শেখর বাগচী
মাঝে মাঝেই সমস্যাটা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আমরা ধামাচাপা দিয়ে তখনকার মতো সামাল দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু সমাধানের চেষ্টা করি না। তাই সমস্যাটা কিছুদিন কার্পেটের তলায় থাকে। আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
তেমনই একটা সমস্যার নাম গোর্খাল্যান্ড। আমরা গায়ের জোরে দাবি করি, পাহাড় আমাদের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কিন্তু পাহাড়ের মানুষ কি আমাদের সত্যিই বিশ্বাস করে? আমাদের কি আপনজন বলে মনে করে? মুখ্যমন্ত্রী যতবারই পাহাড়ে যান, কিন্তু পাহাড়ের মানুষের মনে কী আছে, তা পুরনির্বাচনেই স্পষ্ট হয়ে গেছে। এখানে রাজনীতির আলোচনা টানতে চাইছি না। গত কয়েক বছরে ভারতে অনেক ছোট ছোট রাজ্য হয়েছে। শুধু শুধু নিশ্চয় কেন্দ্র রাজ্য হাতে তুলে দেয়নি। আলাদা রাজ্যের দাবিতে আন্দোলন করতে হয়েছে। দিনের পর দিন সেই আন্দোলন চলেছে। সেই আন্দোলন যে খুব শান্তিপ্রিয় হয়েছে, এমনও নয়। অনেক ক্ষেত্রেই হিংসার আশ্রয় নিতে হয়েছে। সরকার কার্যত তাকেই মান্যতা দিয়েছে। দেখা গেছে, যাঁরা রাজ্যের দাবিতে লড়াই করেছেন, পরে তাঁরাই সেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। ঝাড়খণ্ড নতুন রাজ্য হলে সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন শিবু সোরেন। তেলেঙ্গানা আলাদা রাজ্য হলে সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রশেখর। এভাবেই উত্তরাখণ্ড, ছত্তিশগড় একের পর এক রাজ্য হয়েছে। তারও আগে স্বীকৃতি পেয়েছে ঝাড়খণ্ড, গোয়া।
এইসব দাবির থেকে অনেক পুরনো দাবি হল গোর্খাল্যান্ড। স্বাধীনতার পর থেকেই এই দাবি উঠে আসছে। এমনকী পঞ্চাশ বছরেরও আগে সংসদে আনন্দ পাঠক এই দাবি তুলেছিলেন। বিধানসভায় রতনলাল ব্রাহ্মণ এই দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন। আটের দশকে উত্তাল হয়ে উঠেছিল পাহাড়। আলাদা গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে সুবাস ঘিসিংদের আন্দোলন সারা দেশের শিরোনামে উঠে এসেছিল। বিমল গুরুংরা হালে এই দাবি করছেন, এমন নয়। দাবিটা অনেক পুরনো। সেই পুরনো দাবিতে মান্যতা না দিয়ে একের পর এক রাজ্য হয়ে গেল। সেখানে পাহাড়ের মানুষের একটা ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক। ভাষা, সংস্কৃতি একেবারেই আলাদা। বাংলার জনজীবনের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক কতটুকু? তাঁরা মোহনবাগান–ইস্টবেঙ্গলের খোঁজ রাখেন? পুরুলিয়া বা মেদিনীপুরে কী হল, তা নিয়ে তাঁদের মাথাব্যথা আছে? তাঁরা বাংলা সিনেমা–নাটক দেখেন? তাঁরা বাংলা সাহিত্য পড়েন? তাহলে বাংলার সঙ্গে তাঁদের আত্মিক যোগটা কোথায়? জোর করে এই আত্মিক যোগ তৈরি করা যায়? এত কিছু যখন বৈপরীত্ব, তখন জোর করে ধরে রাখার কোনও যুক্তি আছে কি?

হ্যাঁ, দার্জিলিং আমরা ভালবাসি। গরম হলেই বাঙালির মন ছুটে চলে দার্জিলিংয়ে। সে তো আমরা সিকিমেও যাই। গ্যাংটক, পেলিং, নামচি, রাবাংলা, নাথুলা, ছাঙ্গু যাই। পর্যটক হিসেবে কোনও সমস্যা তো হয় না। যেমন গ্যাংটক যাচ্ছি, তেমনই না হয় দার্জিলিং যাব। যদি রাজ্যের রাজস্বের কথাই ভাবেন, তাহলেও লাভ। পাহাড়ের পেছনে আমাদের যত খরচ, ততটা কি রাজস্ব উঠে আসে? তাহলে জোর করে ধরে রেখে লাভটাই বা কী? হ্যাঁ, আয়তনে ছোট। হয়ত আলাদা রাজ্য হওয়ার উপযোগী নয়। সে তো কালিম্পঙও একটাই বিধানসভা। সেই একটা বিধানসভা নিয়ে আলাদা জেলা হয়ে গেল। কই, তখন তো প্রশ্ন উঠল না! সুতরাং, আয়তনটা খুব একটা বড় ফ্যাক্টর নয়, আসল কথা হল রাজনৈতিক সদিচ্ছা আছে কিনা। যে যখন বিরোধী থেকেছে, সেই আলাদা রাজ্যের উস্কানিতে সায় দিয়েছে। পাশে থাকার কথা দিয়েছে। বামেরা একসময় দাবি তুলেছিল। বিরোধী থাকার সময় তৃণমূলও গুরুংয়ের সঙ্গে বারবার মিটিং করেছে, জিটিএ তে গোর্খাল্যান্ড শব্দটা রেখেছে। বিজেপি তো আলাদা রাজ্যের আশ্বাস দিয়েই পরপর দুবার সেখান থেকে নিজেদের এম পি–কে জিতিয়ে আনল। অতীতে কংগ্রেসও তাই করেছে। একবার ভেবে দেখুন তো, সমতলের এই দলগুলোকে পাহাড়ের মানুষ কেন বিশ্বাস করবে? হ্যাঁ, তার থেকে ওদের আলাদা রাজ্য অনেক ভাল। অর্জুন মুন্ডা বা বাবুলাল মারান্ডি যদি মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন, তাহলে বিমল গুরুংও পারেন। তাই ‘অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ’ এই আদিখ্যেতা ছেড়ে শতাধিক বছরের পুরনো দাবিতে এবার সায় দিন। ওদের আলাদা রাজ্যের স্বীকৃতি দেওয়া হোক।
(এটি ওপেন ফোরামের লেখা। মতামত লেখকের ব্যক্তিগত। তবে, পাহাড়ের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে সুস্থ বিতর্ক হতেই পারে। আপনিও আপনার মতামত জানাতে পারেন। লেখা পাঠানোর ঠিকানা: bengaltimes.in@gmail.com)

