম ঘাঁটলে তো ছবির সমুদ্র। কত ছবি চাই! হাজার হাজার ছবির সঙ্গে মিশে আছে এ আই দিয়ে বানানো ভেজাল ছবিও। আসল–নকল ফারাক করাই বেশ কঠিন। কিন্তু তখন ছবি পাঠানোর সহজ কোনও পন্থা ছিল না। চেনা–জানা কাউকে ধরে বিমানে রিল পাঠাতে হত। সেইসব ছবি বেশ কয়েকদিন ধরে ছাপা হত।
যেদিন মারাদোনার সেই নামাবলী পরা ছবি ছাপা হয়েছিল, সেদিন ছিল বিশ্বকাপের ফাইনাল। স্বভাবতই দুই শিবিরের প্র্যাকটিস বা হালকা মুহূর্তের নানা ছবি থাকার কথা। কিন্তু সাতের পাতায় গিয়ে দেখা যাচ্ছে অমিয় তরফদারেরই পাঠানো গোটা চারেক ছবি। সেগুলি কোয়ার্টার ফাইনালের। অর্থাৎ, দিন সাতেক আগের। নামাবলীর ছবিটাও বেশ কয়েকদিন আগের। সেই ছবির নেপথ্যেও রয়েছে মজার গল্প। কেন্দুলিতে জয়দেব মেলায় গিয়েছিলেন অমিয়বাবু। রথা দেখা, কলা বেচার সেই প্রবাদ। অর্থাৎ, মেলাও দেখা হল, আবার সেই মেলার দুষ্প্রাপ্য ছবিও তোলা হল। সেই মেলা থেকেই কিনেছিলেন দুটি নামাবলী। একটি দিয়েছিলেন নিজের মা–কে। অন্যটি সুটকেসে ভরে নিয়ে গিয়েছিলেন মেক্সিকো।
তখন বিশ্বকাপ মানে কিছুটা হলেও খোলামেলা আবহ। এত রিপোর্টারের ভিড়ও ছিল না। এত নিরাপত্তার কড়াকড়িও ছিল না। খেলোয়াড়দের সঙ্গে দু’দণ্ড কথা বলার ফুরসত পাওয়া যেত। গড়ে উঠত ব্যক্তগত সম্পর্কও। অমিয় তরফদার নিরাপত্তার বেড়াজাল টপকে পৌঁছে গিয়েছিলেন মারাদোনার কাছে। তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন নামাবলী। আবদার করেছিলেন, একবার যেন সেটা গায়ে দেন। মারাদোনা যথারীতি সেই নামাবলী গায়ে দিলেন। ছবি উঠে গেল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে ‘চিরস্মরণীয়’ হয়ে থেকে গেল ছবিটা। শোনা যায়, তিনি নাকি একবার মারাদোনাকে ধুতি–পাঞ্জাবিও পরিয়েছিলেন। কিন্তু সেই দৃশ্যের কোনও ছবি নেই। কেউ হয়তো বিশ্বাস করতেও চাইবেন না। তাই অমিয়বাবু সেই ধুতি–পাঞ্জাবির কথা কাউকে বলতেন না। কিন্তু নামাবলী! সেই ছবি তো পেয়ে গেল অমরত্বের ঠিকানা।
এ তো গেল ছবির কথা। কিন্তু দুরন্ত সেই কভারেজ। বিরাশির বিশ্বকাপের আগেই আজকালের যাত্রা শুরু। কিন্তু সেবার টিভিতে সরাসির ম্যাচ দেখার কোনও সুযোগ ছিল না। বাঙালির জীবনে সেই বিশ্বকাপ সেভাবে রেখাপাতও করেনি। তাছাড়া, তখন বিশ্বকাপের আঙিনায় কাউকে পাঠানো সম্ভবও হয়নি। যে অভাবটা অনেকটাই মিটে গেল ছিয়াশিতে। একদিকে মেক্সিকো থেকে দুরন্ত ছবি আর ডেসপ্যাচ পাঠাচ্ছেন অমিয় তরফদার। বাঙালির কাছে যিনি বিশ্ব ফুটবলের জানালা খুলে দিয়েছিলেন, সেই জিসি দাসও খেলা পত্রিকার জন্য পাঠাচ্ছেন দুরন্ত সব প্রতিবেদন। আর এখানে রয়েছেন একঝাঁক বিশেষজ্ঞ। বিভিন্ন ম্যাচের বিশ্লেষণ করছেন অমল দত্ত, অরুণ ঘোষ, মহম্মদ হাবিব, সুরজিৎ সেনগুপ্ত। মাঝে মাঝেই ঝলসে উঠছে অজয় বসু, অশোক দাশগুপ্তর কলম। আর ডেস্ক সামলাচ্ছেন ধীমান দত্ত, দেবাশিস দত্ত, সরোজ চক্রবর্তী, নির্মলকুমার সাহা, অলোক চট্টোপাধ্যায়, পল্লব বসুমল্লিকরা। অনেক প্রতিকূলতা নিয়েও আজকালের খেলার পাতা যেন খুলে দিচ্ছে ভাবনার বিকল্প এক জগৎ। বাঙালি সেইসব লেখা গোগ্রাসে গিলছে। তাই নিয়েই চায়ের দোকানে বা পুকুর ঘাটে বা পাড়ার সেলুনে তর্ক করছে।
খেলা শেষ হত গভীর রাতে। রাতের পর রাত আজকাল দপ্তরেই থাকতেন অমল দত্ত। ৯৬, রাজা রামমোহন সরণির সেই আজকাল অফিসের উঠোনে ক্যাম্প খাটে শুয়েই রাত কাটিয়ে দিতেন। রাতভর চলত আড্ডা, তর্ক, খাওয়া দাওয়া। আটের দশকের সেই রাতগুলো এই প্রজন্মের কাছে সত্যিই ঈর্ষণীয়। নানা সময়ে সেইসব গল্প যত শুনেছি, ততই যেন রোমাঞ্চিত হয়েছি। অনেক ‘নেই’ এর ভেতরেও যা ছিল, তার মূল্য সে অসীম।
যে কোনও কভারেজে প্রিভিউ খুব বড় একটা বিষয়। অর্থাৎ, ফাইনালের দিন সকালের কাগজটা কীভাবে সাজানো হল? প্রথম পাতায় তিন কলাম জুড়ে মারাদোনার সেই নামাবলী গায়ে ছবি। মারাদোনা আর বাংলার আবেগ যেন মিলেমিশে একাকার। ডানদিকে, পাঁচটি লেখা। লিড স্টোরি হিসেবে নেওয়া হয়েছে অমিয় তরফদারের ডেপস্যাচ। শিরোনাম: ‘তিনি মারাদোনা, তাঁকে ঘিরেই উন্মাদনা’। ফাইনালের আগে মেক্সিকোর ছবিটা ঠিক কেমন, মারাদোনাকে ঘিরে আবেগ কতটা, তা নিখুঁতভাবে ধরা পড়েছে এই প্রতিবেদনে। এতটাই উন্মাদনা, স্বয়ং মারাদোনা বলছেন, ‘আপনারা বোধ হয় আমাকে নিয়ে একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করছেন।’ প্রতিবেদনের শেষে লিখছেন, ‘মারাদোনা কী, রবিবার আজটেকই বোধ হয় তার জ্বলন্ত সাক্ষ্য হয়ে থাকবে।’ সেই প্রতিবেদনের নীচে চারটি বিশেষ লেখা। অমল দত্তর শিরোনাম, ‘থমকালে শ্যুমাখারেই’। অরুণ ঘোষের লেখায় উঠে এসেছে জার্মানির লড়াইয়ের কথা, ‘যুদ্ধ যাদের রক্তে’। সুরজিৎ সেনগুপ্তর লেখার শিরোনাম— ‘শক্তি বনাম শিল্প’। আর বড়ে মিয়াঁ মহম্মদ হাবিব লিখছেন, ‘মারাদোনা চাইলে যা খুশি করতে পারে’। সেদিনই চারের পাতায় প্রতিটি বিশ্বকাপ ফাইনালের ফলাফল নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।
ফাইনালের ম্যাচরিপোর্ট ছিল অমল দত্তর লেখা। জায়গায় জায়গায় উদ্ধৃতি দেওয়ার লোভ সামলানো কঠিন। স্নায়ুর চাপ প্রসঙ্গে তিনি লিখছেন, ‘বিশ্বকাপের টেনশন? হ্যাঁ, পুরোমাত্রায় ছিল। না হলে যে মারাদোনা গোটা টুর্নামেন্টে মাথা বরফের মতো ঠান্ডা রেখেছিল, সে রেফারির সঙ্গে তর্ক জুড়ে এই প্রথম হলুদ কার্ড দেখত না।’ আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় গোলের পর তিনি লিখছেন, ‘এই দ্বিতীয় গোলটাই জার্মানির আত্মসম্মানে চাবুকের ঘা বসায়। ওরা তেতে উঠল। আর্জেন্টিনা চাইল ডিফেন্সের শাটার নামিয়ে দিতে।’ বুরুচাগার সেই গোলে মারাদোনার ফাইনাল পাস সম্পর্কে লিখছেন, ‘মারাদোনা সারাক্ষণ জার্মানদের টার্গেট থেকেও শেষ দুই মিনিটে জাদু দেখিয়েছে।’
সেই রাতে বিরাট কিছু কভারেজের সুযোগ ছিল না। কারণ, তখনও কম্পিউটার টাইপিং আসেনি। বিভিন্ন পয়েন্টের অক্ষরের পর অক্ষর বসিয়ে, যতিচিহ্ন খুঁজে সেট করে পাতায় সাঁটা ছিল এই প্রজন্মের গৃহিনীদের কাছে জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে এনে রান্না বসানোর মতোই। চাইলেও টাটকা ছবি ব্যবহারের উপায় ছিল না। পরেরদিন যে ছবি ছাপা হয়েছিল, সেটাও টিভি থেকে তোলা। সেই কঠিন কাজটি করেছিলেন প্রয়াত ফটোগ্রাফার বিকাশ সাধু। এমনকী দুদিন পর মারাদোনা দেশে ফিরলেন, সেই ছবিও পাওয়া যায়নি। কপি ছিল, কিন্তু বুয়েন্স আয়ার্সের রাস্তায় জনজোয়ারের ছবি ছিল না। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরের সকালে হয়তো বিরাট কিছু করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু পরের দিন সেই আক্ষেপটা মিটে গেল দুরন্ত কয়েকটা লেখায়। চারের পাতায় দুরন্ত তিনটি লেখা। সবার উপরে অজয় বসু। তাঁর নীচে অরুণ ঘোষ। তাঁর নীচে সুরজিৎ সেনগুপ্ত। অজয় বসুর লেখার শিরোনাম— ‘রাজবেশে অভিজাতদেরই সবথেকে ভাল মানায়’। অরুণ ঘোষের লেখার শিরোনাম— ‘গোটা বিশ্ব মারাদোনাকে সেলাম জানাক’। আর সুরজিৎ সেনগুপ্তর লেখার শিরোনাম— ‘বিশ্বকাপ যেন মারাদোনার চুম্বনস্পর্শেরই অপেক্ষায় ছিল’।
পরের দিনের আজকালে ছিল অভিনব এক ফলো আপ। সেবার রাজ্য সরকারেরর ক্রীড়া দপ্তরের পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছিল ২০ জনের একটি প্রতিনিধি দল। সেখানে কযেকজন প্রাক্তন খেলোয়াড় যেমন ছিলেন, তেমনই ছিলেন কয়েকজন আমলা এবং ক্রীড়া সংগঠকের তকমা নিয়ে ছিলেন বেশ কয়েকজন বামপন্থী নেতাও। তাঁরা বিভিন্ন শহর ঘুরলেন। তিনটি ম্যাচ দেখলেন। কিন্তু ফাইনালের টিকিটের ব্যবস্থা করা গেল না। তাই ফাইনালের আগেই তাঁরা মেক্সিকো ছেড়ে চলে এলেন লন্ডনে। সেখানে হোটেলে টিভিতে বসে নাকি ফাইনাল দেখেছেন। টিকিটের নিশ্চয়তা নেই জেনেও চুনী গোস্বামী এবং শান্ত মিত্র থেকে গেলেন। তাঁদের টিকিটের ব্যবস্থা করলেন অমিয় তরফদার। ছাপার অক্ষরেই তা নথিবদ্ধ আছে। সরকারি প্রতিনিধিদের এই সফর নিয়ে বিশ্বকাপ চলাকালীন বেশ কয়েকটি সমালোচনামূলক লেখা প্রকাশিত হয়েছিল আজকালের পাতায়। ফিরে এসেই বিমানবন্দরে তাঁরা যে এমন বিড়ম্বনায় পড়বেন, ভাবতেও পারেননি। বিমানবন্দরে হাজির আজকালের প্রতিনিধিরা। অরুন্ধতী মুখার্জি, সরোজ চক্রবর্তীদের প্রশ্নবানে জর্জরিত হয়ে তাঁরা পালাতে পারলে বাঁচেন। প্রথম পাতায় চারটি প্রতিবেদন। শিরোনাম: ‘কী দেখে এলেন, কী শিখে এলেন..’। ওদিকে, কে কেমন ক্রীড়া সংগঠক, কে কেমন ক্রীড়া অনুরাগী, তার তদন্ত করতে অনেকের এলাকায় পৌঁছে গেলেন শুভশঙ্কর ভট্টাচার্য, অসীম নাথ। কে কী মার্কেটিং করলেন, কোন কোন শহর বেড়িয়ে এলেন, কোন জিনিসের দাম কত, এসব গল্প শুনিয়ে গেলেন। কিন্তু এই গল্পগুলো যে এমন ব্যুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে, ভাবতেও পারেননি।
বিশ্বকাপের দুরন্ত কভারেজের পাশাপাশি তদন্তমূলক এই প্রতিবেদনগুলোও অন্য এক মাত্রা এনেছিল। এতবছর পরেও যা নতুন দিশা দেখাতে পারে বাংলা ক্রীড়া সাংবাদিকতাকে। তখন পুরোমাত্রায় বাম সরকার। কিন্তু তারপরেও সরকারি অর্থে দলীয় লোকেদের পাঠানোর বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল আজকাল। চল্লিশ বছর পার। কিন্তু ভবিষ্যতের গবেষকদের কাছে এই প্রতিবেদনগুলো মহাকালের এক দলিল হয়ে উঠতে পারে।
