সরল বিশ্বাস
ভোটের বাজনা আগেই বেজে গেছে। দেওয়াল লিখন পর্ব আগেই শুরু হয়ে গেছে। অনেক দল আগে থেকেই দেওয়াল বুকিং করে রাখে। প্রার্থীর নাম ঘোষণা হলেই লিখে ফেলা হয়। আবার অনেক দল আগাম প্রতীক এঁকে রাখে। এই চিহ্নে ভোট দিন, এই জাতীয় আবেদনও লেখাই থাকে। শুধু প্রার্থীর নাম ফাঁকা থাকে। পরে সময়মতো সেটা লিখে দেওয়া হয়।
আমার ছোটবেলার একটি গল্প লিখতে খুব ইচ্ছে করছে। আমার পরিবার ছিল বাম ঘরানার। ছোট থেকেই দেখতাম, দেওয়ালে কাস্তে হাতুড়ি আঁকতে। আমি তখন ক্লাস ওয়ান বা টু–তে পড়ি। আমারও ইচ্ছে হল দেওয়াল লেখার। কয়েকদিন আগেই বাড়িতে রঙ হয়েছে। কিছু রঙ বেঁচে ছিল। সেটা ভাল করে গুললাম। তুলিও ছিল। রঙ, তুলি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। পাড়াতেই চুন দেওয়া একটা সুন্দর দেওয়াল ছিল। আহা, এত সুন্দর সাদা দেওয়াল! এখানে একটা কাস্তে হাতুড়ি আঁকাই যায়।
আমি আমার মতো করে ধ্যাবড়া ধ্যাবড়া একটা কাস্তে হাতুড়ি আঁকছি। এমন সময় পেছনে এসে দাঁড়ালেন আমাদের স্কুলের হেডমাস্টার। তিনি ছিলেন স্থানীয় কংগ্রেস নেতা। তিনিই নাকি দেওয়ালে চুনকাম করিয়ে রেখেছিলেন, সেই দেওয়ালে কংগ্রেসের প্রতীক আঁকাবেন বলে। সেই বয়সে আমি ওসব থোড়াই বুঝতাম! আমি ভাবলাম, আমি এইভাবে কাস্তে হাতুড়ি আঁকছি দেখে হেডস্যার বোধ হয় খুব খুশি হয়েছেন। আমি দ্বিগুণ উৎসাহে আরেকটা কাস্তে হাতুড়ি এঁকে দিলাম। উনি কী বলবেন, ভেবেও পাচ্ছেন না।
এদিকে, আমার কাকু দূর থেকে গোটা বিষয়টা দেখছেন। আমার সেই কাকুও হেড স্যারের ছাত্র। তিনিও বাক্রুদ্ধ। আমি কিনা হেড স্যারের সামনে কাস্তে হাতুড়ি আঁকছি! কাকু তো আমার দিকে কটমট করে তাকাচ্ছে। বলল, ‘পড়াশোনা নেই, এইসব করে বেড়াচ্ছিস!’
তারপর হেড স্যারের কাছে হাতজোড় করে বলল, ‘স্যার, ছোট ছেলে বুঝতে পারেনি। ক্ষমা করে দিন। আমি আবার চুন দিয়ে পরিষ্কার করে দিচ্ছি।’ অন্য কেউ তাঁর রঙ করা দেওয়ালে এমন ছবি আঁকছে দেখলে স্যার নিশ্চিতভাবেই ক্ষেপে যেতেন। কিন্তু সেদিন হেডস্যার এতটুকুও রাগলেন না। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। কাকুকে বললেন, ‘ছোট ছেলে একটা দেওয়ালে এঁকেছে, কী হয়েছে! ওকে বকিস না। ও কী আর এসব সিপিএম, কংগ্রেস বোঝে! আর এই দেওয়াল মোছারও দরকার নেই। ছোট ছেলে এঁকেছে, থাক। মুছে দিলে ওর খারাপ লাগবে।’
তখন সত্যিই এত কিছু বুঝতাম না। কত দেওয়ালে এমন প্রতীক এঁকেছি। সেই হেড স্যার আজ আর বেঁচে নেই। সত্যিই, তখন পরিবেশটাই অন্যরকম ছিল। ছাত্র তাঁর রঙ করা দেওয়ালে অন্য দলের প্রতীক আঁকছে দেখেও তিনি বাধা দেননি। বরং, মুগ্ধ হয়ে এই ছেলেমানুষি দেখেছেন। এমনকী পরেও সেই প্রতীক মুছে ফেলেননি। সেই মানুষগুলোই আর হারিয়ে গেছেন। তাই সেই সহিষ্ণুতাও আর খুঁজে পাই না। সেদিনের রাজনীতি আর এদিনের রাজনীতি— ফারাক অনেকটাই।
