‌চায়ের দোকানের ঠেক আর আদালত এক নয়

সরল বিশ্বাস

যেটা হওয়ার ছিল, সেটাই হল। সুপ্রিম কোর্ট যে পঞ্চায়েত নির্বাচন সংক্রান্ত অভিযোগকে বিশেষ গুরুত্ব দেবে না, তা জানাই ছিল। ঠিক সেটাই হল।

কয়েকদিন ধরেই বিজেপি সভাপতি হুঙ্কার দিয়ে চলেছিলেন, ‘‌আমরা সুপ্রিম কোর্টে যাব।’‌ ভেবেছিলেন, সুপ্রিম কোর্টে যাবেন, আর অমনি কোর্ট তাঁদের পক্ষে রায় দিয়ে দেবে। তাঁদের যা যা দাবি, কোর্ট বোধ হয় সিলমোহর দিয়ে দেবে।

আইনজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই। আইনের ছাত্র হওয়ারও দরকার নেই। একটু সাধারণ জ্ঞান ও দূরদর্শিতা থাকলেই বোঝা যেত, এই মামলায় বিশেষ কিছুই হওয়ার নয়। নির্বাচন কমিশনকে টপকে, হাইকোর্টকে টপকে রাজ্যের একটা স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরে সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে গেলে, এটাই হওয়ার ছিল। যাঁরা আইনি পরামর্শ দেন, তাঁদের আইনি–‌বোধ নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। এই সাধারণ ব্যাপারগুলো তাঁরা বোঝেননি!‌

supreme court5

অনেক রাজনৈতিক দল আদালতে সুবিচার পায় না। মামলার মেরিট থাকা সত্ত্বেও পায় না। তার একটা বড় কারণ হল, মামলায় জেতার চেয়েও এরা বেশি করে প্রচারের দিকে ছোটেন। প্রচারের সস্তা মোহটা ছাড়তে পারেন না। উকিল আদালতে কী যুক্তি দেবে, নেতারা আগেই তা সাংবাদিক সম্মেলনে বলে ফেলেন। আগাম ক্রেডিড নিতেই হবে।

আরও একটা বড় কারণ, এঁরা চান ফোকটে মামলা লড়তে। পার্টির লোক আছে। বিনে পয়সায় বা কম পয়সায় লড়ে দেবে। বিনে পয়সায় মামলা লড়াতে গেলে, যেমন উকিল জোটার, তেমনিই জোটে। তাঁরাও ভয়ঙ্কর প্রচার–‌হ্যাংলা। কতক্ষণে টিভির পর্দায় ছুটব, এসব ভাবতে গিয়ে মামলার প্রস্তুতিও নেওয়া হয় না। তাছাড়া, বিনে পয়সায় লড়লে তাঁদের প্রস্তুতি নিতে বয়েই গেছে।

চায়ের দোকানে লোকে যেমন তর্ক করে, টিভির পর্দায় যেমন যুক্তি–‌পরিসংখ্যান হীন চিৎকার করে, ভেবে নিয়েছেন আদালতেও বোধ হয় তেমনি চিৎকার করলেই হয়ে যাবে। মামলাকে দাঁড় করানোর জন্য যা যা তথ্য দরকার, তার অধিকাংশই ছিল না। যেখানে রাজ্যের আইনজীবী জেলাভিত্তিক মনোনয়নের পরিসংখ্যান তুলে বুঝিয়ে দিলেন, কোন কোন জেলায় বিরোধীরা বেশি মনোনয়ন জমা দিয়েছেন, সেখানে বিজেপির আইনজীবীর পক্ষে অনেক বেশি তথ্য ও যুক্তি থাকলেও তা তুলে ধরতে পারলেন না। চূড়ান্ত নাস্তানাবুদ হওয়ার পরেও বেরিয়ে এসেই টিভিতে বাইট দেওয়ার জন্য যেন ছটপট করছিলেন। তারপরেও তাঁকে নির্লজ্জের মতো বোঝাতেই হবে, রায় তাঁদের পক্ষেই গেছে।

বাহুবলের অনেক হুঙ্কার শোনা গিয়েছিল। দেখা গেল, আসল সময় সব চুপসে গেল। এমনকী আইনি লড়াইয়ে যে ন্যূনতম বুদ্ধি বা দূরদর্শিতা লাগে, সেটুকুও নেই। কী আর করা যাবে!‌ আপাতত শাসকপক্ষের সুবিধাই হয়ে গেল। এত সন্ত্রাসের পরেও গলা বাজিয়ে তারা বলতে পারছে, আদালতের রায় আমাদের পক্ষে। এমনিতেই গুন্ডামির পক্ষে যুক্তি সাজানোর জন্য ভাঁড়ের অভাব ছিল না। তার ওপর যোগ হয়ে গেল সর্বোচ্চ আদালতের সিলমোহর।

এমন বিরোধী থাকলে শাসকের সব সময়ই সুবিধা। শাসকরা বোধ হয় এমন বিরোধীই চান।

Previous post ভোট কর্মীর ডায়েরি
Next post ভোটের আগেই হয়ত সরে দাঁড়াতে হবে কমিশনারকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *