কলকাতার ফুটবলে মজিদ বাসকারের উপস্থিতি বড়ই ক্ষণস্থায়ী। এসেছিলেন শিল্পের ছটা নিয়ে। রঙিন ক্যানভাসে কোনও শিল্পী যেন তুলির আঁচড় কেটে দিচ্ছেন। কিন্তু বেহিসেবি জীবনযাপন ময়দানের মূল স্রোত থেকে তাঁকে অনেকটাই দূরে সরিয়ে দিল। হারিয়ে গেলেন অন্তরালে।
একদিকে যখন মজিদ অস্তগামী, তখনই আবির্ভাব আরেক বিদেশির। তিনি অবশ্য ইরানের নন, নাইজেরিয়ার। তিনিও ভারতে এসেছিলেন পড়াশোনা করতে। কিন্তু হয়ে গেলেন ফুটবলার। মজিদের ঘরানা আর তাঁর ঘরানার মধ্যে আকাশ–পাতাল তফাৎ। মজিদের পায়ে যেমন ধ্রুপদী শিল্প, এই ফুটবলার আবার শিল্পের তেমন ধার ধারতেন না। শুরুর দিকে অনেকটা গায়ে–গতরে ফুটবল। ড্রিবল করতে হত না, কাটাতে হত না, তিনি বল নিয়ে ছুটে এলে ডিফেন্ডাররা যেন ভয়েই সরে যেতেন। গোল করার জায়গা করে দিতেন। ট্যাকল করতে গেলে বিপক্ষের ডিফেন্ডারকেই হয়তো হাসপাতালে বেড বুকিং করতে হবে। আর পায়ে গোলার মতো শর্ত ছিলই।
ইনি চিমা ওকেরি। ব্যারেটোর আগে পর্যন্ত ভারতে খেলে যাওয়া সব থেকে কার্যকরী বিদেশি। খেলেছেন তিন প্রধানের হয়েই। এবং লম্বা সময় ধরে। খেলা ছাড়ার অনেক পরে কোচ হিসেবেও ফিরে এসেছেন। কত গোল করেছেন তার সঠিক হিসেব নিয়ে পরিসংখ্যানবিদদের মধ্যে দ্বিমত আছে। তবু একটা প্রাথমিক হিসেব দেওয়াই যায়। যতদূর জানা যায়, মহমেডানের হয়ে তাঁর গোলসংখ্যা —, ইস্টবেঙ্গলের হয়ে —, মোহনবাগানের হয়ে —। অন্তত চার মরশুম কলকাতা লিগে তিনি সর্বাধিক গোলদাতা। আরও একবার চাইলেই হতে পারতেন। কেন চাননি, সে অন্য গল্প। সে অন্য এক সিংহ হৃদয় চিমা।
দলবদলের আসরে তাঁকে ঘিরেও কম টানাটানি হয়নি। কোথাও একটা ইতিহাসের ফুটনোটে বেশ উজ্জ্বলভাবেই থেকে গেছেন। কারণ, মোহনবাগানের শতবর্ষের ইতিহাসে তিনিই প্রথম বিদেশি। তবে যাত্রা শুরু অবশ্য মহমেডানে। সময়টা ১৯৮৫। নাইজেরিয়া থেকে পড়তে আসা এই তরুণকে সই করালো ময়দানের তৃতীয় শক্তি মহমেডান স্পোর্টিং। প্রথমবার তাঁকে সই করাতে তেমন কিছুই বেগ পেতে হয়নি। কারণ, তাঁকে ঘিরে কোনও টানাটানি ছিল না। মোহনবাগানে তখনও বিদেশি খেলোয়াড় নেওয়ার রেওয়াজ ছিল না। ফলে তাঁর দিকে তাকানোর প্রশ্নই ছিল না। ইস্টবেঙ্গল মজিদ, জামশিদদের নিলেও সেই মুহূর্তে এই নাইজেরিয়ানের প্রতি আকৃষ্ট হয়নি। হওয়ার কথাও নয়।
কিন্তু মহমেডানের হয়ে বেশ কিছু চমৎকার গোল করলেন এই চিমা। বলা যায়, বিপক্ষের রক্ষণকে মাটি ধরিয়ে দিলেন। মরশুমের মাঝ পথেই নজর পড়ে গেল ইস্টবেঙ্গলের। পল্টু দাস অগ্রিম ১০ হাজার টাকা ধরিয়েও দিলেন। ততদিনে চিমাও বুঝে গেছেন, মহমেডানে পড়ে থাকলে হবে না। প্রতিষ্ঠা পেতে গেলে ইস্টবেঙ্গলে আসতে হবে। ওদিকে, সাদা–কালো কর্তারা বুঝে গেছেন, তাঁদের এই বিদেশিকে ইস্টবেঙ্গলের মনে ধরেছে। অতএব ছেড়ে রাখা চলবে না। দলবদলের সময় আসতেই পাহারা আরও বেড়ে গেল। আর মীর মহম্মদ ওমরদের পাহারা ঠিক কেমন, চিমা হাড়ে হাড়ে টের পেলেন। বিপক্ষের ডিফেন্ডারদের অতিক্রম করে গোল করা সহজ। কিন্তু ওমরের ‘শান্তিপ্রিয়’ অনুচরদের ডিঙিয়ে বাইরে বেরোনো ঢের কঠিন। ফলে চিমাকে বন্দিই থেকে যেতে হল। সেই রক্ষণের জাল কেটে আর বেরোনো গেল না। ইচ্ছে থাকলেও ইস্টবেঙ্গলের সই করা হল না।
এদিকে তিনি তো অ্যাডভান্স নিয়ে বসে আছেন। খেলোয়াড় হিসেবে মারকুটে হলেও মানুষ হিসেবে মন্দ ছিলেন না। মনে হল, ইস্টবেঙ্গলের সই যখন করতে পারেননি, তখন অ্যাডভান্সটা অন্তত ফিরিয়ে দেওয়া উচিত। ইস্টবেঙ্গল কিন্তু একবারের জন্যও ওই অ্যাডভান্স ফেরত চায়নি। চিমাই উপযাচক হয়ে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বেঁকে বসলেন পল্টু দাস। তাঁর সাফ কথা, ‘একবার যখন অ্যাডভান্স দিয়েছি, তখন ফিরিয়ে নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ওটা তোমার কাছেই রেখে দাও।’
এই কথা শুনে চিমার কৃতজ্ঞতা যেন আরও বেড়ে গেল। মনে মনে ঠিক করেই নিলেন, এবার হয়নি ঠিকই। কিন্তু পরেরবার সই করলে ইস্টবেঙ্গলেই করবেন। ঠিক সেটাই হল। তবে এবার অনেক আগে থেকেই চিমা এসে উঠেছিলেন ইস্টবেঙ্গলের ডেরায়। যেন কোনওভাবেই আর মহমেডান আটকে রাখতে না পারে।
দলবদলের বাজারে পল্টু দাসের একটা বিশেষ সুনাম ছিল। তিনি খেলোয়াড়দের তুলে আনার জন্য নানা ফন্দিফিকির করতেন ঠিকই, কিন্তু টাকা–পয়সার ব্যাপারে ভয়ঙ্কর স্বচ্ছতা বজায় রাখতেন। তাঁর নিজের বিরাট অর্থ বল ছিল না। ফলে নিজের পকেট থেকে খুব বেশি খরচ করতে পারতেন না। দল চালাতে বিভিন্ন বিত্তশালী সদস্যদের দ্বারস্থ হতেন। এখানে–ওখানে, নানা সূত্র থেকে টাকা জোগাড় করতেন। কিন্তু যাঁকে যত টাকা দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিতেন, কখনই তার থেকে কম দিতেন না। ময়দানে খুব চালু একটা কথা ছিল, ‘পল্টুদা কারও সঙ্গে ১০০ টাকার চুক্তি করলে তাকে হয়তো একশো কুড়ি টাকা দিতে পারেন, কিন্তু কখনই নব্বই বা ৯৫ টাকা দেবেন না। ফলে খেলোয়াড়রাও অনেকটা নিশ্চিন্ত থাকতেন পল্টু দাসের সঙ্গে একবার কথা পাকা হয়ে গেলে বকেয়া পেতে সমস্যা হবে না।
যাইহোক, চিমা এলেন ইস্টবেঙ্গলে। একাই যেন অনেকটা ফারাক তৈরি করে দিলেন। সঙ্গে পেয়ে গেলেন কৃশানু দের মতো ফুটবলার। নিখুঁত, ঠিকানা লেখা পাস বাড়ানোয় ততদিনে বেশ নাম করে ফেলেছেন ছোটখাটো চেহারার এই ফুটবলার। ছিয়াশির বিশ্বকাপের পর থেকে তাঁর নামই হয়ে গেল ‘ভারতের মারাদোনা’। হবে নাই বা কেন! চার–পাঁচ জনকে ড্রিবল করে বাঁ পায়ের সেই দুরন্ত পাস তো আর্জেন্টিনার ওই ছোটখাটো