অভিরূপ কুমার
একটা সময় স্মৃতির ওপর ধুলো জমে যায়। রাগ কেমন যেন পড়ে যায়। একসময় যাঁর ওপর রাগ হত, পরে কেন জানি না, তাঁকেই ভাল লাগতে শুরু করে।
এমনটাই হয়েছিল কুণাল ঘোষের ক্ষেত্রে। বাম সরকারের পতনের আগে থেকেই তাঁর ভূমিকা মোটেই ভাল লাগত না। সাংবাদিকতাকে একেবারে চাটুকারিতার স্তরে নামিয়ে এনেছিলেন। তখন তাঁকে আর সাংবাদিক মনেও হত না। কোনও দল বা নেতার সমালোচনা করতেই পারেন। কিন্তু তা অনেকক্ষেত্রেই শালীনতা ছাড়িয়ে যেত। আক্রমণ পৌঁছে যেত কদর্য চেহারায়।
সরকার বদলে গেল। একেবারে শাসকের লেজুড় হয়ে গেলেন। আগে তবু না হয় শাসকের বিরোধীতা করতেন। এবার শাসকের ভজনা। সেইসঙ্গে বিরোধীদের দিকে ধেয়ে আসত নোঙরা আক্রমণ। মুখ্যমন্ত্রী যত না আনুগত্য চাইতেন, তার থেকেও বেশি আনুগত্য দেখাতে তিনি যেন তৈরি। ধরে আনতে বললে বেঁধে আনার উপক্রম। সত্যিই খুব রাগ হত। মনে হত, এই লোকটার দম্ভ চূর্ণ হওয়া দরকার। কী আশ্চর্য, এত রাঘব বোয়াল থাকতে তাঁকে কিনা গ্রেপ্তার করা হল। একটু বেসুরো গাইতে গেলে কী হয়, হাড়ে হাড়ে টের পেলেন। মনে হতে লাগল, এতদিনে বোধ হয় উচিত শিক্ষা পেয়েছেন।
ঠিক তার কয়েক মাস পর, এই মানুষটার ওপর একটু একটু সহানুভূতি তৈরি হতে লাগল। তখন তিনি কোর্টে যাওয়া বা আসার পথে চিৎকার করে নিজের কথা জানাতে চাইতেন। পুলিশ হইহল্লা করে বা প্রিজন ভ্যানে আওয়াজ করে সেই চিৎকার থামিয়ে দিত। তখন রাগ হত পুলিশের ওপর। লোকটা কথা বলতে চাইছে, পুলিশ অসভ্যতা করছে! লোকটার কথাগুলো বেশ ভাল লাগতে শুরু করল। রাগ কেমন যেন কমে এল।
****
এবার মুকুল রায়। বিরোধী জনপ্রতিনিধিদের একে একে শাসক দলে এনে ফেললেন। সেই শেখানো বুলি, মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে যে উন্নয়নের কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে, তাতে শামিল হলেন অমুক, অমুক। তাঁরাও এই বেদবাক্যই আউড়ে যেতেন। এমনকী, যেখানে জেলা পরিষদ বা পঞ্চায়েত সমিতিতে একটিও সদস্য নেই, সেইসব জেলা পরিষদ, পঞ্চায়েত সমিতিও দখল করতে লাগল তৃণমূল। মনে হল, এই মানুষটা গণতন্ত্রের সর্বনাশ করছেন। এই কালচার তো বাংলায় আগে ছিল না। তিনিই পুলিশকে নিয়ন্ত্রণ করতেন। তিনিই বিরোধী দলের নেতা কর্মীদের নামে মিথ্যে মামলা দেওয়াতেন। তাঁর উপরেও রাগ হত।
একসময় তিনিও দলে কোণঠাসা। কেউ তাঁকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। যাঁরা অনুগামী ছিলেন, তাঁরাও পাত্তা দিচ্ছেন না। মনে হতে লাগল, ঠিক হয়েছে। এমনটাই হওয়ার কথা। যে কাজ করেছো, তার ফল ভোগ করো। হতাশা বাড়তে বাড়তে এই লোকটা একসময় যোগ দিলেন বিজেপিতে। মুখ্যমন্ত্রীকে, তৃণমূলকে খোঁচা দিয়ে নানা কথা বললে লাগলেন। মনে হল, লোকটা তো ঠিকই বলছে। আগের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। কেন জানি না, লোকটাকে ভাল লাগতে শুরু করল। মনে হল, বেশি মমতার সঙ্গে থাকলে কী পরিণাম হয়, এই লোকটাকে দেখে বাকিকা বুঝুক।
***
মাঝে শোভন। তিনিও দল ত্যাগ করলেন। অন্য শিবিরে গেলেন। মনে হল, হ্যাঁ, এটাই তো হওয়ার ছিল।
তারপর শুভেন্দু। এখন তাঁকে ভাল লাগছে। কিন্তু একসময় তাঁর অপকর্মের তালিকাটাও কম লম্বা নয়। মালদা, মুর্শিদাবাদে কী ভূমিকা পালন করেছেন, কে না জানে! ক্ষমতায় আসার আগে নন্দীগ্রামেও তাঁর ভূমিকা খুব গৌরবের ছিল না। নন্দীগ্রামকে যেভাবে অশান্ত বানিয়েছিলেন, যেভাবে মাওবাদিদের ব্যবহার করেছেন, যেভাবে উস্কানি দিয়েছেন, তা কখনই গণতান্ত্রিক আন্দোলন হতে পারে না। পুলিশ দিয়ে জেলা পরিষদ দখল করতে গিয়ে তাঁর হাতেও কম রক্ত লাগেনি। তিনি যেসব জেলায় দায়িত্বে ছিলেন, পঞ্চায়েতে ভোট না হতে দেওয়ার দায় কি অস্বীকার করতে পারবেন? অন্য জায়গায় তৃণমূল কর্মীরা ব্লক ঘেরাও করেছিল। কিন্তু মুর্শিদাবাদে তো পুলিশ দিয়ে ব্লক ঘেরাও করতে হয়েছে। পাচারের বখরা যদি সর্বোচ্চ জায়গায় গিয়ে থাকে, মেদিনীপুরেও যায়নি, এমনটা বলা কঠিন।
সেই শুভেন্দু বেসুরো গাইছেন। হয়ত আগামীদিনে আরও সুর চড়াবেন। শাসকদলে কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছেন। তিনি নিজে দল গড়বেন নাকি সরাসরি বিজেপিতে যোগ দেবেন, জানি না। তবে যাই করুন, শাসককে বিপাকে ফেলছেন, এটা দেখতে বেশ লাগছে। একসময় তিনি তৃণমূলের হয়ে দল ভাঙিয়েছেন। আজ তৃণমূলকেই ভাঙতে উদ্যোগী। কুণাল বা মুকুলের মতো তাঁর উপরেও রাগ ক্রমশ কমে আসছে।
এটাই বোধ হয় নিয়ম। যখন কেউ আমার সুরে কথা বলতে শুরু করে, তখন তাঁকে কাছের মনে হয়। তাঁর ওপর থেকে আস্তে আস্তে রাগের পর্দাটা সরে যায়।