ছোটগল্প: #সাহিত্যপ্রেমী

সন্দীপ লায়েক

—–কি পড়ছেন দাদা? শ্রীজাত না?
চমকে উঠে দেখলাম পাশের ভদ্রলোক জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে। বুঝলাম আমার ফেসবুকে কন্ডোম বা ত্রিশূল কিছু একটা দেখে ফেলেছেন। যাই হোক আজকাল বাসেটাসে কেউ খুব একটা কথাবার্তা বলে না- মুখ খিঁচিয়ে ‘ব্যাগটা সামনে রাখুন’ বা ‘সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না’ এই গোটা কয়েক নির্বাচিত সংলাপ ছাড়া।

অপ্রস্তুত হয়েও হাসিমুখে বললাম—হ্যাঁ। -তা আপনারও এসবে ন্যাক আছে দেখছি।
(মনে মনে জিভ কাটলাম। এসব বলতে কি বুঝবে কে জানে!)

—-তা আর বলতে? একসময় বইয়ের পোকা ছিলাম মশাই। এখন সময়ের অভাবে আর হয়ে ওঠে না। তাছাড়া লেখার মানও আজকাল পড়ে গেছে।

আমি মাথা নামিয়ে সম্মতি জানালাম।
—-তা কী ধরনের লেখা পড়েন আপনি? গল্প, উপন্যাস না কবিতা?

ভদ্রলোক বললেন—মুড়ি মুড়কির মত সব পড়েছি এককালে, বঙ্কিম, শরত্, নজরুল, বিভূতি..সব। বঙ্কিমটা টাফ লাগত (যেন পাড়ার ঘোঁতন সম্পর্কে নতুন কিছু info দিলেন!)। শরত্ টা দারুণ। বিশেষ করে ছোটগল্প–ওইযে ইন্দ্র আর শ্রীকান্ত রাত্রে মাছ ধরছে ওটা তো অসাধারণ–কতবার পড়েছি ইয়ত্তা নেই (বুঝলাম টেক্স্ট বুকে পড়েছেন কিন্তু ওটা যে শ্রীকান্ত উপন্যাসের খণ্ডাংশ কে বোঝাবে?)। বিভূতিভুষণের চাঁদের পাহাড় পড়েছেন তো?…কি অপূর্ব। এই হল গিয়ে লেখক, বাড়িতে বসেই লিখে ফেললেন আফ্রিকার জঙ্গল। সিনেমাটাও ভাল তবে বুনীপটাকে না মারলেও পারত (কথা শুনে মনে হল বুনীপের পরবর্তী প্রজন্ম বা চাঁদেরপাহাড় দ্বিতীয় পর্ব নিয়ে বিশেষ ভাবে চিন্তিত)।

chhoto galpa

—কবিতাটা অতটা টানে না। কি বলেন?

—-দেখুন ভাল সবসময়ই ভাল, ভালোর অন্য কোন ডেফিনেশন নেই। কবিতা তো লিখতেন ওই একজন, বিদ্রোহী কবি, রক্ত টগবগিয়ে গরম হয়ে ওঠে। “চল চল চল, ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল,…”। দেখুন দেখুন লোমগুলো কেমন খাড়া হয়ে উঠেছে।

আমি মাইক্রোস্কোপিক চোখে সার্চ করলাম। কিছু দেখতে না পেয়েও পাওয়ার মত ভাব করে বললাম—হুম।

আবার শুরু করলেন —-এখনকার লেখকদের মধ্যে শ্রীজাতটা মন্দের ভাল। কথাগুলো ভাল লেখে কিন্তু ইনার মিনিংটা খুব একটা স্ট্রং নয়। তাছাড়া লিখবে কী করে? কিছু লিখলেই তো মারমার কাটকাট করে লোকজন তেড়ে আসে। এসব হ্যাপার জন্য আমিও লিখি না।

—-বলেন কী? আপনিও…
কথা ছিনিয়ে বললেন—-লেখার হাত নেহাত মন্দ না। কিন্তু একে সময় কম, তারপর উটকো হ্যাপার কুমীর খাল কেটে টেনে এনে লাভ কি? বলুন?

—-তা যা বলেছেন।
কিছুক্ষণ চুপচাপ, এবার সুধালাম—-কোনও মহিলা কবির লেখা?

যেন শূন্যে কিছু হাতড়ে খপ করে মশা ধরে বললেন—-নাহ্। মহিলা লেখক আর হল কই? কেউ কেউ লেখেন ঠিকই কিন্তু সেসব ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। (বুঝলাম মহাশ্বেতা, আশাপূর্ণা, নবনীতা বা বাণী বসুদের পাড়া দিয়ে যাননি কখনও ) তসলিমা লিখত, তবে বড্ড ফেমিনিস্ট আর ধর্মবিরোধী..ওইসব লেখকের জন্যই সাহিত্যটা আজ শেষ হয়ে গেল।

—-তসলিমার লেখা পড়ে দেখেছেন নাকি?

—-নাহ্। ইচ্ছেও নেই, সময়ও নেই। এসব পড়ে সাহিত্য প্রেম যেটুকু টিকে আছে ওটুকু আর নষ্ট করতে চাই না।

—–তাহলে আজকাল আর পড়া হয় না?
—–ওই ফেসবুকে একটু আধটু। হজমিগুলি, কেচ্ছা এসবে ভালই লেখে। কয়েকটা কথায় সুন্দর একটা মেসেজ। মেসেজ না থাকলে আমার ভাল লাগে না। হাজার হোক সাহিত্যপ্রেমী তো..

বাস তরতর করে এগিয়ে চলেছে। গেটের সামনে বেজায় ভিড়..নির্ঘাত পকেটমাররা বাসা বেঁধেছে। একহাতে মোবাইল অন্য হাতে শ্রীলেদার্সের 199 টাকার পার্স নিয়ে আগেভাগেই উঠে দাঁড়ালাম।

বললুম, আপনার সঙ্গে কথা বলে খুব ভাল লাগলো। আপনার মত করে ভাবার লোক আজকাল নেই আর। আজ আসি, ধন্যবাদ।

ভদ্রলোক বুকে ফুলিয়ে অদ্ভুত এক গর্বের হাসি হাসলেন .. সিনেমার পর্দা হলে নির্ঘাত দাবাং এর মত স্যান্ডো গেঞ্জি, শার্ট সব ফেটে উড়ে যেত।

অতঃপর…

ঠেলেঠুলে নেমে পড়লাম বাস থেকে। কিন্তু একি? বোকার মত আগেই নেমে পড়েছি যে? ফালতু অটোতে আবার দশটাকা গচ্চা।

Previous post এর পরেও কি দেশের বিচার ব্যবস্থায় আস্থা রাখা যায় ?
Next post কী দরকার ছিল যাওয়ার!‌

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *