রেখেছো বাঙালি করে, মানুষ করোনি

জানুয়ারি বলতে বাঙালি বুঝল বিবেকানন্দর জন্মদিন আর নেতাজির জন্মদিন। আরও এক মহিয়সী নারীর জন্মদিন এই জানুয়ারি মাসেই। তিনি মমতা ব্যানার্জি। অথচ, বাঙালি সে কথা জানেই না! ইতিহাস বিস্মৃত, এমনকি বর্তমান বিস্মৃত এই জাতিকে ধিক্কার দিলেন রবি কর।।

জানুয়ারি মাসের অর্ধেক পেরিয়ে গেল। বিবেকানন্দর জন্মদিন পেরিয়ে গেল। নেতাজির জন্মদিন আসন্ন। তবুও তোমার কালনিদ্রা ভাঙল না। তবুও তুমি জানুয়ারি মাসের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দিনটিকে স্মরণ করলে না। ছিঃ! বাঙালি ছিঃ!
বছরের পর বছর এমনটাই চলছে। প্রতি বছর ৫ জানুয়ারি আসছে আর চলে যাচ্ছে। আর বাঙালি পয়লা জানুয়ারি, ১২ জানুয়ারি, ২৩ জানুয়ারি, ২৬ জানুয়ারি এই সব বস্তাপচা দিনগুলো নিয়েই মাতামাতি করছে। বাঙালি তোমার মোহনিদ্রা আর কবে ভাঙবে।
আসলে বাঙালি ইতিহাস বিস্মৃত জাতি। শুধু তাই নয় বাঙালি বর্তমান বিস্মৃত জাতি। বর্তমানকে বোঝে না বলেই বাঙালি বুঝতে পারে না, আজকের কোন ঘটনা ভবিষ্যতে ঐতিহাসিক মর্যাদা পাবে। বাঙালি যদি ভবিষ্যৎ দেখতে পেত, তাহলে বুঝত, একদিন ৫ জানুয়ারি ১২ জানুয়ারি, ২৩ জানুয়ারি-র সমান মর্যাদা পাবে।

mamata painting
৫ জানুয়ারির গুরুত্ব বুঝতে হলে আপনাদের বুঝতে হবে বছরের সেরা মাস কোনটি। বাঙ্গালির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে জানুয়ারি মাসে নেতাজি এবং স্বামিজির জন্মদিন। মে মাসে রবীন্দ্রনাথ এবং সত্যজিতের জন্মদিন। ম্যাচটা ২-২ গোলে ড্র চলছিল। জানুয়ারি-ভক্তরা নিউ ইয়ার আর প্রজাতন্ত্র দিবস নিয়ে গলা ফাটালে মে-ভক্তরা পাল্টা বলছিল, রবীন্দ্রনাথ এবং সত্যজিৎ দুজনেই বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। স্বামিজি বা নেতাজি তা নন।
হায় বাঙালি তোমরা যদি ৫ জানুয়ারির গুরুত্ব জানতে তাহলে এত বিতর্কের প্রয়োজনই হত না। একবাক্যে জানুয়ারি বিজয়ী ঘোষিত হত। কারণ এই দিনে জন্মগ্রহণ করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জানুয়ারি মাসের তিন শ্রেষ্ঠ সন্তান স্বামিজি, নেতাজি, ব্যানার-জি। নামের শেষে জি থাকলে সম্মান বাড়ে তাই আমরা এখন থেকে তাঁকে ব্যানার-জি বলেই উল্লেখ করব। আমাদের বিচারে, তিনি নেতাজি, স্বামিজি, কবিগুরু, সিনেমাগুরু এঁদের সমকক্ষই শুধু নন, নিরপেক্ষ ভাবে দেখলে এঁদের সম্মিলিত প্রতিভার সমান প্রতিভাবান।
ভাবছেন প্রশংসার ছলে ব্যঙ্গ করছি? না মশাই না। একবার ভেবে দেখুন। স্বামিজি বলেছিলেন, সব ভারতবাসি আমার ভাই। ব্যানার-জিও সকলকে নিজের ভাই বলে মনে করেন। সিদ্দিকুল্লা, আরাবুল, রেজ্জাক সবাই তাঁর ভাই। তিনি সকলের দিদি। স্বামিজি ছিলেন পরিব্রাজক। ব্যানার-জিও টইটই করে বাংলা পরিভ্রমণ করেন। আজ পুরুলিয়া, কাল দার্জিলিং, পরশু দিঘা, তরশু ডুয়ার্স। এমনকি ভুটানেও। যে যে জায়গা সুন্দর সেখানেই প্রশাসনিক বৈঠক হচ্ছে।
আবার ভাবুন, দেশপ্রেমেও তিনি নেতাজির সঙ্গে তুলনীয়। নেতাজি যেমন কংগ্রেস ভেঙে নতুন দল গড়েছিলেন, ব্যানার-জিও তাই করেছেন। নেতাজি যেমন অত্যাচারী অধ্যাপককে ধোলাই দিয়েছিলেন। ব্যানার-জির ভাইরাও মাঝে মাঝে তাই দেয়। নেতাজি বলেছিলেন, দিল্লি চলো। ব্যানার-জি বলেছেন, দিল্লি চলো, ভারত গড়ো। অর্থাৎ নেতাজির থেকে ব্যানার-জির উদ্দেশ্য আরও মহৎ।
এবার দেখুন রবীন্দ্রনাথ। তিনি একটা গীতাঞ্জলি লিখেই সাত হাত দাড়ি গজিয়ে ফেললেন। লিখতেন একটা কথাঞ্জলি তো বুঝতাম। রবীন্দ্রনাথ অনেক কিছুর নামকরণ করতেন। তাঁর না কি ভাষার ওপর দারুন দখল। কিন্তু নামকরণে ব্যানার-জিও কম যান না। রাজ্য ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ম্যাসকটের নাম রেখেছেন ‘আবাং।‘ মানে নাকি ‘আমার বাংলা।’ রবীন্দ্রনাথের ছিল ভাষার ওপর এমন দখল?
এবার সত্যজিৎ রায়। কি যে সব কচু-ঘেঁচু সিনেমা বানাতেন! জীবনে যিনি একটাও মেগা সিরিয়াল বানালেন না, তিনি আবার পরিচালক! ব্যানার-জি নিজে পরিচালক নন, কিন্তু বলেছেন, সিরিয়াল দেখলে মন ভাল হয়। সত্যজিতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল সৌমিত্র, উৎপলের। ব্যানার-জির সঙ্গে সোহম-হিরণের। এর ওপর আছে ছবি আঁকা। ব্যানার-জির আঁকা দেখলে সত্যজিৎ, রবীন্দ্রনাথ দুজনেই ঘরে ঢুকে যেতেন।

mamata15
তবুও, এতকিছুর পরেও, এই ক্ষণজন্মা প্রতিভাকে যোগ্য মর্যাদা দিচ্ছি না। তাঁর জন্মদিনে কোন উৎসব নেই। স্কুল অফিসে ছুটি নেই। অথচ তাঁর তরফে চেষ্টার কোন অন্ত নেই। তিনি মোমের মিউজিয়ামে নিজের মূর্তি বসিয়েছেন, নিজের হাতে বিশ্ব বাংলার লোগো বানিয়েছেন, কন্যাশ্রীর লোগো তাঁর আঁকা, তিনি দুর্গা পূজার থিম সঙ লিখছেন, শহরের রং ঠিক করছেন। সরকারি বিজ্ঞাপন জানাচ্ছে রাজ্যের সব কাজ তাঁরই অনুপ্রেরণায় হয়, বিজ্ঞাপনে বিজ্ঞাপনে তাঁর পাতা জোড়া নাম, রাজ্য জুড়ে তাঁর কোটি কোটি ছবি, কোটি কোটি ব্যানার। অন্য কারও নামে এমন প্রচার আছে?
তাই মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আমাদের দাবি অবিলম্বে মূর্তি, রাস্তা, সদন এইসব বানিয়ে নিজের নামের প্রতি সুবিচার করুন। মমতা সরণি, মমতা সদন, মমতা সেতু- আহা, কেমন সুন্দর শুনতে। লোকে যদি নিজে নিজে নামকরণ করে দিত, তাহলে সমস্যা থাকত না। কিন্তু যদি আপনার ডাক শুনে কেউ না আসে, তাহলে আপনি একাই চলুন।

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.