স্বরূপ গোস্বামী
তিনি যেমন–তেমন মানুষ নন, তাঁর ‘হাপিডেবিটে’ সবকিছুই নাকি লেখা আছে। তিনি মাধ্যমিক পাস করেছেন কিনা, কোনও উত্তর তিনি দেবেন না। কোন বছর, কোন স্কুল থেকে, কিছুই তিনি বলবেন না। সব তাঁর ‘হাফিডেবিটে’ আছে।
একসময় দাবি করতেন, তিনি ক্যালিফর্নিয়া ইউনিভার্সিটির ডক্টরেট। শুধু দাবি করতেন না, নির্বাচনী হলফনামাতেও লিখেছিলেন। কোন বিষয়? সেটা তাঁর ‘হাবিডেবিটে’ আছে। এখন অবশ্য আর বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলেন না। ‘শুদ্ধ দেশি রোমান্স’য়ে তিনি অনুপ্রাণিত। তাই এখন বলেন কামরাজ ইউনিভার্সিটির কথা।
এই ‘কীর্তিমান’ বিহারের নতুন মুখ্যমন্ত্রী। সাম্প্রতিকতম নাম ‘সম্রাট চৌধুরি’। ‘সাম্প্রতিকতম’ শব্দটা ব্যবহার করতে হল, কারণ ইতিপূর্বে বহুবার তিনি নাম বদল করেছেন। জেল খাটার আগে এক নাম, জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আরেক নাম। সেই নাম পোষাচ্ছিল না বলে আরও অন্য নাম। এখন তিনি সম্রাট চৌধুরি। কী জানি, কোনদিন এই নামটাও হয়তো বদলে ফেলবেন।
তিনি কোন দলের? এখানেও সেই জটায়ুর ‘সাম্প্রতিকতম উপন্যাস’ এর মতো ‘সাম্প্রতিকতম’ শব্দটাই ব্যবহার করতে হবে। কারণ, বহু ঘাটের জল খেয়ে এখন তিনি বিজেপিতে ভিড়েছেন। কখনও কংগ্রেস, কখনও আরজেডি, কখনও ডেজিইউ। ‘ভুবন ভ্রমিয়া শেষে’ তিনি নোঙর গেড়েছেন ভাজপার নতুন বন্দরে। একসময় জেদ ধরে মাথায় পাগড়ি পরে নিয়েছিলেন। বলেছিলেন, যতদিন না মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে নীতীশ কুমারকে সরাতে পারছি, ততদিন মাথার পাগড়ি খুলব না। রাজনীতির কী অদ্ভুত পরিহাস! নীতীশ কুমার আবার এনডিএ শিবিরে এসে গেলেন। আর তিনি হয়ে গেলেন সেই নীতীশ কুমারের ক্যাবিনেটের মন্ত্রী। এমনকী, একসময় উপমুখ্যমন্ত্রী। সেইসঙ্গে, বাজেট বইয়ের একটি পাতাও রিডিং পড়তে পারুন বা নাই পারুন, তিনি হলেন অর্থমন্ত্রী। বেচারাকে মাঝপথেই পাগড়ি খুলতে হল। আর যখন তিনি মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে বসলেন, নীতীশ কুমারই কিনা তাঁর নামের প্রস্তাবক!
আচ্ছা, তাঁর বয়স কত? মেয়েদের বয়স জিজ্ঞেস করতে নেই। তিনি আর যাই হোক, মহিলা নন। অতএব জিজ্ঞেস করাই যায়। কিন্তু বয়স জিজ্ঞেস করলেও তিনি বেজায় রেগে যান। বলে বসেন, সেটাও নাকি ‘হাফিডেবিটে’ আছে। ব্যাপারটা কী? আসলে, খুনের মামলায় যখন জেলে গিয়েছিলেন, তাঁকে বাঁচাতে দারুণ একটা ফন্দি ফেঁদেছিলেন তাঁর উকিল মশাই। তিনি কোত্থেকে একটা সার্টিফিকেট এনে কোর্টে জমা দিয়ে বললেন, হুজুর আমার মক্কেল নেহাতই নাবালক। ওর বয়স সবে পনেরো বছর। অতএব জুভেনাইল আইনে তাকে ছাড় দেওয়া হোক। বিচারকের সাদা মনে কাদা নেই। দামড়া লোকটিকে চোখের সামনে দেখেও বিচারকের মনে হল, বেচারা সত্যিই নাবালক। অতএব ছাড়া পেলেন।
এই পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু কয়েক বছর পরেই এই মহামানবের ইচ্ছে হল, ভোটে দাঁড়াবেন। কিন্তু ভোটে দাঁড়াতে গেলে তো অন্তত পঁচিশ বছর বয়স হতে হবে। এদিকে, তিনি তো কয়েক বছর আগে পনের বছর বলে ছাড়া পেয়েছেন। অতএব তিনি আবির্ভূত হলেন অন্য নামে। বয়সটাও একলাফে এগারো বছর বেড়ে গেল। এসবের পিছনে সম্রাটের বুদ্ধি তেমন কাজ করেনি। তাঁর বাবার নাম শকুনি চৌধুরি। তিনিও নানা ঘাটের জল খেয়ে বিধায়ক, সাংসদ হয়েছেন। যথার্থই শকুনির মতো বুদ্ধি। ফলে, বয়স কমানো, বয়স বাড়ানো, নামবদল, দলবদল— সবই সেই শকুনির পাশা।
সম্রাটবাবুর বর্ণময় জীবনে এত ঘটনার ঘনঘটা, কেন যে তাঁকে নিয়ে বায়োপিক হয় না! বলুন তো, কোনও বলিউডি ছবিতে চিত্রনাট্যে এতরকম বাঁক আছে! বলিউডি পরিচালকরা না বুঝলেও তাঁর এই প্রতিভার কথা অন্তত মোদিবাবু, অমিত শাহরা বুঝেছেন। একেবারে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসিয়ে দিয়েছেন। বিহার হলই না হয় নালন্দা, বিক্রমশীলার রাজ্য। হলই না হয় আর্যভট্ট বা চাণক্যর রাজ্য। সেই রাজ্যের বর্তমান অধিপতির সব কীর্তি হাপিডেবিটে আছে।
আজ থেকে ৫৪ বছর আগে, এনআইটি পাটনা থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বেরিয়েছিলেন নীতীশ কুমার। কেন্দ্রে কৃষি, ভূতল পরিবহণ, রেলের মতো দপ্তর সামলেছেন। দুই দশকের বেশি সময় ধরে মুখ্যমন্ত্রী। বিহারে তাঁর চলতি নাম ‘সুশাসনবাবু’। তাঁর বদলি এমন একজন, যিনি মাধ্যমিক পাস করেছেন কিনা বলতে পারেন না। অথচ, হলফনামায় কী অবলীলায় পিএইচডি লিখে ফেলেন! সব তাঁর হাপিডেবিটে আছে। এমন গঙ্গারামকে পাত্র হিসেবে যখন পেয়েই গেছেন, তখন সে কেমন ছেলে, নাইবা জানতে চাইলেন!
