রক্তিম মিত্র
হয়রানি ও ভোগান্তি বেড়েই চলেছে। বেড়ে চলেছে রাজনৈতিক তরজা। তিন মাসের বেশি সময় ধরে ঘুরেফিরে শিরোনামে উঠে আসছে এসআইআর। রোজ নিত্য নতুন নিয়ম। নিত্য নতুন ভোগান্তি। এর মধ্যেই কত মানুষের মৃত্যু হল। মৃত্যুর কারণ নিয়ে চাপানোতর থাকতেই পারে, কিন্তু এসআইআর যে জনমানসে ভীতি সঞ্চার করেছে, এ নিয়ে কোনও সংশয় নেই।
এই ভীতি সঞ্চারের পেছনে কেন্দ্রের যেমন ভূমিকা আছে, তেমনই ভূমিকা রয়েছে রাজ্যেরও। আর নির্বাচন কমিশনও কোনও অংশেই কম যায় না। তিন পক্ষই চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো আচরণ করছে। মাঝে মাঝে সত্যিই প্রশ্ন জাগে, এঁরা যে দায়িত্বশীল আচরণের শপথ নিয়েছিলেন, সেগুলো কি মানে না বুঝেই নিয়েছিলেন? অবশ্য, ওই শপথের মানে বুঝতে গেলে যেটুকু বিদ্যে লাগে, দুপক্ষেরই তা নেই।
যাঁরা ভুয়ো ভোটার, তাঁদের আতঙ্ক থাকতেই পারেন। থাকাটা স্বাভাবিকও। কিন্তু যাঁরা সাতপুরুষ ধরে এই বাংলারই বাসিন্দা, তাঁদের মধ্যে কেন আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে? তাঁদের কেন মনে হচ্ছে, তাঁদের দেশছাড়া করা হতে পারে? অমর্ত্য সেনের মতো দিকপাল মানুষের কাছেও কিনা নোটিশ আসছে। কবি জয় গোস্বামী থেকে শুরু করে নানা জগতের দিকপাল মানুষরাও বাদ যাচ্ছেন না। তাঁদের হয়রানির খবর তবু সামনে আসছে। কিন্তু গ্রামের প্রান্তিক মানুষের হয়রানি ও ভোগান্তির কথা আমাদের অজানাই থেকে যাচ্ছে।
প্রশ্ন হল, এই হয়রানি কি এড়ানো যেত না? দু’মাস ধরে বিএলও–রা সমীক্ষা করলেন। এত এত মানুষকে দিয়ে ফর্ম ফিলাপ করালেন। তারপরও অনেক মৃত মানুষের নাম যেমন তালিকায় থেকে যাচ্ছে, তেমনই অনেক জীবিত মানুষের নাম চলে আসছে মৃতদের তালিকায়। এত নিবিড় সমীক্ষার পরেও শুনানির নামে এমন ভোগান্তি কেন? তাহলে কি বিএলও–রা নিয়ম সম্পর্কে অবগত ছিলেন না? তাঁদের ঠিকমতো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি? অনেক ক্ষেত্রেই দাদুর পদবীর সঙ্গে বাবার পদবীর মিল থাকে না। বাবার পদবীর সঙ্গে ছেলের পদবীর মিল থাকে না। মেয়েদের ক্ষেত্রেও বিয়ের আগেও ও পরে নাম বা পদবী বদলে যায়। সামাজিক বিন্যাসের এই ছবিটা পরিষ্কার থাকলে সমস্যা নেই। একেক নামের একেক রকম বানান হয়। কিন্তু যাচাই না করেই যেভাবে নোটিশ পাঠিয়ে হাজিরা দিতে বলা হচ্ছে, তা সত্যিই বেশ বিড়ম্বনার। কখনও দাদুর, কখনও বাবা–মায়ের জন্মের সার্টিফিকেট চাওয়া হচ্ছে। এটা বিজ্ঞপ্তিতে লিখে দেওয়া সহজ, কিন্তু বাস্তবে তা জোগাড় করা কতটা কঠিন, সে সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনের আমলাদের কোনও ধারণা আছে বলে মনে হয় না। প্রতিদিন নতুন নতুন নিয়ম। আজ বলছেন, এটা বৈধ। পরেরদিন বলছেন, ওটা অবৈধ। কয়েক মাস পরেই রাজ্যে ভোট, এই অবস্থায় এই এসআইআর আরও বেশি করে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে এবং তিক্ততার আবহ এনে দিচ্ছে। ভোটার লিস্ট সংশোধনই যদি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে অনেক আগে থেকে এই কাজ শুরু করা যেত।
এমন একটা কাজকে নিয়ে কেন্দ্র হাওয়া গরম করতেই ব্যস্ত। দায়িত্বশীল লোকেরা যদি ক্রমাগত আতঙ্ক ছড়িয়ে যান, সাধারণ মানুষের আর দোষ কী? লক্ষ লক্ষ অনুপ্রবেশকারী আর রোহিঙ্গার গল্প শোনানো হল। শেষমেশ কজনকে চিহ্নিত করা গেল? বিহারেও তো এসআইআর হয়েছে। এত এত লোকের নাম বাদ গেছে। সেখানে কজন অনুপ্রবেশকারীকে চিহ্নিত করা গেছে? কেন্দ্রের মুখে কুলুপ। আসলে, তথ্য দিতে গেলে নিজেদেরই মুখে ঝামা ঘসা যাবে। প্রচারের সব বেলুন চুপসে যাবে। যেখানে প্রধানমন্ত্রী কোন স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেছেন, এই তথ্যটুকু আজও প্রধানমন্ত্রী দিয়ে উঠতে পারলেন না, সেখানে সাধারণ নাগরিকদের কাছে এত এত কাগজ চাওয়ার কী মানে আছে?
ত্রুটিমুক্ত ভোটার তালিকা তৈরি হোক, এ নিয়ে কোনও মহলেই দ্বিমত থাকার কথা নয়। কিন্তু তা করতে গিয়ে যে পন্থা অবলম্বন করা হচ্ছে, তা বেশ বিভ্রান্তিকর। এতবড় একটা কাজ আরও সময় নিয়ে, আরও প্রস্তুতি নিয়ে করা যেত। কী কী সমস্যা আসতে পারে, এলে কীভাবে তা সামাল দেওয়া যায়, সে সম্পর্কে সম্যক ধারণা ছিল বলেও মনে হয় না। তাই একটা জট ছাড়লে অন্য জট তৈরি হয়ে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের যেমন প্রস্তুতির দরকার ছিল, তেমনই সাধারণ মানুষেরও প্রস্তুতি দরকার ছিল। নির্বাচন কমিশনের যে ভূমিকা, সেখানে বিচক্ষণতা ও দূরদৃষ্টির অভাব স্পষ্ট। এই ভুল থেকে নির্বাচন কমিশন শিক্ষা নিক। এমন একটা রুটিন প্রক্রিয়া যেন আমজনতার ভোগান্তির ও আতঙ্কের কারণ না হয়ে ওঠে, সে ব্যাপারে তাঁরাও আরও সতর্ক থাকুন।
