স্বরূপ গোস্বামী
দেখতে দেখতে সাতাত্তর বছর হয়ে গেল। বলাই যায়, তিনি বৃদ্ধ হলেন। কিন্তু এখনও পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত দিব্যি ছুটে বেড়াচ্ছেন। এখনও যে কোনও তরুণকে লজ্জায় ফেলে দেবে তাঁর পরিশ্রম। সাম্প্রতিক ক্রিকেটেরও এত খুঁটিনাটি খোঁজ রাখেন, যা অবাক করে দেওয়ার মতো। স্মৃতিশক্তি! প্রতিটি ইনিংসের স্কোরকার্ড তো বটেই, একের পর এক শটের নিখুঁত বর্ণনা দিতে পারেন। এমন লোককে ‘বৃদ্ধ হলেন’ কীভাবে বলা যায়! তবে ওই যে, পরের লাইনটা। বনস্পতির ছায়া দিলেন, সারাজীবন। সেটা দিব্যি বলা যায়। নাইবা হলেন বোর্ড সভাপতি, নাইবা হলেন কোচ। নাই বা হলেন প্রধান নির্বাচক। তবু সুনীল গাভাসকার মানেই প্রকাণ্ড এক ছায়া।
আইপিএল জমানায় বেড়ে ওঠা এই প্রজন্মকে বোঝানো যাবে না, সুনীল গাভাসকার ঠিক কোন জাতের ক্রিকেটার ছিলেন। তাঁরা হয়ত উইকিপিডিয়া খুলবে। দেখবে ১২৫ টেস্ট, ১০১২২ রান, ৩৪ শতরান। তারপর বলবে, দশ হাজার রান তো অনেকেরই আছে। ১২৫ টেস্ট তো অনেকেই খেলেছেন। বলেই থামবে না, দশ হাজার কতজনের আছে, সেই তালিকাও গড়গড় করে বলে যাবে। এই জন্যই নেভিল কার্ডাস নামক লোকটা স্কোরবোর্ডকে আস্ত একটা গাধা বলেছিলেন। কারণ, স্কোরবোর্ড বা রেকর্ড থেকে কিছুই বোঝা যায় না। যেমন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে গাভাসকারের ১৩ টি শতরান। এই তথ্য জানার পর কেউ হয়ত এই ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজকে এক করে ফেলবেন। তাঁরা বলে বসবেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর কী এমন দেশ! বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতেই পারে না! তাঁদের বোঝানো যাবে না, হল, গিলক্রিস্ট, মার্শাল, গার্নার, হোল্ডিং, রবার্টসদের কথা।
বোঝানোর দরকারও নেই। আমাদের মতো যাঁদের বেড়ে ওঠা আটের দশকে, তাঁরা জানি সুনীল গাভাসকার নামটার মাহাত্ম্য। সাতের দশককে উত্তাল দশক বলা হয়। একদিকে জরুরি অবস্থার ভ্রুকুটি। সিনেমার পর্দায় মুশকিল আসান করছেন ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ অমিতাভ বচ্চন। গুন্ডাদের মেরে ঠান্ডা করে এনে দিচ্ছেন সমান্তরাল এক ন্যায় বিচার। সে তো ছিল পর্দার কথা। কিন্তু বাস্তবে ব্যাট হাতে দুনিয়া শাসন করছেন এক বেঁটে মারাঠি। আপাতভাবে ধীর, স্থির, শান্ত। কিন্তু সেই মানুষটাই হেলমেট ছাড়া সামলে দিচ্ছেন ভয়ঙ্করতম ক্যারিবিয়ান পেস ব্যাটারিকে।
কলকাতার জীবন আর মফস্বল জীবনে তখন ঢের ফারাক। কলকাতা যখন তিরাশির বিশ্বকাপের স্মৃতির ঢেঁকুর তোলে, মফস্বল সেখানে অনেকটাই পিছিয়ে। তিরাশিতে অধিকাংশ গ্রামে বিদ্যুৎটুকুও পৌঁছয়নি। যেসব মফস্বল বা আধা শহরে পৌঁছেছে, সেখানেও হাতে গোনা কয়েকটা ঘরে টিভি। তাছাড়া তখনও ক্রিকেটের তেমন চল ছিল না। অনেকেই বলত, ব্যাট–বল খেলা। মফস্বল জীবন তিরাশিকে চিনেছে তিরাশির অনেক পরে। টিভি নামক বস্তুটা উচ্চবিত্তের বেড়া টপকে একটু একটু করে মধ্যবিত্তের বারান্দায় এসে পড়ল। গোটা গ্রামে বা গোটা পাড়ায় হয়তো একটাই টিভি। সেই বাড়িতেই ভিড় জমানো। সেই সাটার দেওয়া সাদা–কালো টিভি। ওয়েস্টার্ন, ওয়েবেল বা সোনোডাইন। একটু ঝড় দিলেই ছাদে টাঙানো সেই অ্যান্টেনা নড়ে যাওয়া। ছবি ঝিলমিল। একজন ছুটল ছাদে, এদিক–ওদিক ঘোরাল। অন্যজন নীচ থেকে চিৎকার করল, ‘আরেকটু, আরেকটু। হ্যাঁ, এবার ঠিক আছে।’ সে ছিল সাদা–কালো টিভির রঙিন এক ভুবন। সবুজ ঘাস, লাল বল— এসবের আলাদা কোনও অস্তিত্ব ছিল না। টিভির পর্দায় নয়, সব রঙ তখন মনের পর্দায়।
মফস্বলের লাইব্রেরির তাকে তখন উকি মারছে ‘সানি ডেজ’, ‘ওয়ানডে ওয়ান্ডারার্স’, ‘আইডলস’ ‘আমি সুনীল গাভাসকার’। সবগুলো তখন বাংলা ভার্সানেই পাওয়া যেত। সব শতরানের বর্ণনা সম্বলিত অশোক দাশগুপ্তর ‘সানির ৩৪’। এখন অনেক খুঁজেও সেসব বই আর পাই না। ফেলুদা–কাকাবাবুরও আগে সেইসব বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব। আর ‘খেলা’ পত্রিকার নানা লেখা ও ছবি তো ছিলই। দেওয়ালজুড়ে নানা ভঙ্গিমায় শুধুই গাভাসকার। কোনওটা রঙিন, তো কোনওটা সাদা–কালো। গাভাসকার রান পেলে দিনটা অদ্ভুত এক রোমাঞ্চে কেটে যেত। বন্ধুরা আইসক্রিম খেতে চাইত। দশ পয়সার ওই ব্র্যান্ডবিহীন রঙবেরঙের জলের আইসক্রিম। যেন গাভাসকার নয়, আমিই সেঞ্চুরি করেছি। আবার গাভাসকার রান না পেলে সারাটা দিন কেমন যেন বিমর্ষ। যেদিন ভারতের খেলা, সেদিন স্কুল–টিউশনি সব বন্ধ। কত বকুনি খেয়েছি। কিন্তু মনে হত, গাভাসকারের জন্য এসব সহ্য করাই যায়।
আটের দশকে আমার কাছে সবথেকে আনন্দের দিন হল গাভাসকারের দশ হাজার রানের মাইলস্টোনে পৌঁছনো। আবার সবচেয়ে দুঃখের দিন হল, লন্ডনে বাইসেন্টিনারি ম্যাচের পরই গাভাসকারের অবসর ঘোষণা। দুটোই ঘটেছিল সাতাশি সালে। প্রায় চার দশক পরেও মনে আছে সেই মুহূর্তটা। আমেদাবাদে ইজাজ ফাকির বলে লেট কাট মেরে সোজা দৌড়লেন ওই মানুষটা। পেছনে হাত রেখে থার্ড ম্যানের দিকে তাকিয়ে সেলিম ইউসুফ। হয়তো বুঝতেও পারছেন না, তাঁর চোখের সামনে কী এক ইতিহাস তৈরি হয়ে গেল। ছোটখাটো মানুষটি পৌঁছে গেলেন দশ হাজার রানের মাইলস্টোনে, ক্রিকেটের এভারেস্টে। ক্রিকেট মাঠে ইজাজ ফাকির তেমন কোনও মনে রাখার মতো কীর্তি নেই। ক্রিক ইনফো ঘেঁটে দেখলাম, ৫ টি টেস্টে মাত্র ৪ টি উইকেট পেয়েছেন পাকিস্তানের এই অফব্রেক বোলার। অমরত্ব পাওয়া একটা ছবিতে তিনিও একটি চরিত্র। কারণ, ওই লেট কাট মেরেই দশ হাজার রানের মাইলস্টোনে পৌঁছে গিয়েছিলেন সুনীল গাভাসকার। ঠিক যেমন, ইকবাল কাশিমকেও মনে রাখারও বিরাট কোনও কারণ ছিল না। কিন্তু কী করে ভুলব সেই ঘাতকের নাম! বেঙ্গালুরুর ওই ঘূর্ণি উইকেটে সানি যখন একশোর দিকে এগোচ্ছেন, তখন ঠিক চার রান আগে তাঁকে থেমে যেতে হয়েছিল। তখনও জানতাম না, ওটাই সানির শেষ টেস্ট। শেষ টেস্টে ৪ রান করলে ব্র্যাডম্যানের গড় নাকি একশো হয়ে যেত। বেঙ্গালুরুতে আর চার রান করলে জীবনের শেষ টেস্টে সানিরও যে শতরান হয়ে যেত! তাই ইকবাল কাশিম নামটাই বা ভুলি কী করে! এভাবেই ‘ক্রিকেটের তেনজিং নোরগে’র সঙ্গে জড়িয়ে গেছে আরও কত নাম।
চার দশক আগেও মেরুকরণের অভাব ছিল না। কখনও তা মোহনবাগান–ইস্টবেঙ্গলকে ঘিরে। কখনও সিপিএম বনাম কংগ্রেসকে ঘিরে। বিষয়টা যদি সিনেমাকেন্দ্রিক হয়, তাহলে তখন জোর লড়াই অমিতাভ বনাম মিঠুন। আর ক্রিকেটের আঙিনায় এলে গাভাসকার বনাম কপিলদেব। একে কপিল বিশ্বজয়ী অধিনায়ক, তার ওপর দুমদাম ছয় মারেন, দুরন্ত আউট সুইং তো আছেই। বিশ্বকাপের ওই রূপকথার ১৭৫ আর ফাইনালে রিচার্ডসের ক্যাচ তো মিথ হয়ে আছে। কিশোর বয়সের বন্ধুমহলে স্বভাবতই কপিলের পাল্লাই ভারী। সেখানে গাভাসকার, বেটেখাঁটো একটা মানুষ, ঠুকঠাক করে রান করে, বল করতে পারে না। এরকম লোক খামোখা কোনও কিশোরের আইডল হতে যাবে কেন? কিন্তু কেন জানি না, ভাল লাগত এই লোকটাকেই। মফস্বলি কিশোরের চিন্তার স্রোত কেন প্রচলিত সুরের উল্টোখাতে বয়েছিল, তা বলা মুশকিল। হয়তো লাইব্রেরির সেই বইগুলো। হয়তো ‘আজকাল’ বা ‘খেলা’র দুরন্ত সেই লেখাগুলো।
আবির্ভাব সিরিজেই ৭৭৪ রান! ভাবা যায়! তাও আবার সর্বশক্তিমান ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে। ৫৫ বছর পেরিয়ে গেল। এত এত রেকর্ড ভেঙে গেল। এত এত রেকর্ড তৈরি হল। এত এত মহাতারকাও এলেন। ওই রেকর্ডের ধারেকাছেও তো কেউ যেতে পারলেন না! সারাজীবনে কী সব বোলারদের সামলাতে হয়েছে! অথচ, মাথায় কোনওদিন হেলমেট পরতে দেখা যায়নি। বিনা হেলমেটে ওই ক্যারিবিয়ান ফাস্ট বোলারদের সামলানো! অনেকটা যেন রূপকথার মতোই। বড়জোর ছোট্ট একটা স্কাল ক্যাপ। ওই স্কাল ক্যাপ পরতে আর কাউকে দেখি না। কী অবলীলায় মার্শালের বিষাক্ত বাউন্সারে হুক করছেন, তাও আবার শতরানের মুখে দাঁড়িয়ে! এখনও মনে পড়ে দশ হাজার রানের সেই মুহূর্তটা। ইজাজ ফাকিকে লেট কাট মেরে সোজা দৌড়। তেনজিংয়ের এভারেস্ট জয় দেখিনি। কিন্তু সানির দশ হাজার তো দেখেছি। এটাই বা কম কী! আজীবন গর্ব করে বলতে পারব, আমাদের একটা সানি ছিল। এই গর্ব আজীবন বয়ে বেড়াতে চাই। আমরা শচীন, কোহলিকে ভালবাসি। তাঁদের জন্যও গর্ব করি। কিন্তু শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্ন এলে চোখ বুজে মনে পড়ে দশ হাজার রানের সেই দৌড়টা।
