সৃজন শীল
খুব ছোটবেলার কিছু মুখ চিরতরে মনে দাগ কেটে যায়। তেমনই একটি মুখ প্রণয় রায়। মনে আছে, আটের দশকে দূরদর্শনে শুক্রবার রাতে একটি অনুষ্ঠান হত, ‘দ্য ওয়ার্ল্ড দিস উইক’। পুরো অনুষ্ঠানটাই ইংরাজিতে। ওই সময় কিছুই বুঝতাম না। তবু কেন জানি না, টিভির সামনে বসে পড়তাম। দেশ–বিদেশের নানা ছবি। ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ নাইবা বুঝলাম, ছবিগুলোই মনের মধ্যে একটা খুশির তুফান এনে দিত। সেই অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ছিলেন প্রণয় রায়। কিশোর মনে সেই মুখটাই ছাপ ফেলে গিয়েছিল।
তারপর প্রণয় রায়কে পেলাম অন্য ভূমিকায়। বুঝলাম, ভোট বিশ্লেষণে ইনি দেশের প্রথমসারির বিশেষজ্ঞদের একজন। শুরু হল এনডিটিভি। টেলিভিশন সাংবাদিকতার দুনিয়ায় এল নতুন এক বাঁক। তাঁর হাত ধরে উঠে এলেন একঝাঁক নতুন মুখ। তাঁদের অনেকেই আজ সারাদেশে পরিচিত মুখ। এবারের বাংলার ভোটে সেই প্রণয় রায়কে পেলাম একেবারেই অন্য ভূমিকায়। এক হাতে একটি ব্যুম, অন্যহাতে মোবাইল। রাস্তায় ভিড়ের মাঝে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্বের ইন্টারভিউ নিচ্ছেন। একটা সময় তাঁর স্টুডিওতে ডাক পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতেন দেশের প্রথমসারির নেতামন্ত্রীরা। আজ তিনি কিনা চড়া রোদে ব্যুম হাতে ভিড়ের মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
একই সঙ্গে খারাপ লাগল, আবার একইসঙ্গে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে এল। মোদিবাবু হলেন ‘দুই বিঘা জমি’র সেই জমিদারের মতো, যাঁর সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘বাবু কহিলেন বুঝেছ উপেন, এ জমি লইব কিনে।’ একের পর এক চ্যানেল তাঁর দুই পেটোয়া ব্যবসায়ী চালাচ্ছেন। স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর হয়ে বেঁচেবর্তে ছিল এনডিটিভি। অতএব, তাঁকেও বাগে আনতে হবে। এদিকে এনডিটিভির সেই পুরনো টিমও ততদিনে ভেঙে গেছে। যে যাঁর মতো করে বিভিন্ন চ্যানেলের মাথায় বসে গিয়েছেন। প্রণয় রায়ের অবস্থা তখন সেই উপেনের মতোই। জমিদার তাঁর ওই সাধের দুই বিঘা জমি কিনে নিতে চান।
গ্রামের জমিদার আর রাষ্ট্রের মধ্যে তেমন ফারাক নেই। রাষ্ট্র চাইলে কি না পারে! তাঁর হাতে যেমন বশংবদ মিডিয়া, তেমনই তাঁর হাতে সিবিআই, ইডি, ইনকাম ট্যাক্স— আরও কত কী! দাও লেলিয়ে। তাই হল, প্রণয় রায়কে কার্যত বাধ্য হয়েই এনডিটিভির মালিকানা ছাড়তে হল। এই ছিয়াত্তর বছর বয়সে একা একা কীই বা করতে পারতেন? তাঁর যে খুব অর্থের অভাব, এমন নয়। ড্রয়িংরুমে বসে টিভি দেখে, ফোন ঘেঁটে বা দেশ বিদেশ ঘুরে কাটিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু প্যাশন কাকে বলে, সেটা বুঝিয়ে দিলেন। এই ছিয়াত্তর বছর বয়সেও নেমে পড়লেন জনপথে। মাঠে নেমে বুঝতে চাইলেন জনতার নাড়ির স্পন্দন। একসময় কোন আসেন ছিলাম, এখন কোথায় আছি— এই জাতীয় যাবতীয় হীনমন্যতাকে ঝেড়ে ফেলে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, তিনি আজও সাংবাদিক। বুঝিয়ে দিলেন, ‘যদি ভাবো কিনছ আমায় ভুল ভেবেছ।’
যতই মঞ্চ কেড়ে নেওয়া হোক, যতই মাইক কেড়ে নেওয়া হোক, তিনি তাঁর মতো করেই তাঁর কণ্ঠস্বরকে পৌঁছে দিচ্ছেন আমজনতার কাছে। এই কণ্ঠ রাষ্ট্রের চোখরাঙানিকে পরোয়া করে না। প্রণয় রায়, কয়েকটা ছবি, কয়েকটা মুহূর্ত আমাদের কতকিছু শিখিয়ে দিয়ে গেল! এভাবেই মাথা উঁচু করে থাকুন। আমাদের কুর্নিশ গ্রহণ করুন।
