এই রানীগঞ্জ আমার অচেনা

প্রদীপ চক্রবর্তী

গত চব্বিশ ঘন্টা আমার গত কুড়ি বছরেরও বেশি সময়ের লেখালিখির অভিজ্ঞতাকে ম্লান করে দিয়েছে | আমি ভাবলে অবাক হই , এই অর্থহীন লেখালিখি কার জন্য ? লিখে কি হয় ?
আমি সেই ব্যক্তি ,সেই সাধারণের একজন , জনারণ্যে মিশে থাকা হাস্যকর শান্তিপ্রিয় সেই , যে যাবতীয় বাহ্যিক সামাজিক উত্তেজনা থেকে নিজেকে এক পাশে সরিয়ে রেখে ,এক কাল্পনিক ভারতবর্ষ ও বর্তমানের পশ্চিমবঙ্গে বাস করে , ভাবে , শান্তিপ্রিয় এক মানবিক স্বর্গরাজ্যে আছি | এই চূড়ান্ত মূর্খের স্বর্গে বাস করতে করতে , কখনো মনে হয় নি , অশনি সংকেতের বারুদ যে কোনো সময় আমার পায়ের নিচে নিরাপত্তাহীনতার মাটিকে টলিয়ে দিতে পারে এক মুহূর্ত্বে….|
আমি রানিগঞ্জের স্টেশনের কাছাকাছি একটি উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে পড়াই | আমি জানতাম , রঘুপতি রাঘব ,একজন ব্রহ্মজ্ঞানী ছিলেন | আমি জানি না , বাল্মীকির রামায়ণে কোথায় রাজা রাম , অস্ত্র পুজোর কথা বলেছেন ? বাঙালি রাম কে ভালোবেসেছে কৃত্তিবাস ওঝার চোখ দিয়ে , বাঙালির মতো করে | সে কখন যেন রামায়ণ পাঁচালির মধ্যে দিয়ে ,রাম ,হনুমানকে দেখেছে নিজের পরিবারের একজন প্রিয় মুখ হিসেবে | সে রাম কে নিয়ে দ্বিধা বিভক্ত হয়েছেন , আধুনিক মধুসূদনের চোখ দিয়ে ,সে মেঘনাদ বধ কাব্য পড়তে পড়তে জোর তর্ক জুড়েছে | সে ,অসম্মান করে নি , রাবন ও মেঘনাদকে | তার মান্যতার ছিল স্বাধীনতা , তার সংস্কৃতি তাকে বাঙালি – হিন্ধু করে নি শুধু , তাকে করেছে বিশ্ব মানবিক | পরমত সহিষ্ণু , উদার | কিন্তু সব হিসেবে গুলিয়ে যাচ্ছে , বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের কতিপয় রাজনৈতিক ব্যাক্ত্বিত্বের উস্কানি মূলক ইন্ধন জোগানোর পরিকল্পিত কার্যকলাপে |

ranigunj
কাল যখন স্কুল থেকে বেরোলাম ,একটু আগে , কারণ আজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শুরু ,তাই |, ততক্ষন মিডিয়া জানিয়ে দিয়েছে আপনাদের অনেক কিছু | কিন্তু ট্রেন ধরার জন্য স্টেশনে আসার আগে দেখলাম ,উন্মুক্ত তরোয়াল ,কৃপাণ , লাঠি ,নানারকম অস্ত্র হাতে ,স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় ছুটে আসছে একদল উন্মত্ত যুবক |, চোখের সামনেই দেখলাম , হাতের বোমা কি ভাবে ইঁটের টুকরোর মতো আঘাত করতে পারে বন্ধ দোকানের দরজায় | দাউ দাউ করে দোকানের পর দোকানে আগুন লাগানো হচ্ছে | বহু দোকানে চলছে অবাধ লুট | আমাদের জোর করে স্টেশন এ ঢুকিয়ে প্রচুর পুলিশ ও কম্ব্যাক্ট ফোর্স পাহারা দিচ্ছে | মাঝে মাঝেই রে রে করে তেড়ে আসছে ,স্টেশন এ ঢুকতে চাইছে , একদল উন্মত্ত , জয় শ্রী রাম বলা মানুষ ,….আর পুলিশ বাঁধা দিয়ে যাচ্ছে | চারদিকে পোড়া বারুদের গন্ধ | টায়ার জ্বলে যাচ্ছে দাউ দাউ |
আজ ,আবার যখন উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা নিতে যাচ্ছি , হিল বস্তির কাছাকাছি , একটি মেয়েদের উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে , একশো চুয়াল্লিশ ধারা চলছে , তবুও তার মধ্যে লাঠিসোঠা নিয়ে পথ আটকালো একদল | আমাদের গাড়িকে ঘিরে জিজ্ঞেস করলো ,আমরা হিন্দু না মুসলিম | হঠাৎ ,কাকতলীয় ভাবে , একজন ওই ভিড়ের মধ্যে চিনতে পেরে বললো , মাস্টার লোগ… ছোর দো ….
স্কুলে ,ক্লাসে পৌঁছে দেখছি , টেনশন এ , ছাত্রীরা আকুল ভাবে কেঁদে যাচ্ছে ভয়ে | তাদের থামানো যাচ্ছে না | তাদের একটাই প্রশ্ন , তাদের বাবা মা দাদা ,যারা তাদের নিয়ে এসেছেন , তারা নিরাপদে আছেন কি না ? অনেক বুঝিয়ে তাদের থামানো হলো | পরীক্ষার শেষে আকুল অভিভাবকদের চোখ মুখে উৎকণ্ঠিত , গাঢ় আতঙ্কের ছাপ | কালকেই উচ্চপদস্থ একজন পুলিশ আধিকারিকের হাত ছিন্নভিন্ন হয়েছে বোমের আঘাতে | নিহত হয়েছে , রক্ত ঝরেছে মানুষের ,প্রচুর | আর আজ স্কুল জুড়ে পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ | কম্ব্যাক্ট ফোর্স ভর্তি |, মনে হচ্ছে ,এ কি আমার চেনা রানীগঞ্জ না কাশ্মীর ?..
গোটাশহর জুড়ে অলিখিত বন্ধ | পুড়ে যাওয়া অজস্র দোকান , বন্ধ গৃহস্তের জানলা দরজা | মানুষের মুখে একরাশ আতঙ্কের ছাপ | যেন একদিনের এই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা বয়স বাড়িয়ে দিয়েছে অনেক | চেনা শহর , চেনা মানুষ ,চেনা মুখগুলো বড্ড অচেনা যে ….
একসুদূর প্রসারী চক্রান্ত শুরু হয়েছে গোটা বাংলা জুড়ে | অশুভ বুদ্ধির কেউ কেউ কী চাইছে , বাঙালি সংস্কৃতির ওপর , বাঙালি হিন্দুদের ওপর অন্য বলয়ের হিন্দুদের দিয়ে আগ্রাসী মেরুকরণের দাঙ্গা বা ধর্মীয় কোনো দাঙ্গা ? রামমন্দির বাবরি মসজিদ , গোধরা কাণ্ডের ক্ষত আমরাও বয়ে বেড়াচ্ছি প্রচন্ড ভাবে আজো |যদি কেউ ভাবেন ,যার হচ্ছে হোক ,আমি তো ঠিক ই আছি |, ভুল ভাবছেন | পাশের বাড়িতে আগুন লাগলে ,আপনার বাড়িটিও কিন্তু নিরাপদ নয় |
কোনো, অনুষ্ঠান উৎসব নয় | প্রায় সাত দশক দেশ স্বাধীন , অথচ ,এই দেশের সমস্ত মানুষ আজো ন্যূনতম খাবার ,পোশাক ,বাসস্থান শিক্ষা পায় না | হাজার প্রকল্পের ভিড়ে , ক্ষুধার্থ মানুষ প্রচন্ড কাঁদছে | রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এই সমস্যার গোড়ায় গিয়ে সমাধান না করা | এই সমস্যা জিইয়ে রাখা , তাতেই ভোট কেন্দ্রিক রাজনীতির ফায়দা |
আসুন, আজ আমরা যাবতীয় ধর্মের উর্ধে উঠে ,হাতে হাত রাখি | সমস্ত মানুষকে নিয়ে আসি একটা ভালোবাসার দৃঢ ছাতার নিচে |, যে যেখানেই থাকি , শহর গ্রাম মফস্বল প্রত্যন্ত এলাকায় পাড়ায় চলুন ,যে যেরকম ভাবে পারি , ভালোবেসে মানুষের হাতে হাত রাখি |
আজথেকে পাঁচশো বছর আগে , সব চেয়ে বড়ো মানবিক রাজনীতি বা বিপ্লব করেছিলেন , ভালোবাসার অস্ত্র দিয়ে দুকূল প্লাবিত করে , যবন হরিদাস কে বুকে নিয়ে ,শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু |, নানক , বুদ্ধ , তুকারাম , কনফুসিয়াস , দাদূ , হজরত মোহম্মদ, যীশু , রামকৃষ্ণ কেউ কখনো মানবিক ভালোবাসার বাইরে মানুষকে কখনো শিক্ষা দেন নি …..
মানুষ বড়ো কাঁদছে , মানুষের পাশে দাঁড়ানো আজ খুব দরকার | এবং অবশ্যই বাঙালি হিসেবে আমি গর্বিত আমার সাহিত্য আমার সংস্কৃতির জন্য | এর ভিত যথেষ্ট মজবুত | একে ভাঙার ক্ষমতা কোনোদিন কোনো বিজাতীয় শক্তির ছিল না …… আজো নেই |

 

(সংগৃহীত। বেঙ্গল টাইমসের  এক শুভানুধ্যায়ীর পাঠানো। এই কঠিন সময়ে  এটা প্রকাশ করার নৈতিক দায় থেকেই বেঙ্গল টাইমসেও প্রকাশিত হল)

Previous post এই গরমে কামাখ্যায়, মন্দী কী?‌
Next post পুলিস বা মিলিটারি লাগেনি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *