পার্থবাবু, চুপি চুপি গিনেস বুকে নাম পাঠিয়ে দিন

স্বরূপ গোস্বামী

একরকম প্রশ্ন করুন। অন্যরকম উত্তর পাবেন। আমাদের শিক্ষামন্ত্রী এটা মোটামুটি রুটিন করে ফেলেছেন। যে কোনও প্রশ্ন উঠলেই এখনও টেনে আনবেন বামফ্রন্ট আমলের ৩৪ বছরের কথা। প্রথম প্রথম এটা ঠিক ছিল। কিন্তু ছ বছর নিজেরা ক্ষমতায়। এখনও যদি ৩৪ বছরের ভূত তাড়া করে, তাহলে তো মহা মুশকিল।
যে কোনও কলেজে ঝামেলা হোক, ভাঙচুর হোক। শিক্ষামন্ত্রীর বিবৃতি কী হবে, তা সহজেই বলে দেওয়া যায়। ইদানীং বলা হচ্ছে, ‘‌শিক্ষাঙ্গনে বিশৃঙ্খলা বরদাস্ত করা হবে না।’ শিক্ষামন্ত্রীর তো এমনই বলার কথা। কিন্তু ব্যবস্থা কী হচ্ছে, তা আর জানা যাচ্ছে না। বরং যাঁরা হাঙ্গামায় মূল অভিযুক্ত, তিনি তাঁদের সঙ্গেই বৈঠক করছেন। কে কোথায় ছাত্র সংগঠনের দায়িত্বে থাকবেন, কীভাবে বিক্ষোভ বা আন্দোলন হবে, সেটা ঠিক করে দিচ্ছেন শিক্ষামন্ত্রী। সারা পৃথিবীতে এমন নজির আছে?‌

partha4

থাক সেসব কথা। এই লেখার বিষয় অন্য। অন্যের মুখের ঝাল খেতে গেলে কী হয়, সেটা তিনি বোধ হয় জানতেও পারলেন না। টেট নিয়ে সর্বত্রই অভিযোগ। যাঁরা যখন শাসন ক্ষমতায়, দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। স্বজনপোষণের অভিযোগ উঠেছে। এটা নতুন কিছু নয়। আগের বাম জমানাও এই নিয়মের ব্যতিক্রম ছিল না। এই জমানায় তৃণমূল ঘনিষ্ঠ কিছু লোকের চাকরি হবে, কিছু টাকার বিনিময়ে চাকরির কথা শোনা যাবে, এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কিন্তু বিধানসভার শিক্ষা বাজেটে এক বিধায়ক সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ তুললেন, জলপাইগুড়ি জেলা প্রাথমিক স্কুল কাউন্সিলের যিনি সভাপতি, তাঁর ভাই ও ভাইজির চাকরি হয়েছে। তিনি নিজের হাতে ভাই ও ভাইজির নিয়োগপত্রে সই করেছেন। সাধারণত, যাঁদের নিকট আত্মীয়রা পরীক্ষা দেন, তাঁদের পরীক্ষা পদ্ধতির সঙ্গে কোনওভাবেই যুক্ত রাখা হয় না। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক থেকে চাকরির পরীক্ষা— সবক্ষেত্রেই এই নির্দেশিকা মেনে চলা হয়। তৃণমূলের অন্য নেতার আত্মীয়দের চাকরি হতেই পারে। কারণ তাঁরা ইন্টারভিউ বোর্ডে বা পর্ষদের চেয়ারে বসে নেই। কিন্তু নিকট আত্মীয় পরীক্ষার্থী, এই অবস্থায় এমন একজন লোককে পর্ষদের সভাপতি করা হল কেন?‌ এটাই ছিল মূল প্রশ্ন।

পার্থবাবু উত্তর দিয়ে বসলেন, সিপিএমের অনেকের চাকরি হয়েছে। তালিকাটি নিরপেক্ষ বলেই সিপিএম নেতাদের আত্মীয়দের চাকরি হয়েছে। তারপর ২৬ জনের একটি নামের তালিকা তুলে ধরলেন। দেখা যাচ্ছে, জলপাইগুড়ি জেলায় সিপিএমের প্রাক্তন সম্পাদক মাণিক সান্যালের আত্মীয়ের চাকরি হয়েছে। শোনা যায়, আলিপুরদুয়ারের বিধায়ক সৌরভ চক্রবর্তী নাকি মন্ত্রীকে এই তালিকাটি দিয়েছেন। আর মন্ত্রী সেটাই গড়গড় করে পড়ে গেলেন। একবারও তলিয়ে দেখলেন না তালিকাটা কোন সময়কার। মানিক সান্যালের আত্মীয়ের কথা বলা হচ্ছে, সেটি হয়েছিল বাম জমানায়। তা নিয়ে অনেক নিন্দার ঝড় বয়ে গিয়েছিল। জেলা সম্পাদকের নিকট আত্মীয়ের যদি চাকরি হয়, প্রশ্ন ওঠা অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু সেই তালিকা এত বছর পর তুলে ধরতে হচ্ছে কেন?‌ মানিক সান্যালের আত্মীয়ের যদি বাম জমানায় চাকরি হয়েই থাকে, তা দিয়ে আপনার নিরপেক্ষতা প্রমাণ হচ্ছে কীভাবে?‌ সৌরভ নিশ্চয় জানেন, তালিকাটা পুরনো। কিন্তু তিনি হয়ত শিক্ষামন্ত্রীকে তা বলেননি। বা বললেও শিক্ষামন্ত্রী বোঝেননি। তিনি গড়গড় করে পড়ে গেলেন। দেখাতে চাইলেন, তাঁর সময়ে সিপিএমের লোকেদেরও চাকরি হয়েছে। বছর পাঁচেক আগে স্কুল পর্ষদ সভাপতি মানিক ভট্টাচার্যও তাঁর চেয়ারে বসে সাংবাদিক সম্মেলনে এই জাতীয় নামের তালিকা দিয়েছিলেন।
bidhan sabha
সহজ কথা, এই তালিকা দেখিয়ে বলা যেতে পারত, বাম আমলেও স্বজনপোষণ হয়েছে। কিন্তু বুঝে হোক, না বুঝে হোক, মন্ত্রী বলে বসলেন, এবারের নিয়োগ যথার্থ হয়েছে। কারণ, তালিকায় বিরোধীরাও আছেন। পার্থবাবু আর সৌরভের মধ্যে একটি অদ্ভুত মিল আছে। দুজনেই একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন। দুজনেই তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর, সরকারি পদে থাকাকালীন ‌পিএইচডি করেছেন। পার্থবাবু ছিলেন মন্ত্রী, আর সৌরভ ছিলেন এনবিএসটিসি–‌র চেয়ারম্যান। কীভাবে সেই পিএইচডি হয়েছে, যাঁর সামান্যতম বোধবুদ্ধি আছে, তাঁরা সহজেই অনুমান করতে পারেন।
সেই সৌরভ তালিকা দিলেন। সেই তালিকাকে নিজের নিরপেক্ষতার ঢাল করলেন শিক্ষামন্ত্রী।
যদি তালিকাটা এবারেরই হত, তাহলেও কি এভাবে নাম বলা যায়?‌ যাঁরা পরীক্ষার্থী, সরকারের কাছে তাঁরা শুধুই পরীক্ষার্থী। তাঁর কোনও বংশপরিচয় অ্যাডমিটে বা সরকারি নথিতে থাকার কথা নয়। তাহলে, শিক্ষামন্ত্রী কীভাবে চিহ্নিত করলেন কে সিপিএম, কে কে সিপিএম ঘনিষ্ঠ, কে সিপিএম নেতার আত্মীয়?‌ যদি দলীয় স্তরে অনুসন্ধান করে এমন তালিকা পাওয়াও যায়, দলের কোনও নেতা বলতেই পারেন। তাই বলে শিক্ষামন্ত্রীর চেয়ারে বসে সেটা বলা যায়?‌
কোনটা বলা যায়, কোনটা সরকারি চেয়ারে বসে বলা যায় না, এই বোধটুকুও নেই। তিনি শিক্ষামন্ত্রী। সারা দেশের ইতিহাসে তিনিই সম্ভবত প্রথম শিক্ষামন্ত্রী, যিনি নিজের অধীনস্থ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইডডি ডিগ্রি নিয়েছেন। সারা পৃথিবীতেও এমন নজির আছে কিনা সন্দেহ। পার্থবাবু, চুপি চুপি গিনেস বুকে নাম তোলার আবেদনটা পাঠিয়ে রাখুন। দিদিমণির নাম যদি ইতিহাস সিলেবাসে ঢুকতে পারে, আপনার নামই বা কেন গিনেস বুকে আসবে না?‌

Previous post কী মারাত্মক বিল, কেউ বুঝলেন না!‌
Next post সৌমিত্র আবার নায়ক কবে হলেন !

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *