ময়ূখ নস্কর
ইমাম বরকতি নতুন করে পাকিস্তান চেয়েছেন।
হিন্দি ভালো জানি না, উর্দু তো একেবারেই জানি না, তবু লোকমুখে যা শুনলাম, ভিডিওতে যা দেখলাম, তাতে মনে হল, তিনি ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র করার বিরোধিতা করেছেন। বলেছেন, ভারত হিন্দুরাষ্ট্র হলে মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান দেওয়া হোক।
আমরা সবাই চাই, ভারত ধর্মনিরপেক্ষ দেশই থাকুক। ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র ঘোষণা করার চেষ্টা হলে আমরা যার যতটুকু শক্তি তা নিয়ে প্রতিবাদ করব। আপনি যদি বলতেন, হিন্দুরাষ্ট্র মানব না, তাহলে কারোর কিছু বলার ছিল না। কিন্তু আপনি কী
বললেন? বললেন, পাকিস্তান দেওয়া হোক।
বরকতি সাহেব এত দেশ থাকতে পাকিস্তান কেন? নিষ্ঠাবান মুসলমান হিসাবে আপনার তো উচিত ছিল, সৌদি আরবের দাবি জানানো। বলা উচিত ছিল, মুসলমানদের জন্য সৌদি আরব দেওয়া হোক। হজরত মহম্মদের জন্মস্থান, কর্মস্থান, মক্কা-মদিনা… এসবের থেকেও পাকিস্তানের নামটাই আপনার মনে এল কেন?
উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান প্রভৃতি দেশের কথা বলতে পারতেন। ইরান, তুরস্ক প্রভৃতি উন্নত দেশের কথা বলতে পারতেন। বাড়ির কাছে বাংলাদেশের কথা বলতে পারতেন। পাকিস্তানকেই আপনার এত ভালো কেন লাগল বলতে পারেন?
আচ্ছা বেশ! পাকিস্তানকে আপনার ভালো লাগে তাই পাকিস্তানের কথা বলেছেন। কিন্তু ভারতের মুসলমানদের যদি নতুন করে একটা পাকিস্তান দেওয়া হয়, আপনি সেখানে কোন মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করবেন? পাকিস্তানে শিয়া, সুন্নি, আহমেদিয়া, মহাজিরদের মধ্যে সংঘর্ষ চলছে। আপনি কাদের দলে থাকবেন?
পাকিস্তানে প্রতিনিয়ত মুসলমানের হাতেই মুসলমানরা মরছে। হজরত মহম্মদের ধর্মের সম্মান ধুলায় মিশিয়ে দিয়ে বোমার আঘাতে ইস্কুল ওড়ানো হচ্ছে, মসজিদ ওড়ানো হচ্ছে। নতুন পাকিস্তানেও যদি একই ঘটনা ঘটতে থাকে, আল্লা না করুন, আপনার উপরে যদি অন্য সম্প্রদায়ের মুসলমানরা আক্রমণ করে, তখন আবার ভারতে ফিরে আসার ম্যাও ধরবেন নাতো?
বরকতি সাহেব। যতদূর জানি, পাকিস্তানে তিন তালাক নিষিদ্ধ। পাকিস্তানকে এত ভালবাসেন, আপনি নিশ্চয়ই আপনার নতুন পাকিস্তানে তিন তালাক নিষিদ্ধ করে দেবেন? তাহলে দেরি করছেন কেন? নতুন পাকিস্তানের দাবি তোলার পাশাপাশি তিন তালাক নিষিদ্ধ করার দাবিও তুলুন।
আপনি আরও বলেছেন, লালবাতি লাগানো গাড়ি আপনি ছাড়বেন না। কারণ এই বাতি লাগানোর অধিকার ইংরেজ সরকার আপনার বাবাকে দিয়ে গেছিল। পাকিস্তানের পাশাপাশি ইংরেজদের প্রতিই বা আপনার এত ভালোবাসা কেন? ইংরেজরা কি শুধু লালবাতি দিয়েছিল? বুট, লাঠি, গুলি, চাবুক, ফাঁসি, মন্বন্তর, দেশভাগ এসব দেয়নি?
কার নামাঙ্কিত মসজিদে আপনি ইমামতি করেন তা জানেন? টি-পু-সু-ল-তা-ন। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তিনি ইংরেজদের সঙ্গে লড়েছিলেন। ইংরেজরা তার দুই ছেলেকে বন্দি করে কলকাতায় এনেছিল। তবু তাঁকে দমানো যায়নি। ইংরেজের গুলিতে লড়াইয়ের ময়দানে প্রাণ দিয়েছিলেন তিনি। শোনা যায়, মৃত্যুর পর ইংরেজরা তার গোঁফ কেটে নিয়েছিল। সেই টিপুর নামাঙ্কিত মসজিদের ইমাম ইংরেজের দেওয়া লালবাতিকে গৌরব বলে মনে করছেন? হায় টিপু! হায় স্বাধীনতা!
ইমাম সাহেব, পাকিস্তান তো দেওয়া হয়েছিল। যারা পাকিস্তানকে ভালোবাসে তারা সেখানে চলে গেছে, কেউ বাধা দেয়নি। কিন্তু যারা থেকে গেছে, তারা ভারতকে ভালবেসে থেকে গেছে। ভারতের আইন মানবে বলে থেকে গেছে। যদি কেউ মনে করে ভারতের আইন মানবেন না, ইংরেজের আইন মানবেন, নতুন করে পাকিস্তান চাইবেন তাহলে বলতেই হয়, দেরি করে ফেলেছেন। ৭০ বছর
আগে সিদ্ধান্তটা নেওয়া উচিত ছিল।
হিন্দুরাষ্ট্রের বিরোধিতা করুন, কিন্তু মুসলমানদের জন্য আলাদা দেশ চাইবেন না। আর দয়া করে নিজের সঙ্গে দেশের সব মুসলমানকে এক করে ফেলবেন না। আমাদের বিশ্বাস, ভারতের মুসলমানরা ভারতেই থাকতে চান। ইসলাম ধর্ম মেনে থাকতে চান, ভারতের আইন মেনে থাকতে চান।

