এবার স্পিকারকে ধন্যবাদ দিতেই হবে

সরল বিশ্বাস

এ কী কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে!‌
উপমাটা রামায়নের। আসলে, যাঁর মুখে যে কথা শুনতে অভ্যস্থ নই, তাঁর মুখে যখন এমন কথা শোনা যায়, তখনই এই উপমাটা ব্যবহার হয়।
আমাদের রাজ্য বিধানসভার স্পিকার। বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি পেশায় আইনজীবী। বারো বছর ধরে বিধানসভার স্পিকার। কিন্তু তাঁর আচার–‌আচরণ বা কথাবার্তা শুনে কখনই তেমন সমীহ হত না। বারবার মনে হত, তিনি এই চেয়ারের যোগ্য নন।
স্পিকার অবশ্যই কোনও দলের বিধায়ক। ফলে, কিছুটা দলীয় বাধ্যবাধকতা নিশ্চয় থাকে। কিন্তু এই চেয়ারের একটা আলাদা মর্যাদা আছে। এই চেয়ারে বসতে গেলে কিছুটা ব্যক্তিত্ববান হতে হয়। দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে হয়। যখনই কোনও সাংবিধানিক সমস্যা তৈরি হয়েছে, কখনই মনে হয়নি, তিনি নিরপেক্ষ। বারবার মনে হয়েছে, তিনি কারও অঙ্গুলিহেলনেই চলছেন। বিশেষ কাউরে খুশি করাতেই তাঁর যত আগ্রহ।
এবার তাঁকে অন্য ভূমিকায় দেখা গেল। রাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্যরা রাজ্যপালের বিরুদ্ধে ধর্না দিয়েছেন। মামলার হুমকি দিয়েছেন। সবাই নাকি আলাদা আলাদা করে মানহানি মামলার নোটিশ পাঠিয়েছেন। আর এতেই বেজায় চটেছেন স্পিকার। তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন, রাজ্যপাল হলেন রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধান। যতদিন তিনি এই চেয়ারে থাকবেন, ততদিন তাঁর বিরুদ্ধে কোনও মামলা করা যায় না।
একজন আইনজীবী আইনের ব্যাখ্যা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন। সেইসঙ্গে কিছুটা বিস্ময় প্রকাশ করলেন, ‘‌কারা মামলা করার বুদ্ধি দিচ্ছেন?‌ আইনজীবীদের তো জানা উচিত, আইনটা কী। মামলা হবে না জেনেও মামলার নোটিশ দিচ্ছেন?‌ সস্তা প্রচারের জন্যই কেউ কেউ এমনটা করছেন।’‌
একেবারে সঠিক জায়গাতেই আলো ফেলেছেন স্পিকার মশাই। সত্যিই তো, এই মানুষগুলো কিনা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন!‌ তাঁদের তো এটুকু আইনি জ্ঞান থাকা উচিত। নাকি বিশেষ কারও নির্দেশে মামলার নোটিশ দিয়েছেন!‌ যাঁর নির্দেশে এমনটা করেছেন, তাহলে তাঁর আইনি বুদ্ধির দৌড়টা একবার দেখুন।
বিমানবাবুকে অভিনন্দন জানানোর সুযোগ সচরাচর আসে না। কিন্তু এবার তিনি সত্যিই দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে আইনটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। তৃণমূল পন্থী অধ্যাপকরা মামলা করতে চাইছেন জেনেও সত্যিটা বুঝিয়ে দিয়েছেন। তাঁদের অজ্ঞতাও বুঝিয়ে দিয়েছেন।
হ্যাঁ, একজন স্পিকারকে এই ভূমিকাতেই দেখতে চাই। একজন আইনজীবীকেও এই ভূমিকাতেই দেখতে চাই। অতীতে অনেক সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু এই ঘটনার পর অন্তত একটা ধন্যবাদ ও অভিনন্দন তাঁর অবশ্যই প্রাপ্য। তিনি অন্তত নিজের চেয়ারের সম্মান রক্ষা করেছেন।

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.