স্থিতাবস্থা নাকি পরিবর্তন? চিন্তাশীল মানুষের উভয় সংকট

রক্তিম মিত্র
আমি পড়েছি উভয় সংকটে। একদল বলছে, পরিবর্তন চাই। এই সরকারকে আর নেওয়া যাচ্ছে না। আবার আরেক দল বলছে, আর যাই হোক এই রাজ্যে বিজেপিকে ডেকে আনার কোনও মানে হয় না। রাজ্যের পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।
আমি কোন দলে? আমি উভয় দলে। এটাই সংকটের সবথেকে বড় কারণ। আমিও মনে করি, গত ১৫ বছরে তৃণমূল যা যা অনাচার করেছে, কঠোর শাস্তি তাদের প্রাপ্য। আইনের আঙ্গিনায় এই শাস্তি হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। আইন যেটা পারেনি, সেটা অন্তত জনতা দিক। অন্তত ক্ষমতা থেকে তাদের নির্বাসন হোক। সেটাকেই না হয় বড় শাস্তি বলে ধরে নেব। ভবিষ্যতের শাসকদের কাছে অন্তত এই বার্তাটুকু পৌঁছুক, জনতা জনার্দন ঠিক দেখছে। আইন, প্রশাসন, মিডিয়া চোখ বুজে থাকলেও জনতার চোখ ঠিক খোলা আছে।


আবার অন্য একটা আশঙ্কাও আছে। মানুষ যখন একটা সরকারকে প্রত্যাখ্যান করে, পাশাপাশি অন্য একটা সরকারকে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়েও আসে। ঠিক যেমন ২০১১ সালে, মানুষ বামফ্রন্টকে প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি এটাও বিলক্ষণ জানতো যে, বামফ্রন্ট সরে যাওয়া মানে তৃণমূলের আগমন। ঠিক তেমনই, এবার তৃণমূল সরে যাওয়া মানে বিজেপির আগমন। তৃণমূল যেমন পরীক্ষিত, এই রাজ্যের ক্ষেত্রে বিজেপি মোটেই তেমন পরীক্ষিত নয়। ভাবা যেতেই পারে, কত আর খারাপ হবে? আগে তৃণমূল তো যাক। তারপর না হয় বুঝে নেওয়া যাবে। তেমন খারাপ কিছু করলে তাদেরও না হয় সরিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু বাঙালি জাতিটা বড়ই সহনশীল। সে যাকে একবার আনে, তাকে সহজে ছাড়তে চায় না। প্রায় ৩০ বছর ধরে কংগ্রেসকে সহ্য করেছে। পরের ৩৪ বছর বামেদের সহ্য করেছে। তিনটে টার্ম ধরে তৃণমূলকেও সহ্য করছে। তাই একবার যদি বিজেপি এসেও যায়, যতই অনাচার করুক, এত সহজে বাঙালি তাদের ছুঁড়ে ফেলবে না। তাদেরও পর্যাপ্ত সময়ই দেবে। অর্থাৎ বামেরা যতই আগে রাম পরে বাম বলে উল্লাসিত হোন, এই রাম পর্বের মোহ কাটতে অনেক সময় লাগবে।


বিজেপি রাজ্যে তেমন পরীক্ষিত নয় ঠিকই, কিন্তু কেন্দ্রে যথেষ্টই পরিক্ষিত। সেখানে মোদি বাবুর দেখতে দেখতে এক যুগ, অর্থাৎ ১২ বছর কেটে গেল। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে যা যা বলেছিলেন, অনেক ক্ষেত্রে তার এক শতাংশ পূরণ করতে পারেননি। যেমন কর্মসংস্থানের কথাই ধরা যাক। সদর্প ঘোষণা ছিল, বছরে দু কোটি মানুষের চাকরি হবে। ১২ বছরে সেটা ২৪ কোটি হওয়ার কথা। ২৪ কোটির জায়গায় যদি ২৪ লাখও হতো, তাহলেও বলা যেত, অন্তত এক শতাংশের হয়েছে। কিন্তু চব্বিশ লাখেরও হিসেব দেখাতে পারছে না কেন্দ্র। অর্থাৎ নিয়োগ এক শতাংশও নয়। আরও একটি ঘোষণা ছিল, ১০০টি স্মার্ট সিটি তৈরি হবে। ১২ বছরে একশোটি তো দূরের কথা, একটি শহরের নামও বলা কঠিন। ঘোষণা ছিল, বিদেশে গচ্ছিত সমস্ত কালো টাকা ফিরিয়ে আনা হবে। এই নিয়ে এখন আর কোনও উচ্চবাচ্য শোনা যায় না।
এই যদি মোদী বাবুর ট্র্যাক রেকর্ড হয়ে থাকে, তাহলে তাকেই বা কতখানি ভরসা করা যায়? এই রাজ্যে ভোটের আগে তিনি ঘোষণা করে বসলেন, মহিলাদের মাসে 3000 টাকা করে দেওয়া হবে। শুনতে বেশ ভালই লাগে। বিশ্বাস করার লোকের অভাবও নেই। কিন্তু ঘটনা হল, এই মুহূর্তে কুড়িটি রাজ্যে বিজেপি ও তার জোট সঙ্গীরা শাসন ক্ষমতায়। কটি রাজ্যে এই প্রকল্প চলছে? উত্তর হল, একটিও না। তাহলেই বুঝুন। যারা একটি রাজ্যেও তথাকথিত অন্নপূর্ণা যোজনা চালু করতে পারেনি, তারা পশ্চিমবঙ্গে চালু করবে!
আরেক জুমলা। পদে পদে এমন কত জুমলা যে হজম করতে হবে, তা কেউ জানে না। কোন কাজ হল আর কোন কাজ হল না, তা নিয়ে কেউ কৈফিয়ত চাইবে না। যখনই আপনার মনে প্রশ্ন জাগবে, তখনই হয় পাকিস্তানের নাম করে অথবা হিন্দু,  মুসলিমের নাম করে আপনার মগজ ধোলাই ঠিক হয়ে যাবে।


এরপর কোনটা চাওয়া যায় বলুন তো? পরিবর্তন? নাকি স্থিতাবস্থা? যারা ফেসবুকে আচ্ছন্ন, তারা ভেবে বসে আছেন, বামেরা হয়তো ক্ষমতায় এসে যাবে। যদি কয়েকটা কম পড়ে, তাহলে কংগ্রেস আছে। কিন্তু এতখানি অবাস্তব স্বপ্নই বা দেখি কীভাবে? যেটা এই মুহূর্তে হওয়ার নয়, সেটা নিয়ে স্বপ্ন দেখতে গেলে অচিরেই ঘুম চটকে যাবে। অতএব দ্বিধা, দ্বিধা, এবং দ্বিধা। অন্ধকার সরণির শেষে কোথাও কোনও আলোর দেখা নেই।

Previous post এই সমাজকে আমরা কতটুকুই বা চিনি!‌
Next post ‌বাবু কহিলেন, বুঝেছ উপেন এ জমি লইব কিনে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *