‌নাইবা এল ট্রফি, তবু মহাকালের আঙিনায় নেইমার নামটা থেকে যাবে

অজয় নন্দী

প্রায় এক নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হত তিনটি নাম। লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, নেইমার জুনিয়র। প্রথম দুজন বয়সে খানিকটা বড়। নেইমার তুলনায় সত্যিই জুনিয়র। তিনজনই দাঁড়িয়েছিলেন ফুটবল জীবনের শেষ প্রান্তে। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, ২০২৬ বিশ্বকাপই তাঁদের শেষ বিশ্বকাপ। মেসি বা রোনাল্ডো এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানাননি। সেই জায়গায় নেইমার যেন একটু আগেই সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেললেন। ব্রাজিলের হয়ে আর খেলবেন না। বয়সে তাঁদের চেয়ে ছোট হয়েও আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ানোর পথটা তিনিই আগে দেখালেন।

ব্রাজিলকে কখনই বিশ্বকাপ দিতে পারেননি। এমনকী সেমিফাইনালেও তুলতে পারেননি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দৌড় থেমে গেছে শেষ আটে গিয়ে, কখনও আবার শেষ ষোলোয়। কিন্তু টানা দেড় দশক ব্রাজিলের মতো দেশের ভরসার একনম্বর ঠিকানা হয়ে থাকাও কম কৃতিত্বের নয়। ১৩০ ম্যাচে ৮০ গোল করে তিনি দেশের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। পেলের ৭৭ গোলের রেকর্ডও পেরিয়ে গিয়েছেন। চারটি বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ১০ নম্বর জার্সি পরেছেন—পেলের পর তিনিই দ্বিতীয় ব্রাজিলীয়, যিনি এই কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। ২০১৩ সালে কনফেডারেশনস কাপ জয় এবং ২০১৬-র রিও অলিম্পিকে ব্রাজিলকে প্রথম পুরুষ ফুটবল সোনা এনে দেওয়া তাঁর আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের উল্লেখযোগ্য সাফল্য।

তবু নেইমারের ব্রাজিল-জীবনের সঙ্গে একটি আক্ষেপ চিরকাল জড়িয়ে থাকবে। তাঁর ট্রফি ক্যাবিনেটে বিশ্বকাপের মেডেল নেই। দলগত সাফল্য না হয় নেই, এমনকী সোনার বল বা সোনার বুটও নেই। কোনওবার এই দুই মহার্ঘ্য পুরস্কারের ধারেকাছেও পৌঁছোতে পারেননি। ২০১৪ সালে দেশের মাটিতে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে চোট পেয়ে ছিটকে গিয়েছিলেন। তাঁর অনুপস্থিতিতেই জার্মানির কাছে ব্রাজিল হেরেছিল ৭–‌১। ২০১৮ ও ২০২২—দু’বারই ব্রাজিল থেমেছে কোয়ার্টার ফাইনালে। ২০২২-এ ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সময়ে গোল করেও শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল। ২০২৬-এ শেষ ষোলোয় নরওয়ের কাছে হারের মধ্য দিয়ে শেষ হল তাঁর বিশ্বকাপ–‌যাত্রা।

চোট যেন তাঁর কেরিয়ারের আর একটি সমান্তরাল গল্প। ২০১৪-র মেরুদণ্ডের চোট থেকে শুরু করে ২০১৮, ২০২২ এবং পরবর্তী সময়ের একাধিক চোট তাঁকে বারবার মাঠের বাইরে রেখেছে। অনেক সময়ই মনে হয়েছে, সম্পূর্ণ সুস্থ নেইমারকে আমরা যতটা দেখতে চেয়েছিলাম, ততটা দেখা হল না।
এটাই হয়তো তাঁর কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় ট্র‌্যাজেডি।

তবু নেইমারের গুরুত্ব শুধু পরিসংখ্যানে নয়। স্যান্টোস থেকে বার্সিলোনা, তারপর প্যারিস সাঁ জাঁ—যেখানেই খেলেছেন, তাঁর ফুটবলে ছিল নিজস্ব একটা ছাপ। ড্রিবলিং, স্কিল, গতি এবং সৃজনশীলতার মিশেলে তিনি এমন এক ধরনের ফুটবল খেলেছেন, যা একই সঙ্গে কার্যকর এবং উপভোগ্য। মেসি–‌সুয়ারেজের সঙ্গে বার্সেলোনার ‘MSN’ ত্রয়ীর অংশ হিসেবে তাঁর সময় আধুনিক ক্লাব ফুটবলের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়।

নেইমারকে নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি। মাঠে তাঁর নাটকীয়তা, ডাইভ, চোট এবং শৃঙ্খলা নিয়ে নানা সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু তাঁর প্রতিভা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ খুব কমই ছিল। তিনি এমন একজন ফুটবলার, যাঁর পায়ে বল গেলে দর্শক অপেক্ষা করতেন—এ বার কী করেন! ফুটবলের পরিসংখ্যান সব কিছুর নির্ণায়ক নয়। কিছু ফুটবলার এমন আছেন, যাঁদের আমরা মনে রাখি আনন্দ দেওয়ার জন্য। নেইমার অবশ্যই সেই তালিকায় থাকবেন। ব্রাজিলের ১০ নম্বর জার্সিতে তাঁর অধ্যায় শেষ হয়েছে। বিশ্বকাপের ট্রফি না থাকলেও, ফুটবলকে আনন্দ দেওয়ার ক্ষমতাটুকু তাঁর কেরিয়ার থেকে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।

অনেকেই তো সেমিফাইনালে তুলেছেন, ফাইনালে নিয়ে গেছেন, ট্রফিও জিতিয়েছেন। কিন্তু কালের নিয়মে হারিয়েও গেছেন। মহাকাল তাঁদের কীর্তিকে মনে রাখেনি। নেইমার অন্তত সেই তালিকায় থাকবেন না। নাইবা এল ট্রফি, নাইবা এল ব্যালন ডি’‌ওর। নাইবা এল সোনার বল বা বুট। সমকালের গণ্ডি অতিক্রম করে তিনি থেকে যাবেন। ঠিক যেমন থেকে গেছেন জিকো, সক্রেটিসের মতো কিংবদন্তিরা।

Previous post পথের বাঁক বদলে দিতে পারে বাঁকিপুর
Next post ছিল বাবার গান, হয়ে গেল কিশোর কুমারের

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *