‌সৌরভ, এই কুযুক্তি আপনাকে মানায়!‌

স্বরূপ গোস্বামী

কে কত বড় দেশপ্রেমিক, এ যেন তার প্রতিযোগিতা চলেছে। অন্য কারও সার্টিফিকেটের দরকার নেই। সবাই দরাজ গলায় নিজেই নিজেকে সার্টিফিকেট দিয়ে চলেছে। একটু ভিন্ন সুর হলেই, একটু শান্তির কথা বললেই ‘‌দেশদ্রোহী’‌তকমা এঁটে দেওয়া হচ্ছে। কী আশ্চর্য, এই প্রতিযোগিতায় নেমে গেছেন সৌরভ গাঙ্গুলিও।
সম্পূর্ণ অযাচিতভাবে তিনি বলতে শুরু করেছেন, বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলা উচিত নয়। সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করা উচিত।
মনে পড়ে যাচ্ছে, ২০০৩ এর পাকিস্তান সফরের কথা। দীর্ঘদিন পর সৌরভের নেতৃত্বে সেবার পাক সফরে গিয়েছিল ভারতীয় দল। রওনা হওয়ার আগে ভারতীয় দল গিয়েছিল প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর কাছে। খুবই তাৎপর্যপূর্ণ একটি কথা বলেছিলেন বাজপেয়ী। দিল ভি জিতকে আনা। অর্থাৎ, শুধু খেলায় জয় নয়, হৃদয় জিতে এসো।
সেবার ভারত সিরিজ জিতেছিল। পাশাপাশি হৃদয়ও জিতেছিল। কার্গিল–‌পরবর্তী ইতিহাসে দারুণ এক সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়েছিল এই সৌরভের নেতৃত্বেই। যে কাজ বাজপেয়ী–‌মুশারফরা পারেননি, সেই কাজটাই করে দেখিয়েছিলেন সৌরভ–‌ইনজামামরা। সৌরভ গাঙ্গুলি মানে, শুধু কটা টেস্টে নেতৃত্ব দিয়েছেন, কটা টেস্ট জিতিয়েছেন, এই শুকনো পরিসংখ্যান নয়। সৌরভ গাঙ্গুলি মানে আরও অনেক কিছু। সৌরভ গাঙ্গুলি মানে, প্রাদেশিকতার ঊর্ধ্বে উঠে একটা যথার্থ ভারতীয় দল গড়ে তোলা। সৌরভ গাঙ্গুলি মানে প্রতিপক্ষের সঙ্গে সমানে সমানে লড়ে যাওয়া। সৌরভ গাঙ্গুলি মানে বেটিংয়ের কালো ছায়া থেকে ভারতীয় ক্রিকেটকে মুক্ত করা। সৌরভ গাঙ্গুলি মানে জুনিয়র ক্রিকেটারদের পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করা। সৌরভ গাঙ্গুলি মানে সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে একা লড়াই করে আবার স্বমহিমায় ফিরে আসা। সৌরভ মানে সেই ‘‌হাল ছেড়ো না বন্ধু’‌র থিমসঙ।

