স্মৃতির মেঘে ঢাকা বন্দিশিবির

মলয় সিংহ
মেঘের ভেলায় বসে বক্সাদুয়ারের ইতিহাসের পাতায় পাতায় অনায়াসেই বিচরণ করা যেত। যদি পুরানো বক্সাদুর্গের ঐতিহ্য সিঞ্চুলা পর্বতশ্রেণীর মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকত। পাহাড়ের সৌন্দর্য অম্লান থাকলেও বক্সাদুর্গের অস্তিত্ব লুপ্তপ্রায়। পড়ে আছে শুধু দুর্গের ভাঙা পাঁচিল ও কিছু রক্ত ঝরানো ইতিহাসের স্মৃতি।

buxa
সময়টা ১৯৩০ সাল। সাড়া দেশজুড়ে ইংরেজ সরকারের স্বৈরাচারী শাসন ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলনের অগ্নিযুগ। দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খলা থেকে মুক্তিই জীবনের মূলমন্ত্র করে অনুশীলন সমিতি, যুগান্তার, বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স সহ নানা দলের বিপ্লবী সৈনিকরা ইংরেজ সরকারের বন্দুকের নলকে তুচ্ছ করে দেশজুড়ে আন্দোলনের আগুন জ্বালিয়ে ছিলেন। বিপ্লবী আন্দোলনকে থামাতে ইংরেজ সরকার নানা পন্থাও অবলম্বন করেছিল। সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র ছিল দ্বীপান্তার। বাংলার বিপ্লবী দলের বীর সৈনিকদের আটক করে বক্সা পাহাড়ের বন্দি শিবিরে পাঠিয়ে দেওয়া শুরু হল। কারও ঠিকানা হল বক্সা পাহাড়, কারও ঠিকানা আন্দামান।
দ্বীপান্তর সাজাকে জোরদার করার জন্য জলপাইগুড়ির উত্তর–পূর্বে সিঞ্চুলা পর্বতশ্রেণীর দক্ষিণ কোলে আড়াই হাজার ফুট উঁচুতে, বক্সা সেনানিবাসকে বন্দিশিবিরে পরিণত করা হয়েছিল। বিপ্লবী আন্দোলনকে থামাতে ইংরেজ সরকার দ্বীপান্তার সাজায় আটক করে বক্সা পাহাড়ের বন্দী শিবিরে পাঠিয়ে দিত বাংলার বিপ্লবীদের। শান্ত পাহাড়ের কোলে, মেঘে ঢাকা বন্দী শিবিরে লুকিয়ে আছে কত আত্মত্যাগের ইতিহাস। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্নিযুগের প্রথম পর্যায় ১৯৩০ থেকে ১৯৩৭ পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় পর্যায় ১৯৪১ থেকে ১৯৪৬‌। সময়টা বক্সা বন্দীশিবিরে ছিল বিপ্লবী সৈনিকদের তীর্থভূমি।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও বক্সার দূর্গকে বন্দিশালা হিসাবে ব্যবহার করা হয় ১৯৫২ সাল পর্যন্ত। ১৯৪৮ সালের ২৬ মার্চ পশ্চিমবঙ্গে বিধানচন্দ্র রায় মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন রাজ্যসরকার কমিউনিষ্ট পার্টিকে বেআইনি ঘোষণা করেছিল। সেই সময় বক্সার বন্দী শিবিরে অনেক বামপন্থী নেতাদের আটক করে রাখা হয়েছিল। শান্ত পাড়ারের কোলে থাকা লুপ্তপ্রায় পুরানো বক্সাদুর্গের বন্দি শিবির দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে কমিউনিষ্ট পার্টির উথানের সাক্ষী। এখানেই বন্দী ছিলেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। সেই জেলজীবন নিয়ে দুরন্ত একটি বই লিখেছিলেন— মেঘের গায়ে জেলখানা। বক্সার কত অজানা ইতিহাস রয়ে গেছে এই বইয়ে।

buxa2

আলিপুরদুয়ার থেকে বাসে বা প্রাইভেট গাড়ি করে বক্সা রোড ধরে রাজাভাতখাওয়া। সেখানে জয়ন্তীর জঙ্গল ঘেষা শুরু পিচের রাস্তা ধরে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে সান্তালাবাড়ি। এই সান্তালাবাড়ি থেকে বক্সাদুয়ারের দূরত্ব মাত্র ৪ কিলেমিটার। অনেকটাই পায়ে হেঁটে উঠতে হবে। সমতল থেকে বক্সা দুর্গের উচ্চতা প্রায় ২৪০০ ফুট। দুর্গের কাছে যেতে হলে আরও ১০০০ ফুটের মতো পাহাড়ি খাড়াই পথ ধরে হাঁটতে হবে। কথায় আছে, কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে। গন্তব্যে পৌঁছনোর পর রেস্ট হাউসের বারান্দার সোফায় বসে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের শোভা ও ফুরফুরে হাওয়ায় রাস্তার কষ্টের কথা ভুলিয়ে দেবে। সোফায় বসে মনে হবে যেন দার্জিলিংয়ে বসে আছি। বক্সার পাহাড় সুন্দরীকে যেন প্রকৃতি অকৃপণভাবে সাজিয়েছে। বন্দিদশায় স্বাধীনতা আন্দোলনের বীর সৈনিকদের কলমেও শান্ত ‌পাহাড়ের কোলে ঘুমিয়ে থাকা জেলখানার অনেক বিবরণ পাওয়া যায়।
স্বাধীনতার পর থেকে ধীরে ধীরে বক্সা দুর্গের বহু স্মৃতিবিজড়িত স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐতিহ্য, অতীতের রক্ত ঝরা সফলতা ও ব্যর্থতা এবং বিপ্লবীদের স্বপ্ন আজ অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে। ১৯৯৭ সালে ১৩ ডিসেম্বর মহাসাড়ম্বরে বক্সায় দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ৫০ বছর উদযাপন হয়েছিল। আর পাওনা শুধু বিপ্লবী পুর্ণেন্দু সেনগুপ্তকে দিয়ে একটি স্মারকস্তম্ভের উদ্বোধন। পাশাপাশি একটি সংগ্রহশালা। কিন্তু যে বন্দি শিবির নিয়ে গৌরবময় বিপ্লবের ইতিহাস তা সংরক্ষণের কোনও পদক্ষেপের বদলে দেখা গেল উদাসীনতার ছবি। একদিকে বিলুপ্তির হাতছানি। অন্যদিকে ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই। দুই টানাপোড়েনে কোনটা এগিয়ে থাকবে, তা সময়ই বলবে।।

(‌বক্সাদুয়ারের ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখা। আপনার প্রিয় কোনও জায়গা নিয়ে আপনিও লিখতে পারেন। পাঠিয়ে দিন বেঙ্গল টাইমসের ঠিকানায়। ঠিকানা:‌ bengaltimes.in@gmail.com)‌

web-banner-strip

Previous post শুক্রবারেই এসে যাচ্ছে ভালবাসার বাড়ি
Next post কথা বলার লোকের বড্ড অভাব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *