সরল বিশ্বাস
একদিকে তৃণমূল শিবিরে নাম লেখালেন এক বাম বিধায়ক। সেইদিনই ঘটল আরও একটি কাণ্ড। উত্তর দিনাজপুরের চাকুলিয়ায় হয়ে গেল তৃণমূলের পঞ্চায়েতিরাজ সম্মেলন। সেখানকার বিধায়ক ফরওয়ার্ড ব্লকের আলি ইমরান (ভিক্টর)। তাঁকে রুখতে নামানো হল শুভেন্দু অধিকারী, গৌতম দেব, গোলাম রব্বানিদের মতো মন্ত্রীকে। জেলা পরিষদের সভাধিপতি থেকে তৃণমূলের জেলা সভাপতি, জেলার তিন বিধায়ক।
কয়েক মাস ধরেই ইসলামপুর বাইপাসকে নিয়ে নাজেহাল শাসদ দল। আরও ভাল করে বলতে গেলে, চাকুলিয়ার এই তরুণ বিধায়ককে নিয়েই নাজেহাল। সিঙ্গুর, নন্দীগ্রামে জমি আন্দোলন করা তৃণমূল কার্যত গায়ের জোরে জমি নিতে চাইছে ইসলামপুরে। ভিক্টরের দাবি, আমরাও উন্নয়ন চাই। রাস্তা হোক। সবাই জমি দিতে তৈরি। এর জন্য চাকরিও চাইছি না। অবাস্তব দাবিও করছি না। শুধু বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী জমির মূল্য দেওয়া হোক।

এই সামান্য দাবিটুকুও মেনে নিতে পারছে না শাসক দল। কারণ, আগে হুঙ্কার দেওয়া হয়ে গেছে। কুড়ি বছর আগের দামেই জমি নেব। সেখান থেকে পিছিয়ে এলে মুশকিল। জেদ বাড়তে থাকল। জুলুমও বাড়তে থাকল। আন্দোলন ভাঙার কাজে পুলিসকে নগ্নভাবে ব্যবহার করা হল। অনেক হুমকি দেওয়া হল। পদযাত্রা থেকে সভা, কোনওকিছুই বাদ রাখলেন না মন্ত্রীরা। কিন্তু জট কিছুতেই খুলছে না। চাষিদের দাবিকে মেনে নেওয়ার মানে হল এক বাচ্চা ছেলের কাছে হেরে যাওয়া।
শুভেন্দু অধিকারী আগেও সভা করে এসেছেন। উস্কানিমূলক ভাষণ দিয়ে এসেছেন। ফের গেলেন চাকুলিয়ায়। শুভেন্দু থেকে গৌতম দেব, নিজেদের নামিয়ে আনলেন পাড়ার নেতার পর্যায়ে। ভাবতেও অবাক লাগে, একজন তরুণ বিধায়ককে আক্রমণ শানাতে এত রথী মহারথীকে হাজির করতে হয়! এত হুমকির বন্যা ছোটাতে হয়! অনুপ্রেরণা বড়ই সাঙ্ঘাতিক জিনিস।
এই ভিক্টরকেই দলে টানার কম চেষ্টা হয়নি। নানা প্রলোভন হাসিমুখে জয় করেছেন। মানুষের পাশেই থেকেছেন। তাঁকে দুর্বল করার, তাঁর দলে ভাঙন ধরানোর লাগাতার চেষ্টা। একাই লড়াই করে যাচ্ছেন। হার মানেননি। নতিস্বীকারও করেননি। বিধানসভাতেও বামেদের মধ্যে সবচেয়ে সোচ্চার এই তরুণ বিধায়ক। তিনি বলতে উঠলেই তাঁকে বাধা দেওয়ার কী মরিয়া চেষ্টা! একটা বাচ্চা ছেলেকে এত ভয়!
৩৫ বছরের এই তরুণ অন্তত প্রতিদিন বুঝিয়ে যাচ্ছেন, দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করলে মানুষকে পাশে পাওয়া যায়। বুঝিয়ে দিচ্ছেন, হাজার চেষ্টা করেও, হাজার প্রলোভন দেখিয়েও সবাইকে কেনা যায় না। তৃণমূল যখন এত খারাপ কাজের এত ‘অনুপ্রেরণা’ পায়, তখন বামেরা ভিক্টরকে দেখে একটু অনুপ্রাণিত হতে পারেন না! ধীরেন্দ্রনাথ লায়েকরা যেমন বিকিয়ে যাওয়ার জন্য বসে থাকেন। ঠিক তেমনি ভিক্টরের মতো লড়াকু মানুষেরাও থাকেন যাঁরা নানা প্রতিকূলতার মাঝেও লড়াই চালিয়ে যান। তাই তাঁকে থামাতে শাসককে নিচে নামতে হয়।
ইতিহাসের পাতায় ভিক্টরদের লড়াইয়ের কথাই বোধ হয় লেখা থাকে।