sourav sachin
গৌরবের তালিকাটা আরও লম্বা হতেই পারে। সেই সৌরভকে এমন সস্তা জনপ্রিয়তার দিকে ছুটতে হচ্ছে!‌ সব সম্পর্ক ছিন্ন করা উচিত, এটা আর এস এস বলুক, মানা যায়। সোশাল মিডিয়া দেশপ্রেমের (‌আসলে, দ্বেষপ্রেম)‌ পাঠ নেওয়া লোকটা বলুক মানা যায়। তাই বসে সৌরভ গাঙ্গুলি!‌ ভোটের আগে সব ব্যর্থতাকে চাপা দিতে যুদ্ধের জিগির তোলা। আবহমান কাল থেকে নানা দেশে নানা শাসক তো এই পথেই হেঁটেছেন। এই খেলাটা মোবাইলে মুখ গুঁজে থাকা ওই তরুণ বা যুবক না বুঝতেই পারেন। তাই বলে সৌরভও বুঝবেন না!‌ তাঁকেও এই বিকৃত সুরে গলা মেলাতে হবে!‌
ধরা যাক, বিশ্বকাপে ভারত গ্রুপ লিগের ম্যাচে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলল না। পাকিস্তান ২ পয়েন্ট পেল। সেমিফাইনালের দিকে আরও একধাপ এগিয়ে গেল। উল্টোদিকে, এই ২ পয়েন্ট হাতছাড়া হওয়ায় ভারত সেমিফাইনালে উঠতেই পারল না। অর্থাৎ, ভারত দায়িত্ব নিয়ে পাকিস্তানকে সেমিফাইনালে তুলে দিল। এতে কার লাভ হল?‌ ক্ষতিই বা কার হল?‌ বা ধরুন, দুই দলই সেমিফাইনাল বা ফাইনালে উঠল। পরস্পরের মুখোমুখি হল। তখন কী হবে?‌ ভারত খেলবে নাকি ওয়াক ওভার দেবে?‌ যদি খেলে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে গ্রুপ লিগে খেলল না কেন?‌ আর যদি না খেলে, তাহলে ড্যাং ড্যাং করে পাকিস্তান চ্যাম্পিয়ন। হ্যাঁ, যুদ্ধের জিগির এভাবেই অনেক বিচক্ষণ মানুষকেও নির্বোধ বানিয়ে দেয়। অনেক যুক্তিনিষ্ঠ মানুষকেও যুক্তিহীন করে তোলে।

sourav3
এবার ছবি খোলার প্রসঙ্গ। সিসিআই, মোহালিতে পাক ক্রিকেটারদের ছবি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পাক জঙ্গিরা হামলা চালালো বলে, পাক ক্রিকেটারদের ছবি সরিয়ে নিতে হবে?‌ এটা কী রকম যুক্তি?‌ সেই ক্রিকেটাররা কী দোষ করলেন?‌ এই ছবি খোলা আর যাই হোক, দেশপ্রেম নয়, ক্রিকেট প্রেমও নয়। একজন জঙ্গির কার্যকলাপের জন্য যাঁরা বরেণ্য ক্রিকেটারদের ছবি সরায়, তাঁদের দেশপ্রেমী বা ক্রিকেটপ্রেমী–‌কোনওটাই হওয়ার যোগ্যতা নেই। ধরেই নিলাম, পাক সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। তাহলে ভারতজুড়ে যা যা কাণ্ড ঘটছে, তার দায় ভারত সরকারকেও নিতে হবে। তাঁরাও নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। গোটা রাজ্যজুড়ে পঞ্চায়েত ভোটে কী তাণ্ডব চলেছে, তা আপনার অজানা নয়। বিশেষ একজনের ‘‌অনুপ্রেরণা’‌ ছাড়া এমন সন্ত্রাস সম্ভব ছিল?‌ তাহলে, আর কখনও সিএবি–‌তে তাঁকে ডাকবেন না তো?‌ তাঁর সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করবেন তো?‌

ভোটের আগে যুদ্ধের জিগির তুলে যাদের লাভ হয়, তারা তুলুক। তারা সত্যিই অসহায়। এছাড়া আর কোনও অস্ত্র নেই। তাই বলে সৌরভ গাঙ্গুলিকেও সেই সুরে গলা মেলাতে হবে?‌ দেশকে এত গৌরব এনে দেওয়ার পরেও তাঁকে সস্তা দেশপ্রেমী প্রমাণের খেলায় নামতে হবে?‌ না সৌরভ, এই কুযুক্তি আপনাকে মানায় না।

Previous post ‌তার ছিঁড়ে গেছে কবে
Next post ‌বিদায়বেলায় কুমারেশকে মনে করিয়ে দিলেন মেহতাব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *