ময়ূখ নস্কর
আমার একটা বাজে অভ্যাস আছে। মোহনবাগান কোনও টুর্নামেন্ট জিতলে আমি আমার শত্রুদের, মিষ্টি খাওয়াই। তাই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলেই আমি শত্রু খুজতে বার হই। বিয়ে হওয়ার পর থেকে অবশ্য বাড়ির বাইরে শত্রু খুজতে হয়নি। বউয়ের মতো পরম শত্রু আর কে আছে?
কিন্তু আগামি ২২ তারিখ মোহনবাগান আই-লিগ জিতে গেলে কাকে মিষ্টি খাওয়াব তা নিয়ে মহাসমস্যায় পড়েছি। আপনারা কি আমার সমস্যা সমাধান করতে পারবেন? তাহলে একটু মন দিয়ে প্রথম থেকে শুনুন।
ক্লাস নাইনে, বসু স্যার-এর কোচিংয়ে পড়তে গিয়ে, জীবনে প্রথম প্রেমে পড়েছিলুম। পড়েছিলুম মানে একাই পড়েছিলুম, অপর পক্ষের মতামত জানা হয়নি। জানব কী করে? জানার আগেই তো প্রেম ভেঙ্গে গেল। মেয়েটার সব ভালো ছিল জানেন। দেখতে ভালো, পড়াশোনায় ভালো, ব্যবহার ভালো, হাতের লেখা খুব ভালো। কী কারণে জানি না, তার মতো ভালো মেয়ে, আমার মতো ন্যাজ কাঁটা বাঁদরকে বেশ লাই দিত। আমি যেদিন যেদিন কোচিং কামাই করতাম, সেদিনের নোটস নিজে থেকেই আমাকে দিয়ে দিত। গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, আমি একবার মুখ ফুটে বললেই প্রেমটা হয়ে যেত। বলব বলে দিনক্ষণ ঠিক করেও ফেলেছিলাম। কিন্তু ঠিক তার একদিন আগে জানতে পারলাম, মেয়েটি বাঙাল এবং ইস্টবেঙ্গলের সাপোর্টার।

মেয়েটার সঙ্গে প্রেম করা হয়নি বলে খুব মন খারাপ হয়েছিল জানেন। অনেক দিন পর্যন্ত মনখারাপটা ছিল। কিন্তু প্রেম করলেই তো বিয়ে করতে হত। আর আমার ঘরে, আমার বউ, ইস্টবেঙ্গলের হয়ে গলা ফাটাবে ? কভি নেহি!
দ্বিতীয়বার প্রেমে পড়লাম সাংবাদিকতা পড়ার সময়। উত্তর কলকাতার এক বনেদি পূজা কমিটির সদস্যের বাড়ি গেছিলাম পূজা কভারেজের কাজে। গিয়ে দেখি, তাঁর বাড়িতে মোহনবাগানের মেম্বারশিপ কার্ড। আরও দেখি, তাঁর নাতনিটি ফুটবলের ব্যাপারে বেশ ওয়াকিবহাল। ফুটবলের এমনই গুণ যে, যে কোনও দুজন অপরিচিত মানুষ ফুটবল–ফুটবল করতে করতে বন্ধু হয়ে যায়। আমাদেরও তাই হল।
তখন বিশ্বকাপ চলছে। আমি আর্জেন্টিনা, সে ব্রাজিল। টকটক ঝালঝাল বন্ধুত্ব বেশ জমে উঠল। ওদিকে বিশ্বকাপ শেষ হয়ে জাতীয় চলে এল। বন্ধুত্ব তখন জমে দই। একদিন বললাম, কাল যুবভারতীতে মোহনবাগানের খেলা আছে। যাবে? সে মুখ হাঁড়ি করে বলল, আমরা বাঙাল। দাদু মোহনবাগান। কিন্তু আমি ইস্টবেঙ্গল।
হে ভগবান, এর থেকে আমাকে লাল কার্ড দেখিয়ে দুনিয়া থেকে বার করে দিলে না কেন?
যাই হোক, এরপর থেকে সতর্ক হয়ে গেলাম। সুন্দরী মেয়ে দেখলে আগে খোঁজ নিই, সে ঘটি না বাঙাল? মোহনবাগান না ইস্টবেঙ্গল?
তখন সবে লেখালেখি শুরু করেছি। সবাই বলে, সাংবাদিকতা করলে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হয়। এটাই না কি সাংবাদিকতার নীতি।
যথাসাধ্য চেষ্টা করতাম সেই নীতি মেনে চলার। কিন্তু মোহনবাগানের প্রসঙ্গ উঠলেই, নিকুচি করেছে নীতির, নিকুচি করেছে নিরপেক্ষতার, আমি মোহনবাগানি এবং মৌলবাদী মোহনবাগানি।
এই সময় একটি মেয়ের সঙ্গে আলাপ হল। খোঁজখবর নিয়ে দেখলাম, আমার যা কপাল, এই মেয়েটিও ইস্টবেঙ্গল। সে নিজে খুব একটা খেলার ভক্ত নয়, কিন্তু বাড়ির সবাই, ওই যে লোটা না কি বলে, তাই। ভেবেছিলাম একে নিয়ে কিছু ভাবব না। কিন্তু একদিন মেয়েটা, গদগদ কণ্ঠে বলল, জানো, আজকাল ইস্টবেঙ্গল হারলে আমার ভালো লাগে।
– সে কি? তুমি তো ইস্টবেঙ্গল?
– হ্যাঁ, আমি ইস্টবেঙ্গল। কিন্তু ইস্টবেঙ্গল হারলে তুমি আনন্দ পাও, তাই আমিও আনন্দ পাই।
বুকের ভেতরটা কেমন তোলপাড় হয়ে গেল। বলে কী? আমি আনন্দ পাব বলে নিজের দলের পরাজয় কামনা করে? এ মেয়ের সঙ্গে তো প্রেম করতেই হবে।
করেছিলাম প্রেম। অনেকদিন করেছিলাম। তারপর যা হয়। কেরিয়ার গুছিয়ে নিতে আমার দেরি হচ্ছে, ওদিকে তার বয়স বাড়ছে। আর অপেক্ষা করা গেল না। সে একটা বাঙাল ছেলেকে বিয়ে করল।
ছেলেটাকে আমি চিনতাম, বাঙাল হলেও সে মোহনবাগানের সাপোর্টার। তাই ভেতরটা জ্বলে গেলেও প্রান খুলে অভিশাপ দিতে পারিনি।
এর কয়েক বছর পর বিয়ে করলাম। আমার বউ ঘটি। তাঁর তিনকুলে কোথাও কেউ বাঙাল নেই। কিন্তু এমনই ট্র্যাজেডি – সে মেয়ে অফসাইড আর অফস্পিনের তফাত বঝে না। শিবদাস ভাদুড়ি বললে ভাবে, জয়া ভাদুড়ির কোনও আত্মীয়।
যে বার মোহনবাগান সাসপেন্ড হল, সে ৩২ পাটি দাঁত বের করে বলল, “ক্লাব তো নয়? যেন আমার সতীন। যাক বাবা সাসপেন্ড হয়েছে, এখন দিন কতক স্বস্তি পাওয়া যাবে।“
চোখ পাকিয়ে বলেছিলাম, “ফের যদি অমন কথা শুনি, মা কালীর থানে বলি দেব। ”
সেই যে বউয়ের মুখ গোমড়া হল, আজ অবধি স্বাভাবিক হয়নি।
এখন তো অবস্থা চরমে উঠেছে। আমি দিনরাত মোহনবাগান, মোহনবাগান করছি দেখে বউ বাপের বাড়ি চলে গেছে। স্বাভাবিক, ‘সতীনকে’ নিয়ে মাতামাতি কোন মেয়ে সহ্য করতে পারে ! এতে অবশ্য আমার কোনও অসুবিধা হয়নি। গেছে তো গেছে।
কিন্তু দিন কয়েক কী হয়েছে, কে জানে, ফোনে গলার স্বর কেমন অচেনা অচেনা ঠেকছে। বলছে, ‘নিজের ফুর্তি নিয়ে নিজে আছে। একবারও মনে হয় না, বাড়িতে একটা মানুষ আছে, তাকে একদিন খেলা দেখতে নিয়ে যাই।’
অ্যাঁ, বলে কী? আমি তো নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছি না। তবে কি মোহনবাগানের এমনই জাদু যে আমার বউয়ের মনেও লিগ জেতার নেশা লেগেছে? আচ্ছা আপনারাই বলুন, এরপরেও কি বউটাকে শত্রু বলা যায়?
তাহলে আমি লিগ জেতার পর কাকে মিষ্টি খাওয়াব? আপনারা আমাকে একটা শত্রু খুঁজে দিতে পারেন?


