সময় এসেছে সন্তানের সামনে লেনিনকে তুলে ধরার

(মাস দেড়েক আগে। ত্রিপুরায় আঘাত নেমে এসেছিল লেনিন মূর্তির ওপর। তখন বেঙ্গল টাইমসে প্রকাশিত হয়েছিল একটি দুরন্ত লেখা। লেনিনের জন্মদিনে সেই লেখাটি আবার ফিরিয়ে আনা হল।)

 

লেনিনের ছবি দেখিয়ে সন্তানকে বলব, ‘‌ইনিও আমাদের এক পূর্বপুরুষ। যুগে যুগে ইনি স্পার্টাকাস। ইনিই বিরসা মুন্ডা। ইনিই গ্যালিলিও। ইনিই গান্ধী। এঁকে দেখে যুগে যুগে মানুষ লড়াইয়ের সাহস পায়। তাই যুগে যুগে এঁর ওপরেই আঘাত নেমে আসে’। ধন্যবাদ বিজেপি, তোমরা আমাকে উত্তরাধিকার ফিরিয়ে দিয়েছো। স্মৃতির সরণি বেয়ে লেনিন–‌মন্থন। অমৃতরস তুলে আনলেন ময়ূখ নস্কর।

ধন্যবাদ বিজেপি, অসংখ্য ধন্যবাদ। তোমরা আমাকে আমার হারিয়ে যাওয়া সম্পদ ফিরিয়ে দিয়েছো।

প্রতি মানুষেরই প্রিয় কর্তব্য তার সন্তানের হাতে পিতৃধন তুলে দেওয়া। পিতার উত্তরাধিকার সব মানুষের কাছেই গর্বের সম্পদ। রাজা তাঁর সন্তানের হাতে তুলে দেন রাজদণ্ড। বণিক তাঁর সন্তানের হাতে তুলে দেন সিন্দুকের চাবি। বজবজ জুটমিলের মজদুর আমার ঠাকুরদা, তাঁর সন্তান, আমার বাবার হাতে তুলে দিয়েছিলেন লাল পতাকা। তিনি পিতার কর্তব্য পালন করেছিলেন।

lenin2

কিন্তু আমার পিতা!‌ তিনি কি পালন করেছিলেন পিতার কর্তব্য?‌ হয়ত করেছিলেন। হয়ত আমার হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন স্নেহের উত্তরাধিকার। আমি অক্ষম, অপারগ। তাই তা গ্রহণ করতে পারিনি। অথবা, হয়ত পিতা বুঝেছিলেন, আমি অনিচ্ছুক। তাই সেই অমূল্য ধন আমাকে দেননি।

অমূল্য ধন?‌ কীসের অমূল্য ধন?‌ কী কাজে লাগে তা আমার?‌ আমি তো ঠাকুরদার মতো চটকলের শ্রমিক নই। আমার মুখ থেকে তো আমার বাবার মতো সারাদিন না খেয়ে থাকার দুর্গন্ধ ছড়ায় না। আমি তো পৃথিবীর সবার সঙ্গে অন্ন ভাগ করে নেওয়ার স্বপ্ন দেখি না। তাই লাল পতাকা ঢুকে যাক বন্ধ তোরঙ্গে। লেনিনের ছবি পড়ে থাক চিলেকোঠার ঘুপচি কোণে।

লেনিনের ছবি। লেনিনেনর ছবি। যে ছবি বহু বছর শোভা পেয়েছে আমাদের ঘরের দেওয়ালে। এখন আর পায় না। কারণ, সেই ছবিকে আর কেউ শোভা বলে মনে করে না। এই তো ২০১৭ তে বিপ্লবের শতবর্ষ গেল। কটা কাগজে লেনিনের ছবি বেরোলো?‌ কটা চ্যানেলে?‌

লেনিনের ছবি হারিয়েই যেত। লেনিন হারিয়েই যেত।

কিন্তু বিজেপি–‌কে ধন্যবাদ। অসংখ্য ধন্যবাদ। তাদের জন্যই লেনিনের ছবি আবার কাগজে কাগজে ফিরে এল।

আমি সেই ছবি দেখলাম। বোধ হয় জীবনে কখনও এত নিবিঢ়ভাবে দেখিনি। দেখালম, আর কোথায় যেন দপ করে কী একটা জ্বলে উঠল। দেখলাম আর হাট হয়ে খুলে গেল স্মৃতিপ্রকোষ্ঠের বন্ধ কপাট। কানে ভেসে এল পিতৃকণ্ঠের ইনকিলাব ধ্বনি। নাকে এল ঠাকুরদার ঘর্মাক্ত শরীরের ঘ্রান। চোখের সামনে স্বপ্নের মতো ভেসে উঠল ঠাকুমার রুক্ষ চুল। আমার অক্ষরজ্ঞানহীনা ঠাকুমা। ফেরারি কমরেডদের ঢেঁকিশালের গোপন আস্তানায় লুকিয়ে রাখা আমার ঠাকুমা।

lenin3

আমার মনে পড়ল চিলেকোঠার কোনও জায়গায় নিতান্ত অবহেলায় পড়ে আছে লেনিনের ছবি। আমার মনে পড়ল আমার সন্তানের সঙ্গে অনেকের পরিচয় করিয়েছি। কিন্তু আজও লেনিনের পরিচয় করানো হয়নি।

পিতা, আমার কমিউনিস্ট পিতা, তোমার উত্তরাধিকার আমি পাইনি। আমার সন্তানের যেন সেই দুর্ভাগ্য না হয়। সংগ্রামের উত্তরাধিকার যেন সে পায়। সময় এসেছে পিতা। ধুলোর আস্তরণ ঝেড়ে লেনিনের ছবি বের করে আনার। তাকে সন্তানের সামনে তুলে ধরার। সন্তান যদি প্রশ্ন করে ‘‌ইনি কে বাবা’‌?‌

‌তাকে জানাব, ‘‌ইনিও আমাদের এক পূর্বপুরুষ। যুগে যুগে ইনি স্পার্টাকাস। ইনিই বিরসা মুন্ডা। ইনিই গ্যালিলিও। ইনিই গান্ধী। এঁকে দেখে যুগে যুগে মানুষ লড়াইয়ের সাহস পায়। তাই যুগে যুগে এঁর ওপরেই আঘাত নেমে আসে’‌।

ধন্যবাদ বিজেপি, অসংখ্য ধন্যবাদ। তোমরা আমাকে আমার উত্তরাধিকার ফিরিয়ে দিয়েছো। তোমরা মনে করিয়ে দিয়েছো, আমি লেনিনের বাচ্চা।

হ্যাঁ, আমরা সবাই লেনিনের বাচ্চা।।

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.