সৌভিক চক্রবর্তী
ছবির এই মানুষটিকে আমি চিনি,আবার, চিনি নাও হয়ত। আমার, আমাদের চেনা দুখি। মাথায় পুলিসের লাঠির ঘা থেকে রক্তের বন্যা, তবুও দুখির অদম্য প্রতিবাদী কণ্ঠ থেকে স্লোগান উঠছে ইনকিলাব জিন্দাবাদ। একে বোধহয় সারা বিশ্ব চেনে !!
ঘটনাচক্রে রবিবার ২১শে মে তাঁর সঙ্গে অনেকটা সময়ও কাটাই। উনি মধ্যমগ্রামে আমাদের পাড়াতেই থাকেন। এর আগেও বহুবার আক্রান্ত হয়েছেন। স্কুল পরিচালনা সমিতির ভোটে জেতার পর ব্যাপক মারধোর সন্ত্রাস আর বোমাবাজির মুখে পড়ে ঘরছাড়া ছিলেন বহুদিন।
দুখির আরেক পরিচয় উনি ইলেক্ট্রিশিয়ান। আলো ও ধ্বনির কাজ জানেন। আগে অজিত পান্ডের সংগে অনেক অনুষ্ঠানে কাজ করেছেন। এখন ইলেকট্রিকের কাজ করেন। বাড়ি বাড়ি। একদম নিখাদ শ্রমজীবী শ্রেণীর প্রতিনিধি। আমার মত মেকি সুবিধাভোগী শ্রেণীর অংশ নন।

দুখির সংগে আমার ও আমাদের আলাপও ওই কাজের সূত্রেই। আর রবিবারও সে জন্যই আমাদের দেখা ও নানান গল্প। কি আশ্চর্য এক সমাপতন যার জন্য এত কথার অবতারণা। রবিবার কথা হচ্ছিল মিছিল নিয়ে। মধ্যমগ্রামের কোথা থেকে বাস ছাড়বে, কটা বাস বলা হয়েছে, রবিবার বিকেলের মিছিল এসব। আমি দুখিকে মনে করিয়ে দি মার খাবার কথা।
— “কি বলছেন দাদা, কম্যুনিস্ট পার্টি করবো আর পুলিসের মার খাবো না?”
–“আরে মার খাবার অভ্যেস চলে গেছে তো?”
—” কোথায়? যেটুকু গেছিলো এই ৬ বছরে আবার ফেরত এসেছে দাদা।” শেষের উত্তরটা একগাল হেসে।
সন্ধেবেলা বলে গেল, যদি আস্ত রাখে তবে মঙ্গলবার থেকেই কাজ করব। কি বলবো, কাল যখন সন্ধেবেলা দুখির ফোনটা এলো, বুকটা ধক করে উঠেছিল।
–“দাদা, খুব মেরেছে গো। মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। হালিম সাহেবের ছেলের নার্সিংহোম এ স্টিচ করিয়ে দিল পার্টি থেকে। অলোকদা বাড়িতে দিয়ে গেলেন। আমি তো কাল থেকে কাজ করতে পারবো না দাদা।”
রাতে আরেকবার খোজ নিই নিয়মমাফিক। খুব কষ্ট হচ্ছিল ওর। খানিকক্ষণ কথা বলি দুজন। তখন থেকে মনটা ভারি হয়ে আছে। আমার মত সুবিধাবাদীরা সব মিছিলে যায় না। তাদের চাকরি বাঁচাবার অজুহাত থাকে, মানডে মর্নিং কল থাকে, রিভিউ মিটিং থাকে। দুখিদের থাকে না। এই কদিনের কাজ যাওয়া, রোজগার বন্ধ থাকা এসব যেন কিছু নয়। দুখি হয়ত ম্যানিফেস্টো পড়েননি, কিন্তু ওনারাই আমার কাছে জ্বলন্ত ম্যানিফেস্টো।
পরশু দুখির সাথে দেখা হচ্ছে। লাল সেলাম জানাবো। যদিওবা আমার এখন আত্মমোক্ষন এর সময়। দুখিকে কমরেড বলে ডাকার যোগ্যতা কি আদৌ আমার আছে অথবা অপর প্রান্তে আমার মত নিতান্ত গা বাঁচানো বামপন্থীকে দুখি বা দুখিরা কমরেড বলে স্বীকার করবেন কিনা সেটাও ভাবার।
তবুও লাল সেলাম কমরেড। কলকাতায় থাকলে এবার থেকে আর মিছিলে না যাবার ছুতো খোঁজাটাকে তুমি অসম্ভব করে দিলে। এবার শুধু কাজের জন্য নয়, মিছিলেও দেখা হবে।”
(হোয়াটসঅ্যাপ থেকে সংগৃহীত)
