ভুবন সেন
আপনি এক পথচলতি জনতা। আপনি মেট্রোয় চড়েন। আপনি ট্রেন চড়েন। আপনি পাড়ার চায়ের দোকানে বসেন। আপনি টিভি দেখেন। আপনি ফেসবুকে চোখ রাখেন।
আপনার চোখ–কান খোলা। কে কী বলছে, আপনি ঠিক কান পেতে আছেন। আর সুযোগ পেলে মাঝে মাঝে নিজেও একপ্রস্থ ভাষণ দিয়ে ফেলেন।
চারপাশের নানা মতামত শুনে আপনার কী মনে হয়? মনে হয়, এই সরকারটা গেল বলে। বিজেপি হুহু করে এসে গেল। আবার কখনও মনে হবে, বামেরা এবার সুনামি নিয়ে আসবে। কিন্তু ৪ মে এলেই দুপুরের মধ্যেই আপনি হতাশ হয়ে পড়বেন। যাহ, এবারও হল না!
হ্যাঁ, ওইদিন আপনার মতো অনেকেই এরকম হতাশ হবেন। এই হতাশাই হয়তো আপনার ভবিতব্য। মনে হবে, তৃণমূলকে এত এত ভোট দিল কারা? আসলে, যাঁরা তৃণমূলকে ভোট দিলেন, তাঁদের আপনি চেনেননি, চেনার চেষ্টাই করেননি।
তথাকথিত মধ্যবিত্তর চিন্তাভাবনা একরকম। তার আশা–হতাশা একরকম। আর গ্রামের প্রান্তিক মানুষের ভাবনা অন্যরকম। এমন নয় যে তাঁরা চিন্তাচেতনায় খুব পিছিয়ে আছেন। একজন মহিলা জানেন, মাসের শুরুতে এক হাজার টাকা তাঁর কাছে কতটা অক্সিজেন। তিনি হয়তো স্বামীর কাছেও চাইতে পারেন না। অন্তত লক্ষ্মীভাণ্ডার তাঁকে আত্মমর্যাদা দিয়েছে। তিনি দেখেছেন, তাঁর মেয়ে সাইকেল নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে। এই সাইকেল আগে কেউ তো তাকে কিনে দেয়নি। তিনি জানেন, তাঁর মেয়ের লেখাপড়ার অনেকটা দায় সরকারের। তিনি বোঝেন, অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর নামে একটা কার্ড আছে, যেটা দেখালে অপারেশন পর্যন্ত বিনে পয়সায় করা যায়। ছোট ছোট এমন অনেক প্রকল্প আছে, যা তাঁর মনে ভরসা জুগিয়েছে। আমরা, শহুরে সবজান্তার দল এটাকে ‘ভিক্ষে’ বলে কটাক্ষ করে বিকৃত আনন্দ পেয়েছি। কিন্তু তাঁরা জানেন, ‘হিন্দু–মুসলিম’ বিভাজন সমাজের ভাল করে না, খারাপই করে।
হাতে স্মার্টফোন নিয়ে আমরা ভেবে নিয়েছি, আমরা হয়তো সারা পৃথিবীর খবর রাখি। কিন্তু আসলে আমরা একটা চেনা কুয়োর মধ্যেই আটকে আছি। একটু পাড়ার গুলতানি, একটু সোশ্যাল মিডিয়া— এই তো আমাদের জগৎ। আমাদের বাড়িতে যে কাজের মাসি এসে রান্না করে যান, আমরা তাঁর জীবনের কতটুকুই বা জানি! এই সমাজকে আমরা কতটুকুই বা চিনি!