মানুষটাকেই মনে করিয়ে দেয়। কৃশানুর শিল্প, আর চিমার সংহার। মিলেমিশে যেন কমপ্লিট প্যাকেজ। কৃশানুর যেমন নাম হয়ে গেল ভারতের মারাদোনা, তেমনই চিমারও নাম হয়ে গেল ‘ময়দানের কালো চিতা’। চিতার মতোই ক্ষিপ্র গতি, অতর্কিতে আক্রমণ। সুযোগ পেলেই ঘাড় মটকে দেওয়া। বড় ম্যাচ মানেই যেন চিমাময়। তাঁকে আটকাতে বেশ হিমশিম খেতে হচ্ছে বিপক্ষের ডিফেন্ডারদের। বাগান ডিফেন্ডার সুব্রত ভট্টাচার্যের সঙ্গে তাঁর লড়াইটা ছিল বেশ সেয়ানে–সেয়ানে। একা চিমার জন্যই বড় ম্যাচ যেন ঢলে পড়ছিল ইস্টবেঙ্গলের দিকে। লাল–হলুদ গ্যালারিতে তখন প্রবল চিৎকার চি–মা, চি–মা। তৈরি হয়ে গেল নানা রকম স্লোগান, ‘এসে গেছে চিমা, করবে তোদের কিমা।’ কেউ কেউ মজা করে বললেন, ‘নাইজেরিয়ার চিমা, মোদের জীবন বীমা।’
মোহনবাগানকে তখন প্রায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাটতে হচ্ছে। এর থেকে পরিত্রাণের উপায়? ঠিক তার আগের বছরই শতবর্ষ পেরিয়ে এসেছে মোহনবাগান। ক্লাবের ক্ষমতায় এসে গেছেন টুটু বসু অ্যান্ড কোং। একদিকে সাবেকি ক্লাবের ধনুক ভাঙ্গা পণ, হারতে হলে হারব, কিন্তু বিদেশি নেওয়া চলবে না। টুটু বসু, অঞ্জন মিত্ররা ক্লাবের ক্ষমতায় আসতেই ক্লাবের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে গেল। টুটু বসু ঠিক করে নিলেন, যেভাবেই হোক চিমাকে আনতেই হবে। চাইলে টাকা দিয়ে অন্য বিদেশি আনতেই পারতেন। কিন্তু তাঁর জেদ, নিলে চিমাকেই নেব। অনেকটা সেই ‘তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার কালো চিতা–ই চাই।’ আসলে, তিনি ঠিক করলেন এক ঢিলে দুই পাখি মারবেন। একদিকে ইস্টবেঙ্গলকে দুর্বল করে দেওয়া, অন্যদিকে চিমাকে এনে মোহনবাগান আক্রমণের ধার বাড়ানো। সেইসঙ্গে চিমাকে প্রতিপক্ষের কবল থেকে ছিনিয়ে এনে বুঝিয়ে দেবেন, মাঠের বাইরে টক্কর নেওয়ার জন্য আমরা এসে গেছি।
কিন্তু চিমাকে কি সহজে ইস্টবেঙ্গল ছাড়বে? যে চিমা এমন সোনার ফসল ফলাচ্ছেন, একের পর এক ট্রফি এনে দিচ্ছেন, তাঁকে ছাড়তে চাইবেন, এতখানি আহাম্মক লাল হলুদ কর্তারা নন। অর্থাৎ তাঁরাও মরিয়া হয়ে ঝাঁপাবেন চিমার জন্য। এদিকে মোহনবাগান সেবার কোচ করতে চলেছে সুভাষ ভৌমিককে। তিনিও শুরু থেকেই বেশ আগ্রাসী। তাঁর দাবি, যেভাবেই হোক চিমাকে আনতে হবে। অপারেশনে নেমে পড়লেন তিনিও। কোচেরা সচরাচর লিস্ট তুলে দিয়েই দায় সারেন। কিন্তু তাঁর নাম সুভাষ ভৌমিক। তাঁর ইনভলভমেন্ট সব সময়ই একটু বেশি।
চিমা ফিরবেন বিদেশ থেকে। বিমানবন্দরের বাইরে যথারীতি ইস্টবেঙ্গলের কর্তা ও সমর্থকরা। গাড়িতে করে চিমাকে তাঁরা তুলে নিয়ে যাবেন। এদিকে সুভাষ সেন্ট্রাল এক্সাইজের অফিসার। বিমানবন্দরে ঢোকার ছাড়পত্র আছে। সরকারি ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে তিনি সোজা ঢুকে পড়লেন। চিমা নামতেই তিনি তাঁকে অন্য গেট দিয়ে বের করে দিলেন। পরিকল্পনা মাফিক গাড়ি নিয়ে সেখানে অপেক্ষা করছিলেন অঞ্জন মিত্র। চিমাকে নিয়েই গাড়ি ছুটল টুটু বসুর বাড়ির দিকে। চিমা বিদেশে থাকার সময়ে ফোনে তাঁর সঙ্গে দফায় দফায় কথা চালিয়ে গেছেন সুভাষ। ফলে হঠাৎ করে তিনি বিমানবন্দরে হাজির হয়ে চিমাকে পাচার করে দিলেন, ব্যাপারটা মোটেই এমন নয়। চিমাও মানসিকভাবে তৈরি ছিলেন। কিন্তু সুভাষ বেপরোয়াভাবে বিমানবন্দরে ঢুকে না পড়লে চিমা হয়তো ইস্টবেঙ্গল কর্তাদের কবল থেকে মুক্তি পেতেন না। শতাব্দী প্রাচীন ক্লাব নিজেদের অচলায়তন ভেঙে প্রথম বিদেশি হিসেবে সই করাল চিমাকে। তিনি আসতেই ছবিটা বদলে গেল। যে মোহনবাগান বড় ম্যাচে বারবার নাস্তানাবুদ হচ্ছিল, সেই মোহনবাগানই চিমাকে পেয়ে জয়ের স্বাদ পেতে শুরু করল।
তিরানব্বইয়ে চিমা চলে গেলেন বিদেশে। আবার ফিরে এলেন চার বছর পর। প্রথমবার জাতীয় লিগে যে মোহনবাগান মূলপর্বেই উঠতে পারেনি, দ্বিতীয়বার তারাই কিনা চ্যাম্পিয়ন! সৌজন্যে চিমার অবদান তো আছেই। সেই বছরই ডায়মন্ড সিস্টেমে ঝড় তুলেছিলেন অমল দত্ত। চিমাও ছিলেন সেই সিস্টেমের অঙ্গ। আসলে, তিনি গোল করছিলেন বলেই সিস্টেমের জয়জয়কার হচ্ছিল। মাঝমাঠে সত্যজিৎ, বাসুদেব, অমিত দাস, রেনেডিরা যতই দৃষ্টিনন্দন ফুটবল খেলুন, সামনে থেকে চিমা গোল না করলে ডায়মন্ড সিস্টেম শুরু থেকেই প্রশ্নের মুখে পড়ে যেত।
সেই লিগেরই আরও একটি ঘটনা। যা চিনিয়ে দেয় অন্য এক চিমাকে। মোহনবাগানের লিগ নিশ্চিত। সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার লড়াই চলছে চিমার সঙ্গে দীপেন্দু বিশ্বাসের। দীপেন্দুর গোল সংখ্যা ১২, সেখানে চিমার ১১। লিগের শেষ ম্যাচ ইস্টার্ন রেলের বিরুদ্ধে। চিমা একটা ফিল্ড গোল পেয়ে গেলেন। অর্থাৎ দীপেন্দুকে ছুঁয়ে ফেললেন। ম্যাচের শেষ দিকে মোহনবাগান পেনাল্টি পেল। চিমা বলটি তুলে এনে পেনাল্টি স্পটে বসালেন। সবাই ধরেই নিয়েছেন, তিনিই শট নেবেন। ১৩ তম গোলটি করে দীপেন্দুকে টপকে যাবেন। আরও একবার টপ স্কোরার হবেন। এমন সময়ই কাহানি মে টুইস্ট। সবাইকে অবাক করে দিয়ে চিমা ডাকলেন দীপেন্দুকে। বললেন, তুমি শট নাও। দীপেন্দু কিছুটা ইতস্তত করছিলেন। কিন্তু বড় দাদার মতোই চিমার আদেশ, ‘আমি বলছি, তুমি শট নাও।’ বলেই মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। দীপেন্দু শট নিলেন। যথারীতি গোল। অর্থাৎ, নাইজেরিয়ান চিমাকে টপকে লিগের টপ স্কোরার বসিরহাটের তরুণ দীপেন্দু।
এই আত্মত্যাগ কজন করতে পারেন! এই আত্মত্যাগ তিনিই করতে পারেন, যাঁর সিংহের মতো একটা হৃদয় আছে।
